শ্রমিকের আইনি সুরক্ষা, চাকরির নিরাপত্তা ও ন্যূনতম মজুরি নিশ্চিতকরণ
আজ মে দিবস। দিবসটি শ্রমিকদের নিজস্ব দিবস হিসেবে সচেতন মহলের কাছে স্বীকৃত। ১ মে আমাদের দেশে ছুটির দিন। দেশের বিভিন্ন স্থানের সচেতন শ্রমিকরা এই দিবসটি তার নিজস্ব দিবস হিসেবে উদযাপন করে। এই দিবসে সরকারের নানা কর্মসূচি এবং বিভিন্ন সংগঠন তাদের কর্মসূচি সংগঠিত করে।
আমাদের দেশের বাস্তবতায় শ্রমিক সংগঠনের মধ্যে বিভিন্ন সংগঠন নানাভাবে শ্রমিকদের সংগঠিত করে এই দিন রাজপথে উৎসবের আমেজ নিয়ে আসে। অবশ্য দিবসটিতে উৎসবের আমেজ থাকবে নাকি নিজস্ব দাবি দাওয়া সামনে রেখে ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ ঘটবে তা নির্ভর করে যে সময় দিবসটি পালিত হচ্ছে তার আগের ঘটনাবলী কি অথবা আগামী দিনে কী হতে যাচ্ছে তার ওপর।
এবারের মে দিবস পালিত হতে যাচ্ছে বেশ কয়েক বছর ধরে কোভিড সংকট, কর্তৃত্ববাদী স্বৈরাচারী সরকারের ভোটবিহীনতা অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের আশাহত করার দিনগুলো উত্তরণের পর একটা ভোটের মাধ্যমে গঠিত সরকারের সময়ে।
উল্লেখিত সময়গুলোয় হিসাব করলে দেখা যায় এ সময় কলকারখানা বন্ধ হয়েছে, বেকারত্ব বেড়েছে, শ্রমিকের ন্যূনতম জাতীয় মজুরি ঘোষিত হয়নি, কর্মসংস্থানের ক্ষেত্র বাড়ছে না বরং আগামী দিনে নতুন অর্থনৈতিক সংকটের খবরাখবর সামনে আসছে।
পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে সাম্রাজ্যবাদের চাপিয়ে দেওয়া যুদ্ধ, আমাদের দেশের ওপরে আধিপত্য বিস্তারে নানা ধরনের পদক্ষেপের খবর সামনে আসছে। বিশেষ করে সাম্প্রতিক সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের সাথে বাণিজ্য চুক্তির নামে যা হচ্ছে তা আমাদের অর্থনীতি এবং রাজনীতিকে আরও বিপর্যস্ত করে তুলবে।
এ ধরনের সংকট অব্যাহত থাকলে প্রথম ভুক্তভোগী হবে দেশের সাধারণ শ্রমজীবী খেটে খাওয়া মানুষ। সাধারণ শ্রমজীবী মানুষের দৈনন্দিন জীবনযাপন আরও কঠিন হয়ে উঠবে। সাধারণভাবে এটা সবাই জানে ১৮৮৬ সালে শ্রমিকদের রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের মধ্য দিয়ে শ্রমিক শ্রেণীর অধিকার আদায়ের সংগ্রাম, নতুন মাত্রা পায়।
এরপর শ্রমিকদের অধিকার আদায়ের দিবস হিসেবে পহেলা মে পালনের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয় এবং তা পৃথিবীর দেশে দেশে নিজস্ব বাস্তবতা অনুযায়ী পালিত হয়ে আসছে। অতীতে এবং এখনো সমাজতান্ত্রিক দেশগুলোয় যে ধরনের অঙ্গীকারের মধ্য দিয়ে এই দিবসটি পালিত হতো বা হচ্ছে, পুঁজিবাদী দেশগুলোয় একইভাবে পালিত হয় না। তারপরও পৃথিবীর প্রায় সব দেশে এই দিবসটি বিশেষ মর্যাদা নিয়েই পালিত হয়।
