পেশায় দলীয়করণে ধ্বংস হচ্ছে নৈতিকতা, মূল্যবোধ ও পেশাদারিত্ব
বিষয়টা নিয়ে আমরা সাধারণত খুব বেশি আলোচনা করি না। অনেকটা স্বাভাবিক বলেই মেনে নিয়েছি। সেটা হলো, আমাদের বিভিন্ন পেশার রাজনীতিকরণ। এই প্রবণতা আমাদের পেশাগত উৎকর্ষতা অর্জনে বাধা দিচ্ছে; মেধাবীদের বদলে মধ্যমদের জায়গা করে দেওয়া হচ্ছে। দক্ষতার জায়গা দখল করেছে আনুগত্য, মুক্ত চিন্তার জায়গা চাটুকারিতা, আত্মমর্যাদার পরিবর্তে এসেছে নির্লজ্জতা। আমরা সত্যনিষ্ঠ হওয়ার চেয়ে মাথা নোয়াতে বেশি আগ্রহী হয়ে উঠছি।
আমাদের অধিকাংশ পেশাজীবী সংগঠন দলীয় আনুগত্যে বিভক্ত। পেশাদারিত্বের চেয়ে দলীয় স্বার্থকে প্রাধান্য দেওয়া হচ্ছে বেশি। আর দলীয় আনুগত্যের আড়ালে এটাকে ব্যবহার করা হচ্ছে ব্যক্তিগত স্বার্থসিদ্ধির জন্যে। যেমন: শীর্ষ পদ দখল বা সুযোগ-সুবিধা গ্রহণ।
আমাদের চিকিৎসক, আইনজীবী, প্রকৌশলী, সাংবাদিকসহ বিভিন্ন পেশার মানুষ প্রকাশ্যেই পেশাদারিত্বকে পেছনে ঠেলে দলীয় স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিচ্ছেন। ফলে সংশ্লিষ্ট পেশাগুলোর মান নেমে গেছে। আমাদের আধুনিকায়ন ও অগ্রগতিকে যে বিষয়গুলো বাধাগ্রস্ত করেছে তার মধ্যে অন্যতম হলো আমলাতন্ত্র, প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর মতো জনসেবা প্রতিষ্ঠানের রাজনীতিকরণ। এসব জায়গায় জনগণের কাছে জবাবদিহি করার বদলে ক্ষমতাসীন দলের প্রতি আনুগত্যে মনোযোগ দৃশ্যমান।
চিকিৎসকদের দিয়েই আলোচনা শুরু করছি। কারণ, এই পেশা সরাসরি আমাদের জীবন-মরণের সঙ্গে সম্পর্কিত। চিকিৎসকদের প্রতিনিধিত্বকারী সংগঠনের মাধ্যমে এই পেশায় রাজনীতিকরণ শুরু হয়েছে কয়েক দশক আগে, বিএনপি ও আওয়ামী লীগের সমর্থনে। কোনো দল ক্ষমতায় এলে তাদের সংশ্লিষ্ট সংগঠনগুলো কার্যত স্বাস্থ্যখাত পরিচালনার দায়িত্ব নিয়ে নেয়। সরকারি গুরুত্বপূর্ণ পদায়ন ও নতুন নিয়োগ, এমনকি তহবিল বণ্টন ও বড় প্রকল্পের ক্ষেত্রেও তাদের প্রভাব দেখা যায়।
চিকিৎসক হিসেবে একজন কতটা সফল সেটা নয়, বরং এসব সংগঠনে তিনি কতটা ক্ষমতাবান সেটাই হয়ে ওঠে আসল মাপকাঠি। জনসেবা যার মৌলিক নীতি, সেই স্বাস্থ্যখাত কি এভাবে পরিচালিত হতে পারে? স্বাধীনতার ৫৫ বছর পরও এই খাতের দুরবস্থার দিকে তাকালেই তার উত্তর পাওয়া যায়।
অবশ্যই প্রত্যেক চিকিৎসকের রাজনৈতিক মতাদর্শ থাকতে পারে এবং তিনি ইচ্ছা করলে দলীয় কর্মকাণ্ডেও অংশ নিতে পারেন। কিন্তু নীতি, অগ্রাধিকার, সিদ্ধান্ত ও নিয়োগের সবকিছুতে রাজনীতি ও দলীয়করণকে প্রাধান্য দেওয়া আত্মঘাতী।
শিক্ষক, বিশেষ করে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের রাজনীতিকরণ ও দলীয়করণ আমাদের উচ্চশিক্ষাকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। শিক্ষকদের আলাদা আলাদা প্যানেল রয়েছে। সাদা, নীল ও গোলাপি প্যানেল যথাক্রমে বিএনপি-জামায়াত, আওয়ামী লীগ ও বামপন্থীদের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট। এগুলো শিক্ষকদের মধ্যে গভীর বিভাজন সৃষ্টি করেছে, যা আমাদের অধিকাংশ পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক পরিবেশকে মারাত্মকভাবে প্রভাবিত করেছে। গুরুত্বপূর্ণ পদায়ন, বৃত্তি প্রদান ও গবেষণা তহবিল বরাদ্দসহ সবই নির্ধারিত হয় দলীয় বলয়ে থাকার ওপর। উপ-উপাচার্য, প্রক্টর, হল প্রভোস্ট এমনকি হাউস টিউটর নিয়োগেও স্পষ্ট পক্ষপাতিত্ব দেখা যায়। পাণ্ডিত্য এখন আর সাফল্যের শর্ত নয়।
