সংকটের অর্থনীতি: কারো মুনাফা, কারো নিঃস্বতা

জাগো নিউজ ২৪ সাইফুল হোসেন প্রকাশিত: ০২ মে ২০২৬, ১১:২৮

বৈশ্বিক অস্থিরতা মানব সভ্যতার ইতিহাসে সবসময়ই এক নতুন মেরুকরণ তৈরি করে। এই অনিশ্চিত সময়ে যখন বিশ্বের ৯৯ শতাংশ মানুষ তাদের বর্তমান এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে চরম উদ্বেগে নিমজ্জিত থাকে, ঠিক তখনই মুষ্টিমেয় ১ শতাংশ মানুষ সম্পদ ও প্রভাবের এক অভূতপূর্ব শিখরে পৌঁছায়। এই বিভাজন কেবল ভাগ্যের লিখন নয়, বরং এটি বিদ্যমান অর্থনৈতিক কাঠামো এবং সংকটের সময় পুঁজির আচরণের এক স্বাভাবিক প্রতিফলন। যখনই পৃথিবীতে যুদ্ধ, মহামারি বা চরম অর্থনৈতিক মন্দা আঘাত হানে, তখন সাধারণ মানুষের মধ্যে বেঁচে থাকার তাগিদে এক ধরনের 'মানসিক পক্ষাঘাত' তৈরি হয়। তারা আতঙ্কিত হয়ে তাদের সঞ্চয় রক্ষা করতে চায়, যা বাজার থেকে তারল্য কমিয়ে দেয় এবং পুরো ব্যবস্থাকে আরও অস্থিতিশীল করে তোলে।


কিন্তু এই একই অস্থিরতা ১ শতাংশ মানুষের কাছে একটি 'গোল্ডেন পিরিয়ড' বা স্বর্ণালী সময় হিসেবে আবির্ভূত হয়। তাদের হাতে থাকা বিশাল অলস পুঁজি এই সময় সস্তায় সম্পদ কেনার অস্ত্র হিসেবে ব্যবহৃত হয়। প্রখ্যাত অর্থনীতিবিদদের মতে, সংকটের সময় সম্পদের বিনাশ হয় না, বরং এক হাত থেকে অন্য হাতে স্থানান্তরিত হয় মাত্র। যখন সাধারণ মানুষ আতঙ্কে সম্পদ বিক্রি করে দেয়, অতি-ধনীরা তখন সেই সম্পদ নামমাত্র মূল্যে কুক্ষিগত করে নেয়, যা পরবর্তীতে স্থিতিশীল সময়ে কয়েক গুণ বেশি মুনাফা নিশ্চিত করে। এই ১ শতাংশের জয়ের পেছনে প্রধান কারণ হলো তথ্যের সহজলভ্যতা এবং নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে তাদের প্রবল প্রভাব। সাধারণ ৯৯ শতাংশ মানুষ যখন দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি এবং মুদ্রাস্ফীতির জাঁতাকলে পিষ্ট হয়, তখন এই বৃহৎ করপোরেট ও প্রভাবশালী গোষ্ঠীগুলো সরকারের দেওয়া বিভিন্ন আর্থিক প্রণোদনা বা 'বেইলআউট' প্যাকেজের সুবিধা ভোগ করে।


ইতিহাসের পাতায় নজর দিলে দেখা যায়, ২০০৮ সালের বিশ্বমন্দা থেকে শুরু করে হালের কোভিড-১৯ মহামারি—সবখানেই এই একই চিত্রের পুনরাবৃত্তি ঘটেছে। অক্সফাম এবং ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে যে, মহামারির চরম দুঃসময়ে যখন কোটি কোটি মানুষ কর্মসংস্থান হারিয়ে দারিদ্র্যসীমার নিচে চলে গিয়েছিল, ঠিক তখনই বিশ্বের শীর্ষ ধনকুবেরদের মোট সম্পদ প্রায় দ্বিগুণ বেড়েছে। এই অদ্ভুত বৈপরীত্যের মূলে রয়েছে 'ক্যাপিটাল একিউমুলেশন' বা পুঁজির পুঞ্জীভবন প্রক্রিয়া। অস্থিরতার সময়ে যখন মুদ্রাস্ফীতি আকাশচুম্বী হয়, তখন সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমে যায় এবং তাদের সামান্য জমানো টাকা মূল্যহীন হতে থাকে।


