অ্যামনেস্টির চোখে পশ্চিমের নৈতিক ধস
আড়াই বছরের বেশি সময় ধরে গাজায় চলমান গণহত্যা থেকে শুরু করে সাম্প্রতিক ইরান হামলা পর্যন্ত পশ্চিমা সভ্যতার নেতৃত্বদানকারী যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল জুটি যে দস্যুবৃত্তির পরিচয় দিয়েছে, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর তা নজিরবিহীন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে যে ইহুদি জনগোষ্ঠী সবচেয়ে নির্যাতিত ছিল, এবার তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের মুখে তাদেরই ইসরায়েল রাষ্ট্র প্রধান নির্যাতক ও অন্যতম গণহত্যাকারী হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে।
এমন মন্তব্য নিঃসন্দেহে তীব্র পশ্চিমা-বিদ্বেষী মনে হতে পারে; যা কোনো চরম বামপন্থী লেখক-বুদ্ধিজীবী বা ইসলামি মৌলবাদী বিশেষত শিয়া সমর্থিত কোনো গোষ্ঠী বা ব্যক্তির হওয়া স্বাভাবিক। বিশেষ মতবাদে বিশ্বাসী কেউ এমন মন্তব্য করলে তা সচরাচর বিশ্বাসযোগ্য না হওয়ারই কথা। পশ্চিমা নেতৃবৃন্দ বা তাদের মদতপুষ্টরা একে ‘একপেশে’ বলে সহজেই উড়িয়ে দিতে পারেন। কিন্তু যদি এই কথাগুলোই আরও তীব্র, আক্রমণাত্মক ও স্পষ্ট ভাষায় বলে একটি আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠন—অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল?
এই আন্তর্জাতিক সংগঠনটি তাদের ২০২৫ সালের মানবাধিকার প্রতিবেদনে এমন চিত্রই তুলে ধরেছে। প্রতিবেদনটির ভূমিকায় এর মহাসচিব আ্যগনেস ক্যালামার্ড লিখেছেন: “২০২৫ সাল জুড়ে লোভী লুণ্ঠনকারীরা পৃথিবী দাপিয়ে বেড়িয়েছে, বিপুল বপুধারী দস্যুরা অন্যায় পুরস্কার জিতে নিয়ে গেছে। অন্য অনেকের মধ্যে ট্রাম্প, পুতিন ও নেতানিয়াহুর মতো নেতারা ব্যাপক ধ্বংস, দমন ও সন্ত্রাসের মধ্য দিয়ে অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক আধিপত্যের বিজয়রথ চালিয়ে গেছেন।
অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল আগেই সতর্ক করেছিল যে, আদিম হিংস্রতা উদ্বোধনের মতো একটি বৈশ্বিক পরিবেশ সৃষ্টির কাজ অনেক দিন ধরে চলমান। তবে ২০২৫ সালে ধিকিধিকি জ্বলা শুকনো কাঠের ওপর ঢেলে দেওয়া হলো দাহ্য তরল; আন্তর্জাতিক বিধিবিধান উল্টো দিকে ঘুরে গেল। যে আন্তর্জাতিক বিধানের অট্টালিকাটি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের চরম ধ্বংসযজ্ঞ ও হলোকাস্টের ছাই থেকে গত ৮০ বছর ধরে ধীর ও কঠিন শ্রমে গড়ে উঠেছিল, তা আজ হুমকির মুখে।”
