বন্দর পরিচালনা পরিবেশবান্ধব করতে ডিজিটাইজেশনের বিকল্প নেই
চিরায়ত বাংলা প্রবাদ অনুসারে আদার ব্যাপারীর কাছে জাহাজের খবর হয়তো খুব একটা গুরুত্ববহ নয়। কিন্তু নিত্যপণ্য বাণিজ্যে বিশ্বায়নের এই যুগে প্রবাদটি অনেকটাই প্রাসঙ্গিকতা হারিয়েছে। সমুদ্র বাণিজ্যের প্রসার এখন এতটাই বেশি, আদার ব্যাপারীকেও এখন জাহাজের খবর রাখতে হয়।
মুদিদ্রব্য থেকে শুরু করে বিলাসপণ্য, গৃহস্থালি ইলেকট্রনিক সামগ্রী থেকে শুরু করে শিল্প-কারখানার মূলধনী যন্ত্রপাতি, ভোগ্যপণ্য থেকে শুরু করে শিল্পের কাঁচামাল—সবকিছুর সরবরাহব্যবস্থাই সমুদ্র বাণিজ্যের ওপর নির্ভরশীল। এ জন্যই সমুদ্র পরিবহন খাতকে বলা হয় বৈশ্বিক অর্থনৈতিক প্রবাহের ধমনি। আর সমুদ্রবন্দর হলো হৃত্স্পন্দন। এই হৃত্স্পন্দনকে সচল রাখার সঞ্জীবনী অনুষঙ্গ হলো জাহাজ চলাচল।
চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান হিসেবে আমার কাছে বন্দরে আসা জাহাজগুলোর মাহাত্ম্য অনেক বেশি। আমার কাছে এগুলো নিছকই একেকটি পণ্যবাহী বাহন নয়, একই সঙ্গে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রার আকাঙ্ক্ষা, বাজার স্থিতিস্থাপকতা এবং বৈশ্বিক বাণিজ্যে মর্যাদাপূর্ণ ও ন্যায্য অবস্থানের দাবির প্রধান অবলম্বনও। একসময় উৎপাদন কার্যক্রম ছিল পুরোপুরি আঞ্চলিক চাহিদানির্ভর। স্থানীয় বাজারের চাহিদা অনুযায়ীই পণ্য (কৃষিজ ও শিল্পজাত) উৎপাদন করা হতো। এরপর এলো বাণিজ্যের চর্চা।
এক অঞ্চলের পণ্য যেতে শুরু করল অন্য অঞ্চলে। সহজলভ্য, সাশ্রয়ী ও গুণগত উন্নতমানের সন্ধানে পণ্য বাণিজ্য ছাড়াল সামুদ্রিক সীমার গণ্ডি। কয়েক শতাব্দী ধরে এই ঐতিহ্যই বৈশ্বিক বাণিজ্য ও বন্দর ব্যবস্থাপনার কাঠামো গড়ে তুলেছিল। কিন্তু এখন বিশ্ব দ্রুত বদলে যাচ্ছে। বাণিজ্য বিস্তৃত হচ্ছে, জলবায়ু সংরক্ষণের চাপ বাড়ছে। এই গতিশীল বিশ্বে ধীরগতির, কাগজনির্ভর ও সম্পদ নিবিড় পুরনো বন্দর ব্যবস্থাপনা কাঠামো আর ভবিষ্যতের চাহিদা পূরণে সক্ষম নয়।
পরিবর্তিত বাংলাদেশে বর্তমান সরকার প্রতিযোগিতা, টেকসই উন্নয়ন ও জাতীয় অগ্রগতির মাধ্যমে ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ রূপকল্পকে এগিয়ে নিচ্ছে। এই রূপকল্পে পরিবেশবান্ধব বন্দর ব্যবস্থাপনা বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে। আর এই রূপান্তরের একটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হলো ডিজিটাইজেশন। বৈশ্বিক প্রতিযোগিতা ও দেশের উন্নয়ন-নেতৃত্বে পটপরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে বন্দর ব্যবস্থাপনায় ডিজিটাল রূপান্তর অপরিহার্য হয়ে উঠেছে।
