উচ্চশিক্ষার সংকট: বিস্তার, অবক্ষয় ও শিক্ষকের ভূমিকা
বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থার ভেতরের বাস্তবতা নিয়ে গভীরভাবে চিন্তা করলে যে দ্বৈত চিত্রটি স্পষ্ট হয়ে ওঠে, তা শুধু পরিসংখ্যানগত বৈপরীত্য নয়, কাঠামোগত সংকটের প্রতিফলনও। একদিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে, অন্যদিকে সেই অনুপাতে মানোন্নয়ন ঘটছে না। এই বিস্তার যেন একটি ভঙ্গুর ভিত্তির ওপর নির্মিত বহুতল ভবনের মতো, যেখানে বাহ্যিক কাঠামো যতই বিস্তৃত হোক না কেন, ভেতরের দুর্বলতা তাকে ক্রমাগত ঝুঁকির দিকে ঠেলে দিচ্ছে।
বর্তমানে দেশে প্রায় ১৭১টি বিশ্ববিদ্যালয় বিদ্যমান, যার মধ্যে ৫৫টি পাবলিক এবং ১১৬টি বেসরকারি। এই সংখ্যাগত বৃদ্ধি নিঃসন্দেহে শিক্ষার সুযোগ সম্প্রসারণের একটি ইতিবাচক দিক নির্দেশ করে। কিন্তু যখন আমরা আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের সঙ্গে তুলনা করি, তখন চিত্রটি উদ্বেগজনক হয়ে ওঠে। বৈশ্বিক র্যাংকিংয়ে বাংলাদেশের কোনো বিশ্ববিদ্যালয় শীর্ষ ৫০০-এর মধ্যেও স্থান পায়নি। এই বাস্তবতা কেবল অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতার কারণে নয়, এর সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত শিক্ষকদের দায়িত্ব পালন, গবেষণার দুর্বলতা এবং পেশাগত অনিয়ম।
বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকতা একটি উচ্চ মর্যাদার পেশা, যেখানে জ্ঞানচর্চা, গবেষণা এবং শিক্ষার্থীদের বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশের দায়িত্ব একসঙ্গে বহন করতে হয়। কিন্তু বাস্তবতা হলো, অনেক ক্ষেত্রে এই দায়িত্ব পালনে গুরুতর ঘাটতি দেখা যাচ্ছে। এমন অভিযোগ রয়েছে যে, কিছু শিক্ষক দিনের পর দিন ক্যাম্পাসে উপস্থিত থাকেন না। এটি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, বরং একটি প্রবণতা, যা শিক্ষাব্যবস্থার গভীরে প্রোথিত হয়েছে। আবার এমনও দেখা যায় যে, শিক্ষক শারীরিকভাবে উপস্থিত থাকলেও কার্যকরভাবে ক্লাস পরিচালনা করেন না, যা এক ধরনের অদৃশ্য অনুপস্থিতি হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।
বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে এই অনুপস্থিতির প্রভাব অত্যন্ত গভীর। এখানে শিক্ষার্থীরা কেবল পাঠ্যবইয়ের জ্ঞান অর্জনের জন্য নয়, বরং স্বাধীন চিন্তা, গবেষণা এবং বিশ্লেষণী দক্ষতা বিকাশের জন্য শিক্ষকদের ওপর নির্ভরশীল। যখন শিক্ষক এই ভূমিকা যথাযথভাবে পালন করতে ব্যর্থ হন, তখন শিক্ষার্থীরা একটি শূন্যতার মধ্যে পড়ে যায়। তারা দিকনির্দেশনা হারায়, তাদের মধ্যে জ্ঞানার্জনের আগ্রহ কমে যায় এবং তারা ধীরে ধীরে পরীক্ষামুখী ও মুখস্থনির্ভর শিক্ষার দিকে ঝুঁকে পড়ে।
প্রান্তিক অঞ্চলের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে এই সমস্যা আরও তীব্র। অনেক শিক্ষক ঢাকাকেন্দ্রিক জীবনযাপনে অভ্যস্ত হয়ে পড়েছেন এবং তাদের কর্মস্থল বিশ্ববিদ্যালয়কে গৌণ গুরুত্ব দেন। ফলে শিক্ষার্থীরা নিয়মিত একাডেমিক সহায়তা থেকে বঞ্চিত হয়। ক্লাস হয় অনিয়মিত, পরামর্শ পাওয়া যায় সীমিত এবং গবেষণার সুযোগ প্রায় অনুপস্থিত। এই বৈষম্য দেশের শিক্ষাব্যবস্থায় একটি গভীর বিভাজন সৃষ্টি করছে, যেখানে কেন্দ্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো কিছুটা এগিয়ে থাকলেও প্রান্তিক প্রতিষ্ঠানগুলো ক্রমাগত পিছিয়ে পড়ছে।
শিক্ষকদের একাডেমিক যোগ্যতা এবং গবেষণার সক্ষমতাও একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের জন্ম দিচ্ছে। বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষা মূলত গবেষণাভিত্তিক হওয়ার কথা, কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে যে, উল্লেখযোগ্য সংখ্যক শিক্ষকের উচ্চতর ডিগ্রি নেই। যখন একজন শিক্ষক নিজেই গবেষণার প্রশিক্ষণ থেকে বঞ্চিত থাকেন, তখন তার পক্ষে শিক্ষার্থীদের গবেষণায় দিকনির্দেশনা দেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। এর ফলে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো জ্ঞান সৃষ্টির কেন্দ্র হিসেবে নিজেদের ভূমিকা পালন করতে ব্যর্থ হয় এবং শিক্ষার্থীরা কেবল তথ্যভিত্তিক জ্ঞান নিয়ে বের হয়, বিশ্লেষণী বা উদ্ভাবনী দক্ষতা অর্জন করতে পারে না।
