উদ্বেগজনক শিক্ষাব্যবস্থা

www.ajkerpatrika.com মামুনুর রশীদ প্রকাশিত: ২৫ এপ্রিল ২০২৬, ১১:৫৩

কোনো অন্যায় কাজের বিরুদ্ধে মানুষকে সচেতন করতে আমরা মাঝে মাঝেই ব্যর্থ হই। আমার একজন সহকর্মী যিনি আবার একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক, তিনি বললেন, আসলে যাদের কাছ থেকে আমরা প্রতিবাদ আশা করছি, তারা ন্যায়-অন্যায় বোঝার ক্ষমতা রাখে না। এমন একটা শিক্ষাব্যবস্থার মধ্য দিয়ে তারা বড় হচ্ছে যে, এই বিষয়টি চিহ্নিত করারই ক্ষমতা তাদের নেই। তবে বিভিন্ন সভা-সমাবেশে তারা যায়, হাত তুলে স্লোগান দেয়, শহীদ মিনারে বা প্রেসক্লাসের সামনে গিয়ে আন্দোলনে শরিক হয়। কিছুদিন পর দেখা যায় আন্দোলনটি ভেঙে যাচ্ছে আর তারা ঘরে ফিরে যায়। তবে খুব একটা ব্যথিত হয় না। পুনরায় তাকে আন্দোলনে আনতে প্রচুর সময় লেগে যায়। শুধু যদি আর্থিক কোনো বিষয় নিয়ে আন্দোলন হয়, তাহলে তারা সেই আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়ে।


সেখানে আন্দোলন কতটা সঠিক বা বেঠিক, তা ভাববার অবকাশ থাকে না। আমরা একসময় খুবই সমালোচনামুখর ছিলাম যে ব্রিটিশ ভারতবর্ষে কেরানি সৃষ্টি করতে একটা শিক্ষাব্যবস্থা চালু করেছে। কিন্তু স্বাধীন দেশে আমরা তো কেরানি চাই না, চাই সেইসব মানুষ, যাঁরা ন্যায়-অন্যায় এবং সঠিক সময় সঠিক কাজটি বুঝে করবেন। এবারে বিষয়টি ছেড়ে দেওয়া হয়েছিল বিশেষজ্ঞদের হাতে। তাঁরা প্রথমেই চড়াও হলেন শিশুদের ওপর। শিক্ষার নামে শিশু নির্যাতন শুরু হলো। কাঁধে এত বইয়ের বোঝা চাপানো হলো যে একসময় হাইকোর্ট থেকে সিদ্ধান্ত দেওয়া হলো শিশুর ওজনের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে বইপত্রের ওজন নির্ধারণ করতে হবে। শিশুর পিঠে বইয়ের বোঝা সেই বইয়ের শিক্ষা তার মাথায় গিয়ে পৌঁছাল কি না, সেটা কেউ ভাবল না। শিশুরা হচ্ছে খেলাপ্রিয়। খেলতে খেলতে তারা শিখতে চায়। সেই খেলার অবকাশ থাকল না। নিরানন্দ স্কুল এবং স্কুল থেকে বাড়িতে এসেই আবার কোচিং।