সমুদ্র বাণিজ্য সব সময়ই উদ্ভাবনের মাধ্যমে বিবর্তিত হয়েছে। পালতোলা জাহাজ থেকে বাষ্পচালিত জাহাজ, ব্রেক-বাল্ক কার্গো থেকে কনটেইনারাইজেশন—প্রতিটি যুগ বৈশ্বিক সমুদ্র সংযোগকে নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করেছে। সমুদ্র পরিবহন খাত এখন আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ যুগসন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। বিশ্বব্যাপী পণ্য পরিবহনের প্রায় ৯০ শতাংশ সমুদ্রপথে সম্পন্ন হয়। এই বিশাল প্রবাহের সঙ্গে অনিবার্যভাবে সম্পৃক্ত রয়েছে কিছু পরিবেশগত প্রভাব, যার মাত্রা একেবারে কম নয়। বন্দরের সেবা নেওয়ার জন্য অপেক্ষমাণ জাহাজ থেকে কার্বন নিঃসরণ হচ্ছে। টার্মিনালের জটও নিঃসরণ বেড়ে যাওয়ার পরোক্ষ কারণ। জাহাজের বর্জ্য সামুদ্রিক প্রতিবেশের ক্ষতি করছে।
উচ্চমাত্রায় জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার নিঃসরণমুক্ত মেরিটাইম খাত গড়ে তোলার পথে বড় প্রতিবন্ধকতা হয়ে দাঁড়িয়েছে। এসব প্রেক্ষাপটে আমাদের সামনে চ্যালেঞ্জ এখন কেবলই ‘কোয়ান্টিটি’র লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করা নয়, একই সঙ্গে ‘কোয়ালিটি’র মানদণ্ড অর্জন করাও। অর্থাৎ সরবরাহ চাহিদা মেটাতে কেবল বেশি পরিমাণে পণ্য পরিবহন করলেই চলবে না, এই পরিবহন কিভাবে আরো বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে, পরিচ্ছন্নভাবে ও দক্ষতার সঙ্গে সম্পন্ন করা যায়, সেদিকেও নজর দিতে হবে।
এখানেই ‘গ্রিন পোর্ট’ ধারণাটি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। গ্রিন পোর্ট কোনো স্লোগান নয়। এটি আসলে পরিবেশগত নেতিবাচক প্রভাব ন্যূনতম রেখে দক্ষ বন্দর পরিচালনার একটি বাস্তবমুখী প্রতিশ্রুতি। ডিজিটাইজেশন গ্রিন পোর্ট উদ্যোগ বাস্তবায়নে মূল চালিকাশক্তি হয়ে উঠতে পারে। ডিজিটাইজেশন পরিচালনাগত দক্ষতা, পরিবেশ সংরক্ষণ ও জলবায়ু সহনশীলতাকে একসূত্রে গেঁথে দেয়। এটি আমাদের সামনে বন্দর কার্যক্রমকে একটি সমন্বিত সিস্টেম হিসেবে উপস্থাপন করে, যেখানে বিলম্ব, অপ্রয়োজনীয়তা ও অদক্ষতা শনাক্ত, পরিমাপ ও দূর করা সম্ভব।
চট্টগ্রাম বন্দরে এই রূপান্তর এরই মধ্যে শুরু হয়েছে। স্বয়ংক্রিয় প্রযুক্তি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ডেটা অ্যানালিটিকসের মতো প্রযুক্তিগত উদ্ভাবন আমাদের পরিচালনকাঠামোকে নতুনভাবে গড়ে তুলছে। ইলেকট্রনিক ডেটা ইন্টারচেঞ্জ (ইডিআই) কাগজনির্ভর কাজের প্রয়োজনীয়তা কমিয়েছে এবং যোগাযোগ দ্রুত করেছে। ভেসেল ট্রাফিক ম্যানেজমেন্ট ইনফরমেশন সিস্টেম (ভিটিএমআইএস) জাহাজ চালনায় সমন্বয় ও নেভিগেশনাল নিরাপত্তা বাড়িয়েছে। ডিজিটাল ই-গেট পাস ও কনটেইনার ট্র্যাকিং সিস্টেম স্বচ্ছতা ও নিয়ন্ত্রণ জোরদার করেছে। আমাদের বিশেষায়িত টার্মিনাল অপারেটিং সিস্টেম (টিওএস) উন্নত পরিকল্পনা, কার্যপ্রক্রিয়া সাজানো ও অবকাঠামোর সর্বোত্তম ব্যবহার নিশ্চিত করছে। আর স্বয়ংক্রিয় পেমেন্ট ব্যবস্থা সেবা প্রদানকে সহজ করেছে।
- ট্যাগ:
- মতামত
- পরিচালনা
- সমুদ্র বন্দর
- ডিজিটাইজিং