মেট্রোরেলের মতো আধুনিক ও সুশৃঙ্খল গণপরিবহন–ব্যবস্থার সঙ্গে একই সমান্তরালে ফিটনেসবিহীন ও ভাঙাচোরা বাস কীভাবে ঢাকার যোগাযোগব্যবস্থার অংশ হতে পারে, সেটা কোনো যুক্তিতেই বোধগম্য নয়। এটা হতাশাজনক হলেও সত্যি, গত দুই দশকে কয়েকবার সরকার বদল হলেও ঢাকার সড়কে চলাচলকারী বাস বদল হয়নি। এই মেয়াদোত্তীর্ণ পরিবহন নগরবাসীর অশেষ দুর্ভোগ, বঞ্চনা ও অপমানের কারণ হয়ে উঠেছে। একদিকে যেমন দুর্ঘটনা, প্রাণহানি ও নৈরাজ্য তৈরি করছে; অন্যদিকে অর্থনৈতিক ও কার্যক্ষমতার আয়ুষ্কাল শেষ হওয়ায় জ্বালানির অপচয় ও পরিবেশদূষণের মাত্রা বাড়াচ্ছে। সামষ্টিক এই ক্ষতির ব্যবস্থা টিকিয়ে রাখা হচ্ছে রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী ক্ষুদ্র একটি গোষ্ঠীর মুনাফার স্বার্থে।
পরিবহন খাতের এই গোষ্ঠীর চাপে বাংলাদেশে বাস–মিনিবাসের আয়ুষ্কাল ২০ বছর করা হয়েছে। এরপরও বিআরটিএর তথ্য বলছে, ঢাকায় নিবন্ধিত বাস–মিনিবাসের মধ্যে ১৬ হাজার ১৯৮টি মেয়াদোত্তীর্ণ। ঢাকায় চলাচলকারী বাস–মিনিবাসের মধ্যে ৩০ শতাংশেরই বয়স ২০ বছর পেরিয়েছে। যদিও এ তথ্যে শুভংকরের ফাঁকি আছে, কেননা ঢাকায় চলাচলকারী বাস–মিনিবাসের মধ্যে একটি বড় অংশ পার্শ্ববর্তী জেলাগুলো থেকে নিবন্ধন নেওয়া হয়েছে। ফলে বাস্তবতা হলো মেয়াদোত্তীর্ণ বাসের হার আরও অনেক বেশি। সারা দেশে নিবন্ধিত বাস–মিনিবাসের প্রায় অর্ধেকেরই মেয়াদ ফুরিয়েছে।
আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ২০১০ সালে মেয়াদ ফুরিয়ে যাওয়া যানবাহন উচ্ছেদের প্রচেষ্টা শুরু হলেও পরিবহনমালিক ও শ্রমিকদের বাধার মুখে কয়েক দফা সময় বাড়িয়েও সেটা ব্যর্থ হয়। বরং পরিবহন খাতে নৈরাজ্য, অব্যবস্থাপনা ও মৃত্যুর মিছিল ব্যাপক জনক্ষোভের জন্ম দেয়। এই পুঞ্জীভূত ক্ষোভের বিস্ফোরণ হয়েছিল ২০১৮ সালে শিক্ষার্থীদের নিরাপদ সড়ক আন্দোলনে। এরপর ফিটনেসবিহীন বাস উচ্ছেদসহ সড়কে শৃঙ্খলা ফেরানোর একগুচ্ছ প্রতিশ্রুতি দেওয়া হলেও বাস্তবে সেটা আর ঘটেনি।
অন্তর্বর্তী সরকারের আমলেও সড়ক পরিবহনব্যবস্থা সংস্কারে জোরালো কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। ফিটনেসবিহীন যানবাহন তুলে দেওয়ার জন্য বিআরটিএ অভিযান শুরু করলেও পরিবহনমালিকদের চাপের মুখে সরে আসতে বাধ্য হয়। সরকার বদল হলেও পরিবহন খাতের ওপর যে কাঠামোগত রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ, তার পরিবর্তন না হওয়াই এর মূল কারণ। আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে পরিবহন খাতের নিয়ন্ত্রণ ছিল দলটির নেতা–কর্মীদের হাতে। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর পরিবহন খাত ও সমিতিগুলোর নিয়ন্ত্রণ বিএনপির নেতা–কর্মীদের হাতে চলে যায়।
গণপরিবহনব্যবস্থার এই বিশৃঙ্খলা ও নৈরাজ্য টিকে থাকে বলেই এ খাত কোটি কোটি টাকার চাঁদাবাজির উৎস হয়ে থাকতে পারে। ২০২৪ সালের মার্চ মাসে টিআইবির গবেষণা থেকে জানা যাচ্ছে, ব্যক্তিমালিকানাধীন বাস থেকে বছরে ১ হাজার ৫৯ কোটি টাকা চাঁদা তোলা হয়। এর ভাগ পান রাজনৈতিক দলের নেতা–কর্মী, পুলিশ ও বিআরটিএর কর্মচারী–কর্মকর্তারা। ফলে পরিবহন খাত ঘিরে যে শক্তিশালী অসাধু চক্র গড়ে উঠেছে, তারাই এ খাতের সংস্কার প্রচেষ্টার বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে যায়। অথচ সড়কে ফিটনেসবিহীন যানবাহন উঠিয়ে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা করা গেলে সেটা যেমন নাগরিকদের জন্য স্বস্তি ও নিরাপত্তার কারণ হতো, আবার পরিবহনচালকদের জন্যও সড়ক আরও নিরাপদ হতো।
- ট্যাগ:
- মতামত
- নৈরাজ্য
- ফিটনেসবিহীন গাড়ি