আ্যগনেস আরও লিখেছেন: “লুণ্ঠনকারীদের প্রতিহত না করে ২০২৫-এ ইউরোপীয় রাষ্ট্রসহ বেশিরভাগ সরকার তাদের তুষ্ট করার কাজে লিপ্ত হয়ে পড়ে। কেউ কেউ লুণ্ঠনকারীদের অনুকরণের চেষ্টাও করে, অন্যরা আশ্রয় নেয় তাদের ছায়াতলে। হাতে গোনা কয়েকজন কেবল তাদের রুখে দাঁড়ায়। একের পর এক আগুন লাগতে থাকে: গণহত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধ সংঘটনে সহযোগিতা ও নীরবতা অবলম্বনের মাধ্যমে এবং যারা ন্যায়বিচারের দায়িত্বে নিয়োজিত তাদের বিরুদ্ধে অবরোধ আরোপের মাধ্যমে। ২০২৫ সালটি এভাবেই স্মরিত হবে: গুণ্ডা ও লুণ্ঠকদের স্বাধীনতার জন্য, আন্তর্জাতিক কর্তব্যের প্রতি জ্বলন্ত বিশ্বাসঘাতকতার জন্য, মৃদু প্রশমনের রাজনীতি ও আত্মমর্যাদাহীনতার জন্য এবং রাষ্ট্রগুলোর আগুন নিয়ে খেলার জন্য, যার লেলিহান শিখায় আমরা সবাই এবং আগামী কয়েক প্রজন্ম পুড়তে যাচ্ছি।”
আ্যগনেস ক্যালামার্ড যে সর্বজনস্বীকৃত আন্তর্জাতিক বিধিবিধানের উল্লেখ করেছেন, তা বিশ্বযুদ্ধোত্তর ধ্বংসস্তূপ থেকে জন্ম নেওয়া বিংশ শতাব্দীর মানুষের অন্যতম সম্মিলিত অর্জন। ভূমিকায় তিনি আরও লিখেছেন, “১৯৪৮ সালে গৃহীত মানবাধিকারের সর্বজনীন ঘোষণাপত্র, গণহত্যা কনভেনশন ও আরও অন্যান্য আদর্শিক দলিল যা ৮০ বছরে অর্জিত হয়েছে, সেগুলো মায়ামরীচিকা নয়। এগুলো বিশ্বযুদ্ধোত্তর বহুত্ববাদী ও সমানাধিকারমূলক ব্যবস্থার বাস্তব প্রকাশ, যার শিকড় আন্তর্জাতিক মানবাধিকার ও ঐতিহাসিক সহিংসতার চির-অবসানের প্রতিশ্রুতিতে নিহিত।”
এই ধ্বংসযজ্ঞের যে বৃহৎ ছবি তিনি তুলে ধরেছেন, তা রক্ত হিম করার মতো আতঙ্কজনক। তিনি লিখেছেন: “১৯৪৮-এর অসম্পূর্ণ বৈশ্বিক পরীক্ষা-নিরীক্ষার বিকল্প ব্যবস্থাটি কী? আন্তর্জাতিক আইনকানুন লঙ্ঘন, আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতকে (আইসিসি) আক্রমণ, আন্তর্জাতিক কনভেনশনসমূহ ছুঁড়ে ফেলা এবং জাতিসংঘের সংগঠনসমূহ পরিত্যাগ করা। নিজেদের ভেটো ক্ষমতার অবিবেচনাপ্রসূত অপব্যবহারের মাধ্যমে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদকে পক্ষাঘাতগ্রস্ত করে লুণ্ঠনকারীরা এখন প্রতিষ্ঠা করতে চাইছে যে, শান্তি ও নিরাপত্তা অকার্যকর। তারা নিজেদের স্বার্থসেবী বিকল্প ব্যবস্থাকে চাপিয়ে দিতে চেষ্টা করছে।…
এই লুণ্ঠনমূলক বিকল্প বিশ্বব্যবস্থা ভিন্নমতকে স্তব্ধ করে, প্রতিরোধকে দমন করে, বিমানবিকীকরণের বক্তব্য ছড়ায়, ঘৃণা জ্বালায় ও আইনকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করে। এর ভিত্তি মানবতার প্রতি শ্রদ্ধা নয়, বরং বাণিজ্যের অন্ধশক্তি ও প্রযুক্তির আধিপত্য। ২০২৬-এর শুরুতে এই নতুন ব্যবস্থার রূপকল্প প্রকাশ পেয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওর রোমান্টিকভাবে উপস্থাপিত বক্তব্যে। যেখানে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে ‘খ্রিস্টান জনগণের ঐক্য’-এর কথা বলেছেন, যা মূলত আধিপত্য, উপনিবেশ, দাসত্ব ও গণহত্যার ইতিহাসকে আড়াল করার চেষ্টা মাত্র।”
