নারী শ্রমিকের প্রয়োজন নিরাপত্তা, সমতা ও মর্যাদা

কালের কণ্ঠ সাহিদা পারভীন শিখা প্রকাশিত: ০১ মে ২০২৬, ১১:৪৫

শ্রমিকদের ন্যায্য অধিকার আদায়ের সংগ্রামে আত্মত্যাগের স্মরণে বিশ্বজুড়ে মহান মে দিবস পালিত হয়। শ্রমিকদের অধিকার ও মর্যাদা রক্ষার আন্দোলনে প্রেরণা দানকারী এই দিনটির সূচনা হয়েছিল ১৮৮৬ সালে আমেরিকার শিকাগো শহরের হে মার্কেটের শ্রমিক আন্দোলনের মাধ্যমে। আট ঘণ্টা কাজ ও ন্যায্য মজুরির দাবিতে শান্তিপূর্ণ সমাবেশে পুলিশ গুলি চালায়। গুলিতে ১০ জন শ্রমিক নিহত এবং অনেক শ্রমিক আহত হন।

শ্রমিকদের রক্তপাতের মাধ্যমে যে ইতিহাস সৃষ্টি হয়েছিল, তারই ধারাবাহিকতায় বিশ্বজুড়ে এই দিবসটি যথাযোগ্য মর্যাদায় পালিত হয়। দেশের মূল চালিকাশক্তি হলো শ্রমজীবী মানুষ। শ্রমিকরা কাজ করেন বলেই দেশের অর্থনীতির চাকা সচল থাকে। আর এই শ্রমজীবী মানুষের উল্লেখযোগ্য অংশ হলো নারী।

বর্তমানে আমাদের দেশে নারীরা আর ঘরের কোনায় বসে নেই। তাঁদের অনেক কাজের ক্ষেত্র তৈরি হয়েছে। নারীর কর্মসংস্থানের বৈপ্লবিক পরিবর্তন আসে আশির দশকের গার্মেন্টসশিল্প বিকাশের মাধ্যমে। কৃষি, তৈরি পোশাক শিল্প, অনানুষ্ঠানিক খাত থেকে শুরু করে করপোরেট জগৎ—সর্বত্রই নারীর অংশগ্রহণ আজ দৃশ্যমান।

শহর-বন্দর, গ্রামাঞ্চলেও নারীরা প্রয়োজনের তাগিদে এবং স্বাধীন চেতনাবোধ থেকে কাজ করতে আসছেন। মাটি কাটা, ইট ভাঙা, নির্মাণ, গার্মেন্টস, শিক্ষকতা, বিপণিবিতান, ব্যবসা-বাণিজ্য, আইন-আদালত, চিকিৎসাসেবা, প্রশাসন, সামরিক বাহিনী, পুলিশ ও আনসার বাহিনীসহ এমন কোনো ক্ষেত্র নেই, যেখানে নারীর অংশগ্রহণ নেই।


বিবিএসের ২০২৪ সালের শ্রমশক্তি জরিপ অনুযায়ী, দেশের মোট শ্রমশক্তির প্রায় ৪৪.২ শতাংশ নারী, যা নারীর অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। গ্রামীণ কৃষি ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা হিসেবেও নারীরা সরাসরি ভূমিকা রাখছেন। অর্থনীতিতে নারীর এই নীরব অবদান, বিশেষ করে গৃহস্থালি কাজ, যা জাতীয় আয়ে সরাসরি যুক্ত হয় না, তার আর্থিক মূল্যও অপরিসীম।

প্রবাসী শ্রমিকদের একটি বিরাট অংশ হলো নারী শ্রমিক। গ্রামীণ অর্থনীতি ও গ্রামীণ স্বাস্থ্যসেবার মূল কারিগর হলেন নারীরা। বাংলাদেশের ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্পের পাশাপাশি ই-কমার্সভিত্তিক প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমেও নারীরা অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে সরাসরি ভূমিকা রাখছেন। কিন্তু নারীরা শ্রমজীবী মানুষের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে পরিগণিত হলেও সামাজিকভাবে তাঁরা শোষণ, বৈষম্য, বঞ্চনা ও অবিচার থেকে মুক্ত নন। নারী শ্রমিকরা তাঁদের কর্মক্ষেত্রে মারাত্মকভাবে অবহেলিত। নারীসমাজ বৈষম্য, অশিক্ষা, কুসংস্কার ইত্যাদি নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গিসহ অন্যান্য সামাজিক অনাচারের আঘাতে জর্জরিত। আবার কর্মক্ষেত্রে এসেও তারা বিভিন্ন সমস্যা, বৈষম্য, হয়রানি ও নির্যাতনের শিকার হয়। কম ও অনিয়মিত মজুরি, অতিরিক্ত পরিশ্রম, অস্বাস্থ্যকর কর্মপরিবেশ, নিরাপত্তার অভাব, সাপ্তাহিক ছুটি, মাতৃত্বকালীন ছুটি না পাওয়া, যৌন নির্যাতনসহ বিভিন্ন সমস্যার মধ্যে নারী শ্রমিকদের দিন কাটে।