অন্যদিকে, ১ শতাংশ মানুষের বিনিয়োগ থাকে এমন সব সম্পদে—যেমন জমি, স্বর্ণ বা টেকনোলজি কোম্পানি—যার মূল্য মুদ্রাস্ফীতির সাথে পাল্লা দিয়ে বাড়ে। ফলে অর্থনৈতিক অস্থিরতা তাদের জন্য সম্পদ হ্রাসের বদলে সম্পদ বৃদ্ধির অনুঘটক হিসেবে কাজ করে। থমাস পিকেটি তার বিখ্যাত অর্থনৈতিক তত্ত্বে দেখিয়েছেন যে, সাধারণ প্রবৃদ্ধির তুলনায় পুঁজির আয়ের হার সবসময়ই বেশি থাকে, যা অস্থিরতার সময় আরও প্রকট হয়ে ওঠে। এই সময় বড় কোম্পানিগুলো একচেটিয়া আধিপত্য বিস্তার করে, কারণ ছোট ও মাঝারি উদ্যোক্তারা প্রতিকূল পরিবেশে টিকে থাকতে না পেরে বাজার থেকে ছিটকে পড়ে।


৯৯ শতাংশ মানুষের এই আতঙ্কের মূল ভিত্তি হলো অনিশ্চয়তা এবং সামাজিক নিরাপত্তার অভাব। একজন সাধারণ কর্মজীবীর কাছে বৈশ্বিক অস্থিরতা মানেই হলো চাকরি হারানোর ভয়, চিকিৎসার খরচ মেটাতে না পারা এবং সন্তানের ভবিষ্যতের অনিশ্চয়তা। এই ভীতি তাদের ঝুঁকি গ্রহণের ক্ষমতা কেড়ে নেয় এবং তাদের আরও রক্ষণশীল করে তোলে। মানুষ যখন ভয় পায়, তখন সে ভুল সিদ্ধান্ত নেয়। আতঙ্কের বশবর্তী হয়ে সাধারণ বিনিয়োগকারীরা যখন কম দামে শেয়ার বা সম্পদ বিক্রি করে দেয়, তারা আসলে দীর্ঘমেয়াদি লোকসানকেই বরণ করে নেয়।


বিপরীতে, ১ শতাংশের কাছে থাকে বিশাল লজিস্টিক সাপোর্ট এবং বহুমুখী বিনিয়োগের সুযোগ। তারা জানে যে পুঁজিবাদী ব্যবস্থায় প্রতিটি পতনই একটি বড় উত্থানের পূর্বলক্ষণ। ফলে তারা যখন বাজারে রক্ত ঝরতে দেখে, তখন ভয়ে পিছিয়ে না গিয়ে বরং আগ্রাসীভাবে বিনিয়োগ করে। এই বৈষম্য কেবল সম্পদের নয়, বরং সুযোগ এবং মানসিকতারও। অস্থিরতার এই দীর্ঘমেয়াদি প্রভাবে সমাজের মধ্যবিত্ত শ্রেণি বিলুপ্তপ্রায় হয়ে পড়ে এবং সম্পদ গুটিকয়েক পরিবারের হাতে কেন্দ্রীভূত হয়।


অস্থিরতার সময়ে জ্বালানি ও খাদ্যপণ্যের বাজারে যে কৃত্রিম বা প্রাকৃতিক সংকট তৈরি হয়, তার সরাসরি সুবিধাভোগী হয় ১ শতাংশের নিয়ন্ত্রণে থাকা বড় করপোরেশনগুলোও। যখন সাধারণ মানুষ এক লিটার তেলের দাম বাড়লে সংসার চালাতে হিমশিম খায়, তখন তেল উৎপাদনকারী বা সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানগুলো রেকর্ড পরিমাণ 'উইন্ডফল প্রফিট' বা অপ্রত্যাশিত মুনাফা অর্জন করে। এটি এক ধরনের কাঠামোগত শোষণ, যেখানে অস্থিরতাকে পুঁজি করে সম্পদ সাধারণের পকেট থেকে ধনীদের সিন্দুকে চলে যায়।

সম্পূর্ণ আর্টিকেলটি পড়ুন

প্রতিদিন ৩৫০০+ সংবাদ পড়ুন প্রিয়-তে

আরও