বর্তমান সময়ে বিজ্ঞানের অভূতপূর্ব অগ্রগতিতে শ্রমিক শ্রেণীর কাজের পরিধি কমিয়ে আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স অর্থাৎ এআই ভিন্নমাত্রায় জায়গা করে নিচ্ছে। এই ভিন্নমাত্রার জায়গা করতে গিয়ে শ্রমিকের জ্ঞান, অভিজ্ঞতাকে ব্যবহার করা হচ্ছে। অথচ বিভিন্ন জায়গায় শ্রমিক ছাঁটাই অব্যাহত থাকছে।
শ্রমিক শ্রেণীর জীবনে এক নবতর পরিস্থিতির উদ্ভব হয়েছে। এই প্রেক্ষিতও শ্রমিককে উপেক্ষা করে কোনোকিছু চালানোর এখন পর্যন্ত কেউ চিন্তা করতে পারছেন না। এরপরও শ্রমিক শ্রেণীকে বিশ্বব্যাপী আগামী দিনে প্রযুক্তির এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করেই টিকে থাকতে হবে।
আমাদের দেশে শ্রমিক শ্রেণী এখনো পর্যন্ত শ্রমিকের ন্যূনতম মর্যাদা পর্যন্ত পাচ্ছেন না। শ্রমিকের পরিপূর্ণ মর্যাদার কথা শ্রেণীবিভক্ত সমাজে সম্ভব হবে না। তারপরও ন্যূনতম অধিকারের কথা বিবেচনার কথা বললে আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (আইএলও) শ্রমিকের যে অধিকারের কথা বলেছেন তার সব স্বীকৃতি আমাদের দেশের শ্রমিকরা এখনো পর্যন্ত অর্জন করতে পারেনি।
সর্বত্র শ্রমিকদের ট্রেড ইউনিয়ন করার স্বীকৃতি পর্যন্ত নেই। কাগজে থাকলেও প্রকৃতপক্ষে বাস্তবায়ন নেই। নীতিনিষ্ঠ ট্রেড ইউনিয়ন নিয়ে নানা জটিলতা থাকলেও এক্ষেত্রে মালিকদের নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গিই অন্যতম বাধা হয়ে দাঁড়ায়।
সাদামাটা হিসাব করেই দেখুন, সর্বত্র প্রতিদিন ন্যূনতম ৮ ঘণ্টা কাজের স্বীকৃতি ও বাস্তবায়ন, কাজের মানসম্পন্ন পরিবেশ, আগামীকালের কাজের নিশ্চয়তা, অসুস্থতাজনিত বা দুর্ঘটনায় পতিত হলে পর্যাপ্ত প্রাপ্তি ও বৃদ্ধ বয়সে প্রাপ্য সুযোগ-সুবিধা, ট্রেড ইউনিয়নের অধিকার কি সবাই পাচ্ছেন?
দেশে বেসরকারি ও অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতে কর্মরত শ্রমিক কর্মচারীদের সংখ্যা সবচেয়ে বেশি। এখানে কর্মরত শ্রমজীবী মানুষ এক অনিশ্চয়তা জীবন নিয়েই প্রতিদিন চলছে। শ্রমিকের আলোচনা উঠলে আমাদের চোখের সামনে শহরে বা শহরতলিতে বিভিন্ন কলকারখানায় কাজের সাথে জড়িত মানুষের চেহারাটাই প্রধান হয়ে আসে।
শুধু কি তাই? আমাদের দেশের কৃষক খেতমজুরসহ গ্রামে-গঞ্জে থাকা অজস্র মানুষ আর শহরে থাকা নানা ধরনের পেশায় নিয়োজিত মানুষের হিসাব আমরা অনেক সময় এই শ্রমিকদের হিসাবের মধ্যে আনি না। এখানে আট ঘণ্টা কাজ, আট ঘণ্টা বিনোদন, আট ঘণ্টা ঘুম, সারা বছর কাজের নিশ্চয়তা এবং ভবিষ্যতের নিশ্চয়তার মধ্যে আনি না।
- ট্যাগ:
- মতামত
- মহান মে দিবস