শিক্ষাকে এমনভাবে অর্থকরীতে রূপান্তর করা হয়েছে যে শিক্ষকেরা ক্লাস ছেড়ে কোচিংয়েই আনন্দ পান—স্কুলে নয়। স্কুলে তাঁদের ছাত্রদের সঠিক শিক্ষা দেওয়ার কোনো চ্যালেঞ্জ নেই। অনেকবার কোচিং সেন্টার বন্ধের জন্য চেষ্টা করলেও এটা বন্ধ করা যায়নি। শিক্ষকদের এই যে অর্থ উপার্জনের নেশা, এটা কোনোভাবেই থামানো যাচ্ছে না। কিন্তু যে বিপুল ক্ষতি হচ্ছে, সেটা বোঝার ক্ষমতাও তাঁদের নেই। যে শিশুটি একধরনের চাপের মধ্যে থেকে শুধু নম্বর পাওয়ার ক্ষেত্রে এসএসসি, এইচএসসি, স্নাতক এবং পরবর্তী সময়ে মাস্টার্স পর্যায়ে একই পদ্ধতিতে পড়ালেখা করে যখন বেরিয়ে যায়, তখন তাকে যদি কোনো একটি বিষয়ে প্রশ্ন করা হয় তাহলে সে এর জবাব দিতে পারে না। এর মধ্যে কোনো এক বুদ্ধিমান বিশেষজ্ঞ দল আবিষ্কার করল, এমসিকিউ চালু করা হোক এবং বর্ণনামূলক শিক্ষা কমিয়ে আনা হোক। সেই পরীক্ষা পদ্ধতি চাকরির ক্ষেত্রে চালু করা হলো। শুরু হলো মুখস্থ করার প্রতিযোগিতা। মুখস্থ করা বিষয়গুলো মাথায় বেশি দিন থাকে না, পরীক্ষার কাজটা শেষ হলেই তা উবে যায়। সর্বোপরি যে বিষয়টা হয় তা হলো মেধা বলে কোনো কিছুর সৃষ্টি হয় না। নোট ও গাইড বই নির্ভর করে লাখ লাখ শিক্ষার্থী পাস করে প্রতিবছর এবং শিক্ষকেরাও একটা রুটিন ওয়ার্কের মতো শ্রেণিকক্ষে কোনোমতে কোর্সটা সমাপ্ত করার চেষ্টা করেন। ছাত্র-শিক্ষকের মধ্যে কোনো ধরনের আলোচনার পরিবেশ গড়ে ওঠে না। শিক্ষার্থী যে বিষয়টি বুঝল না, তার জন্য শিক্ষকেরা কোনো দায় নেন না। শিক্ষার্থীরা পাস করে যায় আর শিক্ষকও নিজেকে সফল ভেবে আনন্দিত হয়ে ওঠেন। কারণ, কোচিং সেন্টারের আয়ে তাঁর ফ্ল্যাট কেনা হয়ে গেছে।

শিক্ষার সঙ্গে যুক্ত কিছু লোক তার মধ্যে শিক্ষকেরা তো আছেনই, বোর্ডের কর্মচারী বা কিছু দুর্বৃত্ত প্রশ্নপত্র ফাঁস করে টাকাপয়সা রোজগার করে। মাঝে মাঝে তারা ধরাও পড়ে। প্রচলিত বিচারব্যবস্থা তাদের কী ধরনের শাস্তি দেয়, সেগুলো আমরা জানি না। যারা দক্ষ দুর্বৃত্ত তারা এসবে অভ্যস্ত। তাই জেল-জরিমানার পরোয়া তারা করে না। শিক্ষা বিভাগের অফিসগুলো এসব বিষয় নিয়ে কোনো ভাবনা করাও তাদের কাজ নয় বলে তারা মনে করে। তারা চাকরি করে এবং চাকরি থেকে বেতন-ভাতা ছাড়াও কেউ কেউ উপরি উপার্জনের ধান্ধায় থাকে।


মাউশির একজন মহাপরিচালক একসময় ক্ষুব্ধ হয়ে বলেছিলেন, আমার এই অফিসের ইট-কাঠও ঘুষ খেতে জানে। অফিসগুলোতে শিক্ষকেরা ঘুরে বেড়ান পদোন্নতি-বদলি এবং নানা ধরনের শাস্তি হলে সেখান থেকে পরিত্রাণ পাবার আশায়। শিক্ষার ক্ষেত্রে উচ্চপদস্থ আমলারা সব সময় রাজনৈতিক চাপের মধ্যে থাকেন। তাঁদের প্রতিদিনের চাকরির একটা বড় সময় এই চাপ সামলানোর কাজে ব্যয় হয়ে যায়। শিক্ষকদের বড় ধরনের সংকট হয় অবসরের পর। পেনশন বা চাকরি-পরবর্তী অর্থ আদায়ের জন্য দ্বারে দ্বারে তাঁদেরকে ঘুরতে হয়। যাঁরা কোচিং ব্যবসা করে বিপুল অর্থের মালিক হয়েছেন, তাঁদের কোনো সমস্যা নেই। বেতন তো তাঁদের কাছে একটা নিমিত্ত মাত্র।