এই রূপকল্পের বাস্তবায়ন এখন আমরা বিশ্বব্যাপী দেখছি। অনেক দেশে মার্কো রুবিওর পরিকল্পনাই ভিন্ন পোশাকে, ভিন্ন রঙে ও ভিন্ন ভাষায় বাস্তবায়নের চেষ্টা চলছে। নানা ভিন্নতা থাকলেও তাদের মধ্যে লক্ষণীয় মিল হলো: ভিন্নমত স্তব্ধ করা, দমন-পীড়ন এবং আইনকে যথেচ্ছ অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার। এই চর্চা মানবজাতির জন্য এক দুঃস্বপ্নময় ভবিষ্যৎ বয়ে আনবে, যার নেতৃত্বে রয়েছে নৈতিকভাবে দেউলিয়া বর্তমান যুদ্ধবাজ পশ্চিমা পুঁজিবাদী শক্তির মোড়ল যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল জুটি।
এই লুণ্ঠনকারী গোষ্ঠীর আরেক নাম ‘এপস্টেইন শ্রেণি’, যারা বিকৃত মানসিকতাসম্পন্ন এবং নানা মানবতাবিরোধী অপরাধে যুক্ত। তারা ‘ট্রুথ’ বা সত্য নয়, বরং ‘পোস্ট-ট্রুথ’ বা সত্য-উত্তর ডাহা মিথ্যা প্রচার করে। তারা ইতিহাসকে বস্তুনিষ্ঠ সত্যের পরিবর্তে ‘বয়ানের কারখানা’ মনে করে এবং সুবিধামতো বয়ান তৈরি করে। ধর্মকে যথেচ্ছ ব্যবহার করে এবং মিলিটারি ইন্ডাস্ট্রিয়াল কমপ্লেক্সের স্বার্থে মানুষ হত্যাকে নেশা ও পেশা বানিয়ে ফেলেছে। তাদের লোভের দুনিয়ায় কোটি কোটি মানুষের শ্রমে গড়া এই পৃথিবীটা একটি ভিডিও গেমের চেয়ে বেশি কিছু নয়।
প্রতিবেদনটিতে ইসরায়েল সম্পর্কে অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষায় বলা হয়েছে: “গাজায় ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে ইসরায়েল গণহত্যা, বহুরকম যুদ্ধাপরাধ ও মানবতাবিরোধী অপরাধ করেছে।” এর মানে অবশ্য এই নয় যে, যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল ও রাশিয়া বাদে অন্যরা ধোয়া তুলসী পাতা। অ্যামনেস্টির এই প্রতিবেদনে ১৪৪টি দেশের মানবাধিকারের অবস্থা আলোচিত হয়েছে। এই নৈতিক ধস আজ বৈশ্বিক। সবচেয়ে বড় সংকট হচ্ছে এর কোনো উল্লেখযোগ্য বিকল্প ব্যবস্থার অনুপস্থিতি। তবে পুরো পরিস্থিতিই যে হতাশাব্যঞ্জক, তা নয়।
আশার কথা হলো, যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল পরিচালিত এই গণহত্যা ও হামলার বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষের প্রতিবাদ বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়েছে। আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংস্থা এই অন্যায়ের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়ায় তারাও এখন যুদ্ধবাজ চক্রের আক্রোশের শিকার হচ্ছে। রাষ্ট্রগুলোর ভূমিকা নতজানু এবং বেশিরভাগই বৃহৎ শক্তির পদলেহী হলেও, বিশ্বব্যাপী বিবেকবান মানুষের প্রতিবাদ ও ঐক্যই পারে মানবতাকে বাঁচাতে। ওইসব সাধারণ মানুষ যাদের মধ্যে প্রাচ্য-প্রতীচ্য বিভেদ নেই, যারা ধর্মের লেবাসে ঘৃণা ছড়ায় না, বরং সৃজনের আনন্দে মেতে ওঠে—তারাই ট্রাম্প, পুতিন ও নেতানিয়াহুদের জন্য সবচেয়ে বড় ভয়। অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের মহাসচিব আ্যগনেস ক্যালামার্ড এমন সাহসী প্রতিবেদনের জন্য আমাদের ধন্যবাদ প্রাপ্য।