পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির জয় : বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কে নতুন সমীকরণ
পশ্চিমবঙ্গে অভাবনীয় বিজয় পেয়েছে কেন্দ্রের শাসকদল বিজেপি। এই জয়ের পর তাৎক্ষণিক এক প্রতিক্রিয়ায় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি বললেন, ‘বাংলায় পদ্ম ফুটেছে’। উল্লেখ্য পদ্মফুল হচ্ছে বিজেপির নির্বাচনী প্রতীক।
ভারতের স্বাধীনতা প্রাপ্তির প্রায় ৭৯ বছর সময় ধরে দেশটির ইতিহাস-ঐতিহ্যের গুরুত্বপূর্ণ ধারক, অন্যতম বড় এবং কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ রাজ্য পশ্চিমবঙ্গ শাসিত হয়েছে মোটে তিনটি রাজনৈতিক শক্তি দ্বারা।
কংগ্রেসের ৩০ বছর, বামফ্রন্টের ৩৪ বছর এবং তৃণমূলের ১৫ বছর, এই তিন শক্তি তাদের মেয়াদে টানা রাজ্য শাসন করেছে। ভারতের অনেক রাজ্যের তুলনায় উদার, ধর্মনিরপেক্ষ এবং অধিকার সচেতন এই রাজ্যে এবার এমনভাবে পরিবর্তনের পালে হাওয়া লাগল, এটা অনেকটা অবাক হওয়ার মতো বিষয়।
অবাক হওয়ার কথা বলা হচ্ছে এই কারণে যে একটা ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দল টানা তিন মেয়াদে দেশটির কেন্দ্রীয় সরকার পরিচালনা করে আসলেও পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে তাদের সেরকম উজ্জ্বল কোনো উপস্থিতি ছিল না। আজ থেকে ১০ বছর আগে ২০১৬ সালে রাজ্যের বিধানসভা নির্বাচনে ২৯৪ আসনের মধ্যে মাত্র ৩টি আসন লাভ করা দলটি দ্রুতই তাদের শক্তির বিস্তার ঘটাতে থাকে এবং ২০২১ সালে তা ৭৭ আসনে উন্নীত হয়।
এর ঠিক ৫ বছর পর আজকের এই দিনে এসে তারা সরকার গঠনের চেয়েও অনেক বেশি, দুই তৃতীয়াংশ আসন লাভ করে তাক লাগিয়ে দিয়েছে, এটা বলার অপেক্ষা রাখে না।
পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচন এবং এই নির্বাচনে কেন্দ্রের শাসকদল বিজেপির বিজয়ের মধ্য দিয়ে দেশটির রাজনীতিতে ক্ষমতাসীন দলের অবস্থান অনেক পোক্ত হয়েছে, এমনটাও ধারণা করা যায়। বলে রাখা ভালো যে একই সময়ে ভারতের অপর ৫টি রাজ্যের বিধানসভা নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে, যেখানে বিজেপি আসাম এবং কেন্দ্রশাসিত পদুচেরিতে জয়লাভ করেছে।
তবে গুরুত্বপূর্ণ রাজ্য তামিলনাড়ুতে ক্ষমতাসীন ডিএমকে বড় ব্যবধানে পরাজিত হয়েছে একসময়ের দক্ষিণী চলচ্চিত্রের অভিনেতা এবং কেবলমাত্র দুই বছর আগে নতুন দল (টিভিকে) গঠন করা থালাপতি বিজয়ের কাছে।
বিজেপি অনেকবছর চেষ্টা করেও সেখানে তাদের অবস্থান তৈরি করতে পারেনি। অপরদিকে কেরালায় ক্ষমতাসীন বাম গণতান্ত্রিক ফ্রন্টকে পরাজিত করে কংগ্রেস নিয়ন্ত্রিত ইউডিএফ বিজয় লাভ করেছে। এই হিসাবে বলা যেতে পারে যে, এই নির্বাচনগুলোর মধ্য দিয়ে কেন্দ্রে ক্ষমতাসীন দল জাতীয় রাজনীতিতে তাদের প্রতিদ্বন্দ্বী কংগ্রেসের চেয়ে এগিয়েই থাকল।
ভারতের রাজনীতিতে সাম্প্রতিক সময়ে বিজেপির অবস্থান একধরনের উত্থান-পতনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছিল। ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে পশ্চিমবঙ্গের জন্য বরাদ্দ ৪২ আসনের মধ্যে বিজেপি ১২টি আসন লাভ করেছিল, যা ২০১৯ সালের নির্বাচনের চেয়ে ৬টি কম।
অন্যদিকে তৃণমূল আগেরবারের তুলনায় ৭টি আসন বেশি পেয়ে ২৯ আসন লাভ করে। দুই বছর সময়ের মধ্যে রাজ্যের শাসকদলের বিধানসভা নির্বাচনে এমন ধস বিজেপির প্রতি পশ্চিমবঙ্গের মানুষের আস্থা বৃদ্ধির দিকটিকে তুলে ধরেছে, যা সামনের লোকসভা নির্বাচনে একইভাবে প্রতিফলিত হতে পারে।
এই নির্বাচনের ফলাফলকে তৃণমূলের পক্ষ থেকে অনেক কারণেই স্বাগত জানানো হয়নি। এরমধ্যে সবচেয়ে বড় কারণ হচ্ছে ভোটার তালিকা সংশোধন। তৃণমূল অভিযোগ করছে পরিকল্পিতভাবে এটি করা হয়েছে, কিছু আসনকে চিহ্নিত করে, যেখানে এর মধ্য দিয়ে তৃণমূলের ভোটারদের লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে।
অপরদিকে তৃণমূলের পরাজয়ের বেশকিছু শক্ত কারণও রয়েছে, যার মধ্যে বহুল প্রচারিত হচ্ছে তাদের নারী ভোটার আশঙ্কাজনকভাবে কমে যাওয়া বলে অনেকে মনে করছে। তৃণমূল সরকার নারীদের উন্নয়নে কন্যাশ্রী, লক্ষ্মীর ভান্ডারসহ সবুজ সাথী এবং স্বাস্থ্য সাথীর মতো কিছু জনপ্রিয় কর্মসূচি গ্রহণ করলেও সাম্প্রতিক সময়গুলোতে নারীদের নিরাপত্তাহীনতার বিষয়টি নিয়ে রাজ্যে ব্যাপকভাবে অসন্তোষ দেখা গেছে।