নারীরা পুরুষের সমান কাজ করলেও মজুরি ও মর্যাদার ক্ষেত্রে চরম বৈষম্যের শিকার হন। বিআইডিএসের গবেষণায় দেখা গেছে, কর্মক্ষেত্রে পুরুষের তুলনায় নারীর মনোযোগ বেশি থাকলেও একজন পুরুষ শ্রমিক যেখানে দৈনিক ৩৬১ টাকা পান, নারী শ্রমিক পাচ্ছেন মাত্র ২৭৪ টাকা। অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতে এই বৈষম্য আরো বেশি। উচ্চপদে বা সুপারভাইজার লেভেলে নারীদের অংশগ্রহণ খুবই কম। বেশির ভাগ নারী অপারেটর বা হেল্পার লেভেলে আটকে থাকেন। পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতার কারণে নারী শ্রমিকরা ‘হালকা কাজ’ করছেন বলে অবমূল্যায়িত হন, এমনকি একই ধরনের কাজের জন্যও কম মজুরি পান। নারী শ্রমিকদের জন্য কর্মক্ষেত্র এবং যাতায়াতব্যবস্থা এখনো পুরোপুরি নিরাপদ নয়। গবেষণায় দেখা গেছে, প্রায় ৭২ শতাংশ নারী শ্রমিক মৌখিক হয়রানির শিকার হন। অথচ বাংলাদেশের সংবিধান, শ্রম আইন, জাতীয় নারী উন্নয়ন নীতিমালা, আইএলও ও সিডও সনদে নারীদের অধিকার ও দাবিদাওয়ার বিষয়ে বৈষম্যহীন অবস্থানের পক্ষে সুস্পষ্ট বক্তব্য রয়েছে।


দেশের শিল্প খাতে এক গভীর সংকট প্রত্যক্ষ করা যাচ্ছে। বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দা, রপ্তানি আদেশ কমে যাওয়া, জ্বালানিসংকট, ডলার সংকট ও উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি—এসব কারণে অনেক কারখানা আংশিক বা সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে গেছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়েছে শ্রমিকদের ওপর। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন নারী শ্রমিকরা। বিশেষ করে পোশাকশিল্পসহ বিভিন্ন রপ্তানিমুখী খাতে ব্যাপক ছাঁটাই হয়েছে, যেখানে নারী শ্রমিকদের অগ্রাধিকার ভিত্তিতে ছাঁটাই করা হয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে বিনা নোটিশে বকেয়া মজুরি পরিশোধ ছাড়াই শ্রমিকদের কাজ থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে। মাতৃত্বকালীন ছুটিতে থাকা নারী শ্রমিকরাও চাকরি হারিয়েছেন। কারখানা বন্ধের ফলে হাজার হাজার নারী শ্রমিক অনিশ্চিত জীবনের মুখোমুখি হয়েছেন। অনেকে বাধ্য হয়ে কম মজুরিতে অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতে কাজ নিচ্ছেন, আবার অনেকে বেকারত্ব ও দারিদ্র্যের ঝুঁকিতে পড়েছেন। এই পরিস্থিতি শুধু অর্থনৈতিক সংকট নয়, এটি সামাজিক ও মানবিক সংকটও।


মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে কর্মরত বিপুলসংখ্যক বাংলাদেশি প্রবাসী শ্রমিকের মধ্যে উল্লেখযোগ্য অংশ নারী, যাঁরা গৃহশ্রম, সেবা ও বিভিন্ন খাতে কাজ করছেন। যুদ্ধ, রাজনৈতিক অস্থিরতা ও নিরাপত্তাহীনতা তাঁদের জীবন ও জীবিকাকে মারাত্মক ঝুঁকির মুখে ফেলতে পারে। হঠাৎ কর্মচ্যুতি, বকেয়া বেতন, নির্যাতন, যোগাযোগ বিচ্ছিন্নতা এবং দেশে ফিরে আসার অনিশ্চয়তা—এসব ঝুঁকি বিশেষ করে নারী শ্রমিকের ক্ষেত্রে আরো প্রকট। কিন্তু শ্রমিক হিসেবে একজন নারী দেশের প্রচলিত আইন অনুযায়ী শ্রমিকদের জন্য সংরক্ষিত সব আইনগত অধিকারের অংশীদার। নির্দিষ্ট কর্মঘণ্টা, ন্যায্য মজুরি, সাপ্তাহিক ছুটি, জবরদস্তিমূলক শ্রম থেকে রক্ষা পাওয়া, উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ, সংগঠন করার অধিকার, যৌথ দর-কষাকষির অধিকার একজন শ্রমিকের ন্যায়সংগত অধিকার। একজন শ্রমিক হিসেবে নারী শ্রমিক এসব অধিকারের সমান অংশীদার। এসব আইনানুগ অধিকার ছাড়াও নারী শ্রমিকদের জন্য রয়েছে বিশেষ কিছু অধিকার।

সম্পূর্ণ আর্টিকেলটি পড়ুন

প্রতিদিন ৩৫০০+ সংবাদ পড়ুন প্রিয়-তে

আরও