আগে আমরা রাষ্ট্রীয় দু-একটি প্রতিষ্ঠানের লোকদের মনে করতাম, তারাই একমাত্র ঘুষ খায়। কিন্তু দেখা গেল এখন সেসব ছাপিয়ে শিক্ষা ও স্বাস্থ্যে বিপুল পরিমাণ ঘুষের কাজ-কারবার চলছে। শিক্ষকেরা যদি ঘুষ লেনদেনের মধ্যে যুক্ত হন, তাহলে তাঁরা শিক্ষা দেবেন কী করে? প্রশ্নটি বহুবার উচ্চারিত হয়েছে। প্রাইমারি শিক্ষকদের চাকরির জন্য ১৬ থেকে ২০ লাখ টাকা ঘুষ দিতে হয়। এখন মূল বিষয়ে আসা যাক, শিক্ষার পদ্ধতি নিয়ে। শিক্ষাকে আনন্দময় করার জন্য নানা ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে, কিন্তু শিক্ষক নিজেই যদি নিরানন্দ থাকেন এবং ঝোঁকটা যদি থাকে অর্থ উপার্জনের দিকে, তাহলে শিক্ষা আনন্দময় হবে কীভাবে? পৃথিবীর দেশে দেশে শিশুদের ওপর কোনো না কোনো চাপ, নিয়ন্ত্রণ, ভর্ৎসনা, বলপ্রয়োগ, বেত্রাঘাত বা শারীরিকভাবে কষ্ট দেওয়া গর্হিত অপরাধ। কিছুদিন আগেই দেখা গেল মাদ্রাসার এক শিক্ষক এক শিক্ষার্থীকে ঝুলিয়ে বেত্রাঘাত করছেন। শিশুটির আর্তনাদ আমাদের বুকে এসে লেগেছে। সেই মাদ্রাসাশিক্ষকের কী শাস্তি হয়েছিল, পরবর্তী সময়ে আমরা তা জানতে পারিনি। মাদ্রাসা, স্কুলে নানা ধরনের শিশুনির্যাতনের ঘটনা মাঝে মাঝে জানা যায়, কিন্তু এসব ঘটনা যদি রোধ করা যায় এবং দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি না দেওয়া হয়, তাহলে মানুষ তৈরির কারখানাটি অচল হয়ে যাবে।


রবীন্দ্রনাথ স্কুলকে যথার্থই কারাগার বলেছেন। নিজে কখনো স্কুলে যাননি। সেটা তো অনেক দিন আগের কথা। আমরা স্বাধীন দেশ পেয়েছি। কিন্তু শিক্ষাক্ষেত্রে স্বেচ্ছাচার, অব্যবস্থাপনা, সিলেবাস বিভ্রান্তি এগুলো বহুগুণে বেড়ে গেছে। এসবকে রক্ষা করার একমাত্র উপায় অভিভাবক এবং এলাকাবাসীকে শিক্ষার বিষয়ে একটা গুরুদায়িত্ব গ্রহণ করতে হবে। স্কুলের ম্যানেজিং কমিটিকে যথার্থ দায়িত্ব পালন করার ব্যবস্থা থাকতে হবে। স্কুল-কলেজের শিক্ষকেরা রাজনীতি করেন এবং অবশ্যই তা সরকারি দলের রাজনীতি। স্কুলের জেলা অফিস, বিভাগীয় অফিস এবং সর্বোচ্চ পর্যায় পর্যন্ত তাঁদের যোগাযোগ থাকে। এই যোগাযোগের ফলে স্কুল কর্তৃপক্ষ ওই শিক্ষকদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারে না।

সম্পূর্ণ আর্টিকেলটি পড়ুন

প্রতিদিন ৩৫০০+ সংবাদ পড়ুন প্রিয়-তে

আরও