গবেষণার ক্ষেত্রেও পরিস্থিতি আশাব্যঞ্জক নয়। অধিকাংশ পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় তাদের মোট বাজেটের এক শতাংশেরও কম গবেষণায় ব্যয় করে। এই সীমিত বরাদ্দ একটি মানসম্মত গবেষণা পরিচালনার জন্য যথেষ্ট নয়। অনেক ক্ষেত্রে গবেষণা তহবিলের ব্যবহারেও স্বচ্ছতার অভাব দেখা যায়। ফলে গবেষণা একটি আনুষ্ঠানিকতা হয়ে দাঁড়ায়, যেখানে প্রকৃত জ্ঞান সৃষ্টির পরিবর্তে কাগজে-কলমে কাজ সম্পন্ন করাই মূল লক্ষ্য হয়ে ওঠে।
শিক্ষক-শিক্ষার্থী অনুপাতও একটি বড় সংকট। কিছু প্রতিষ্ঠানে একজন শিক্ষকের বিপরীতে হাজার হাজার শিক্ষার্থী রয়েছে। এই ধরনের পরিস্থিতিতে একজন শিক্ষকের পক্ষে প্রত্যেক শিক্ষার্থীর প্রতি যথাযথ মনোযোগ দেওয়া অসম্ভব। ফলে ক্লাসরুমে আন্তঃক্রিয়া কমে যায়, ব্যক্তিগত দিকনির্দেশনা অনুপস্থিত থাকে এবং শিক্ষার্থীরা একটি যান্ত্রিক শিক্ষার মধ্যে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ে।
নিয়মিত ক্লাস নেওয়া, সময়মতো পরীক্ষা সম্পন্ন করা এবং ফলাফল প্রকাশ করা একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের মৌলিক দায়িত্ব। কিন্তু বাস্তবে দেখা যায়, সেমিস্টার জট দীর্ঘায়িত হয়, ফলাফল প্রকাশে বিলম্ব ঘটে এবং শিক্ষার্থীরা দীর্ঘ সময় অনিশ্চয়তার মধ্যে থাকে। এর পেছনে যেমন শিক্ষক সংকট একটি কারণ, তেমনি দায়িত্ব অবহেলাও একটি বড় কারণ। যখন শিক্ষক নিজেই তার দায়িত্ব সম্পর্কে সচেতন থাকেন না, তখন পুরো শিক্ষাব্যবস্থাই ভেঙে পড়তে শুরু করে।
শিক্ষকদের স্বাধীনতা একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, কিন্তু সেই স্বাধীনতা কখনোই দায়বদ্ধতার বাইরে হতে পারে না। স্বাধীনতা মানে ইচ্ছামতো কাজ করা নয়, বরং দায়িত্বশীলভাবে কাজ করার সুযোগ। একজন শিক্ষক যদি তার দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হন, তবে তার স্বাধীনতা প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়ে। তাই প্রয়োজন একটি ভারসাম্যপূর্ণ কাঠামো, যেখানে স্বাধীনতা এবং জবাবদিহি একসঙ্গে সহাবস্থান করবে।
এই সংকট থেকে উত্তরণের জন্য কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা জরুরি। প্রথমত, শিক্ষকদের নিয়মিত উপস্থিতি নিশ্চিত করতে একটি শক্তিশালী নীতিমালা প্রণয়ন করতে হবে। প্রযুক্তিনির্ভর উপস্থিতি পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা চালু করা যেতে পারে, যেখানে স্বয়ংক্রিয়ভাবে উপস্থিতি রেকর্ড হবে এবং তা মূল্যায়নের অংশ হবে। দ্বিতীয়ত, শিক্ষকদের একাডেমিক কার্যক্রমের নিয়মিত মূল্যায়ন চালু করতে হবে। এতে ক্লাস নেওয়ার নিয়মিততা, গবেষণার মান, শিক্ষার্থীদের প্রতিক্রিয়া এবং প্রশাসনিক দায়িত্ব পালনের বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত থাকবে।
তৃতীয়ত, গবেষণায় বিনিয়োগ বৃদ্ধি করতে হবে। পর্যাপ্ত অর্থায়ন, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা এবং প্রশিক্ষণের সুযোগ নিশ্চিত করা হলে শিক্ষকরা গবেষণায় আগ্রহী হবেন। একই সঙ্গে গবেষণার মানের ওপর গুরুত্ব দিতে হবে, যাতে প্রকৃত জ্ঞান সৃষ্টি হয়। চতুর্থত, শিক্ষক নিয়োগ প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হবে। মেধাভিত্তিক নিয়োগ নিশ্চিত করা গেলে দীর্ঘমেয়াদে শিক্ষাব্যবস্থার মান উন্নত হবে। রাজনৈতিক প্রভাব এবং স্বজনপ্রীতি থেকে মুক্ত একটি পরিবেশ তৈরি করা অত্যন্ত জরুরি।