দলীয় শিক্ষক গোষ্ঠীগুলো ধীরে ধীরে একই ধারার রাজনৈতিক ছাত্রসংগঠনের সঙ্গে যুক্ত হয়ে পড়ে। ফলে শিক্ষক-শিক্ষার্থীর মধ্যে এমন এক লজ্জাজনক সমীকরণ তৈরি হয়, যা শালীনতা ও সৌজন্যের সব সীমা ছাড়িয়ে যায় এবং সাফল্যের একমাত্র মানদণ্ড হয়ে দাঁড়ায় দলীয় পরিচয়। দলীয় শিক্ষার্থীরা বিরোধী মতের শিক্ষকদের অপমান করতে সাহস পায় এবং অনেক সময় আড়াল থেকে একই রাজনৈতিক মতাদর্শের শিক্ষকদের উৎসাহে বিরোধী মতের শিক্ষকদের ওপর শারীরিক হামলাও চালায়।
খুব সহজেই বোঝা যায়, কীভাবে এসব বিশ্ববিদ্যালয়ে একাডেমিক পরিবেশ প্রায় পুরোপুরি নষ্ট হয়ে গেছে এবং পেশিশক্তি ধীরে ধীরে চিন্তা, মতামত ও বাকস্বাধীনতার ওপর প্রাধান্য বিস্তার করেছে। যারা একাডেমিক কাজে নিবেদিত ছিলেন, তারা ধীরে ধীরে প্রান্তিক হয়ে পড়েন এবং টিকে থাকার তাগিদে একেবারে চুপ হয়ে যেতে বাধ্য হন।
এসব প্রতিষ্ঠানের সবচেয়ে বড় ক্ষতি হয়েছে সম্ভবত রাজনৈতিক বিবেচনায় উপাচার্য নিয়োগের মাধ্যমে। তাদের অনেকেই হয়তো এ পদে নিয়োগের জন্য ন্যূনতম যোগ্যতাও রাখতেন না। কিন্তু, নিজেদের অনুগত শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের নিয়ে গোষ্ঠী তৈরি করে বিশ্ববিদ্যালয়কে ব্যক্তিগত সাম্রাজ্যের মতো পরিচালনা করেছেন। ফলে একাডেমিক পরিবেশ পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে গেছে। দুঃখজনকভাবে, অন্তর্বর্তী সরকারও উপাচার্য নিয়োগে এই প্রবণতা থেকে বেরিয়ে আসতে পারেনি।
সারাদেশের স্বনামধন্য কলেজগুলোর অধ্যক্ষ নিয়োগেও দুর্ভাগ্যজনকভাবে একই ধারা অনুসরণ করা হয়েছে। যারা দলীয় আনুগত্যের কারণে এসব পদ পেয়েছেন, তারা প্রতিষ্ঠান পরিচালনায় স্থানীয় সংসদ সদস্য ও ছাত্র সংগঠনের প্রতি বেশি দায়বদ্ধ থাকেন।
এই দুই ধরনের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেই মেধা ও বিদ্যাচর্চা ধীরে ধীরে বিলীন হয়ে গেছে। ফলে শিক্ষার্থীরা হয়েছে রাজনীতিকরণের করুণ শিকার।
এবার আসি আমার নিজের পেশা সাংবাদিকতায়। এই পেশাও রাজনীতিকরণের শিকার। চিকিৎসক ও শিক্ষকদের মতো সাংবাদিকরাও দলীয়ভাবে বিভক্ত। হয়তো এর শুরু আরও আগে, কিন্তু ১৯৯১ সালের পর থেকে আমরা স্পষ্টভাবে দেখেছি, ক্ষমতাসীন দল-ঘনিষ্ঠ সাংবাদিকরা সংশ্লিষ্ট পেশাজীবী সংগঠনগুলো নিয়ন্ত্রণ করে। তারা সরকারি সব ধরনের সহায়তা, বিদেশে প্রেস উইংয়ে নিয়োগ ও সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা পান।
শেখ হাসিনার ১৫ বছরেরও বেশি সময়ের শাসনামলে কোনো সরকারি অনুষ্ঠানে আমরা বিএনপিপন্থী সাংবাদিক প্রায় দেখিইনি। এমনকি জাতীয় প্রেসক্লাবেও না। ঠিক যেমন এখন সেখানে আওয়ামী লীগপন্থী সাংবাদিক দেখাই যায় না।
- ট্যাগ:
- মতামত
- দলীয়করণ
- পেশাজীবী সংগঠন