বাজেটে যে বিষয়গুলো অগ্রাধিকার পাওয়া উচিত
আগামী অর্থবছরের (২০২৬-২৭) বাজেট প্রণয়নের কাজ শুরু হয়েছে। আমাদের মতো উন্নয়নশীল দেশের জন্য বাজেট প্রণয়ন করা সব সময়ই অত্যন্ত চ্যালেঞ্জিং। আন্তর্জাতিক পরিস্থিতির কারণে আগামী অর্থবছরের জন্য বাজেট প্রণয়নের কাজটি আরও জটিল হয়ে পড়েছে। অর্থমন্ত্রী সম্প্রতি বলেছেন, দেশের অর্থনীতির সব সূচকই নিম্নমুখী রয়েছে। আগামী অর্থবছরের জন্য বাজেট প্রণয়নের ক্ষেত্রে আমাদের অগ্রাধিকারগুলো চিহ্নিত করতে হবে। ঢালাওভাবে বাজেট প্রণয়ন করলে চলবে না। একইসঙ্গে চলতি অর্থবছরের (২০২৫-২৬) বাজেট বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে কোন কোন দিক ভালো হয়েছে, কোন কোন ক্ষেত্রে আমরা প্রত্যাশিত সাফল্য অর্জন করতে পারিনি, সে বিষয়গুলো বিবেচনায় রাখতে হবে। চলতি অর্থবছরের জন্য বাস্তবায়নাধীন বাজেটে কোন কোন খাতে উপযোগিতা না থাকা সত্ত্বেও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে, তা চিহ্নিত করতে হবে। অর্থাৎ চলতি অর্থবছরের জন্য বাস্তবায়নাধীন বাজেটের সীমাবদ্ধতাগুলো চিহ্নিত করে এমনভাবে বাজেট প্রস্তাব প্রণয়ন করতে হবে, যেন আগামী অর্থবছরের বাজেটে একই ভুল আর না হয়।
বাজেট প্রণয়নের ক্ষেত্রে আরও একটি বিষয়ে বিশেষ গুরুত্ব দিতে হবে, তা হলো বাজেট বাস্তবায়নের জন্য কী পরিমাণ অর্থ প্রয়োজন হবে এবং সেই অর্থ কীভাবে এবং কোথা থেকে সংগৃহীত হবে, সেই খাতগুলো নির্ধারণ করা। আগামী অর্থবছরের জন্য অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে কী পরিমাণ সম্পদ পাওয়া যাবে এবং বাইরে থেকে কী পরিমাণ সম্পদ আহরণ করতে হবে, তা নির্ধারণ করতে হবে। দেশের রাজস্ব আহরণের অবস্থা খুব একটা ভালো নেই। চলতি অর্থবছরের প্রথম ৯ মাসে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের শুল্ক-কর আদায়ে ঘাটতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১ লাখ কোটি টাকা। আগের বছরের পুরো সময়ে এ ঘাটতির পরিমাণ ছিল ৯২ হাজার ৬২৬ কোটি টাকা। এ অবস্থায় অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে বাজেট বাস্তবায়নের জন্য পর্যাপ্ত পরিমাণ অর্থ পাওয়ার সম্ভাবনা খুবই কম। ফলে আমাদের বিদেশি ঋণ ও অনুদানের ওপর নির্ভরশীল থাকতে হবে। আগামী অর্থবছরের জন্য উন্নয়ন সহযোগীদের কাছ থেকে ২ বিলিয়ন মার্কিন ডলার ঋণ সহায়তা চাওয়া হবে বলে জানা গেছে। কিন্তু এ পরিমাণ অর্থ সহায়তা পাওয়া যাবে কি না, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে। এমনকি ইন্টারন্যাশনাল মানিটারি ফান্ড (আইএমএফ) ইতঃপূর্বে যে ৪৭০ কোটি মার্কিন ডলার ঋণ অনুমোদন করেছে, তার কিস্তি পাওয়ার ক্ষেত্রেও অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে। সংস্থাটি বলেছে, যথেষ্ট মাত্রায় সংস্কার কার্যক্রম করা না হলে তারা অনুমোদিত ঋণের কিস্তি ছাড় করবে না। অর্থাৎ আগামী অর্থবছরের বাজেট বাস্তবায়নের জন্য অর্থপ্রাপ্তি একটি বড় ধরনের সমস্যা হিসাবে দেখা দিতে পারে। এ অবস্থায় বাজেটে বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্প গ্রহণ ও বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে যথাসম্ভব কৃচ্ছ্রসাধন করতে হবে। আমাদের ট্যাক্স-জিডিপি রেশিও দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে সবচেয়ে কম।
বাজেট অর্থায়নের ক্ষেত্রে ফরেন ডিরেক্ট ইনভেস্টমেন্ট (এফডিআই) কতটা আনা যাবে, তা অনেকটা নির্ভর করবে অভ্যন্তরীণভাবে প্রাইভেট সেক্টর ইনভেস্টমেন্ট কতটা বাড়ানো যাবে, তার ওপর। প্রাইভেট সেক্টর ইনভেস্টমেন্টের চিত্র খুব একটা ভালো নয়। সর্বশেষ পরিসংখ্যানে জানা যায়, দেশের জিডিপি-প্রাইভেট সেক্টর ইনভেস্টমেন্ট রেশিও দাঁড়িয়েছে ২২ দশমিক ৩ শতাংশ। এটি বিগত ১০ বছরের মধ্যে সবচেয়ে কম। এফডিআই আহরণের চিত্রও খুব একটা সন্তোষজন নয়। ২০২৫ সালের অক্টোবর-ডিসেম্বর কোয়ার্টারে যে পরিমাণ এফডিআই আহরিত হয়েছে, তা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ১৮ শতাংশ কম। ২০২৫ সালের অক্টোবর-ডিসেম্বর কোয়ার্টারে বাংলাদেশ মোট ১০ কোটি ৮০ লাখ মার্কিন ডলার এফডিআই আহরণ করেছে। আগের বছরে একই সময় এর পরিমাণ ছিল ১৩ কোটি ২৮ লাখ ১০ হাজার ডলার। আলোচ্য সময়ে পুনঃবিনিয়োগকৃত মুনাফা কমেছে ৩৫ দশমিক ৩১ শতাংশ। ২০২৫ সালের অক্টোবর-ডিসেম্বর কোয়ার্টারে রিইনভেস্টেড আর্নিংস দাঁড়িয়েছে ২১ কোটি ৭৪ লাখ মার্কিন ডলারে। আগের বছর এ সময়ে এটি ছিল ৩২ কোটি ৫৭ লাখ ৫০ হাজার মার্কিন ডলার। বাংলাদেশে অনেকদিন ধরেই বিনিয়োগ অনুকূল পরিবেশের অভাব প্রত্যক্ষ করা যাচ্ছে। রাজনৈতিক ও সামাজিক অস্থিতিশীলতা এবং প্রাতিষ্ঠানিক নানা সীমাবদ্ধতায় প্রাইভেট সেক্টরের উদ্যোক্তারা নতুন বিনিয়োগ সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে অনেকটাই দ্বিধান্বিত। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর অর্থনৈতিক শুমারির ফলাফলে দেখা গেছে, গত এক দশকে বাংলাদেশে অর্থনেতিক ইউনিট বেড়েছে ৫০ শতাংশ। ২০১৩ সালে দেশে অর্থনৈতিক ইউনিট ছিল ৭৮ লাখ। আর ২০২৩ সালে এসে তা ১ কোটি ১৭ লাখে উন্নীত হয়েছে। অর্থনৈতিক ইউনিট যে হারে বেড়েছে, কর্মসংস্থান সেখানে বৃদ্ধি পায়নি। বর্ণিত সময়ে কর্মসংস্থান বেড়েছে ২৫ শতাংশ। অর্থনৈতিক ইউনিট বলতে এমন কোনো স্থান বা প্রতিষ্ঠানকে বোঝায়, যেখানে স্থায়ীভাবে অথবা অস্থায়ীভাবে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে বা ব্যবসায় পরিচালিত হয়। জরিপে অংশগ্রহণকারী উদ্যোক্তাদের ৮৬ শতাংশ জানিয়েছেন, তাদের কর্মকাণ্ড পরিচালনার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় প্রতিবন্ধকতা হচ্ছে মূলধনের অভাব। ব্যাংকগুলো তাদের প্রত্যাশামতো অর্থায়ন করছে না।
দেশের ব্যাংক খাত বর্তমানে অত্যন্ত নাজুক অবস্থায় রয়েছে। বিশেষ করে খেলাপি ঋণ আদায়ের ক্ষেত্রে ব্যর্থতা তাদের ঋণদান ক্ষমতা সংকুচিত করে ফেলেছে। ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার সময় দেশের ব্যাংকিং সেক্টরে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল ২২ হাজার ৪৮১ কোটি টাকা। এখন তা ৫ লাখ ৪৫ হাজার কোটিতে উন্নীত হয়েছে। বাংলাদেশের উদ্যোক্তারা অর্থায়নের জন্য প্রধানত ব্যাংকের ওপর নির্ভর করে থাকে; কিন্তু ব্যাংকগুলো উদ্যোক্তাদের চাহিদামতো ঋণদান করতে পারছে না। উন্নত দেশগুলোয় দীর্ঘমেয়াদি ঋণের জন্য প্রধানত পুঁজিবাজারের ওপর নির্ভর করা হয়; কিন্তু আমাদের দেশের পুঁজিবাজার সেভাবে বিকশিত হয়নি এবং সংশ্লিষ্টদের আস্থা অর্জন করতে পারেনি।
নতুন সরকার চাইবে বাজেটে তার নির্বাচনি ইশতেহারে বর্ণিত অঙ্গীকারগুলো বাস্তবায়ন করতে। সরকার ফ্যামিলি কার্ড প্রদানের উদ্যোগ নিয়েছে। আমার বক্তব্য হচ্ছে, সরকার তার নির্বাচনি অঙ্গীকার বাস্তবায়ন করুন, তাতে কোনো আপত্তি নেই। কিন্তু তার আগে আমাদের জাতীয় অগ্রাধিকারগুলো চিহ্নিত করতে হবে। ঢালাওভাবে নির্বাচনি অঙ্গীকার বাস্তবায়নের উদ্যোগ গ্রহণ করা ঠিক হবে না। যেমন : অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে সরকারি কর্মচারী-কর্মকর্তাদের জন্য নতুন পে-স্কেল প্রতিবেদন ঘোষণা করা হয়েছে। এ পে-স্কেল একবারে বা রাতারাতি বাস্তবায়ন করা ঠিক হবে না। অন্তত তিন ধাপে পে-স্কেল বাস্তবায়ন করা যেতে পারে। বাজেটে শিক্ষা খাতে ব্যয় বাড়ানোর জন্য উদ্যোগ নিতে হবে। ইউনেস্কোর মতে, একটি দেশের শিক্ষা খাতে মোট জিডিপির ৬ শতাংশ বরাদ্দ থাকা প্রয়োজন। আমাদের এখানে শিক্ষা খাতে ব্যয় বরাদ্দের পরিমাণ জিডিপির ২ শতাংশেরও কম। এ অর্থের একটি বড় অংশই অবকাঠামোগত নির্মাণকাজে ব্যয় করা হয়। ফলে শিক্ষা ও গবেষণা উন্নয়নের জন্য অর্থ বরাদ্দ পাওয়া যায় খুবই কম। শিক্ষা খাতে বাজেট বরাদ্দ বাড়াতে হবে। বাস্তব কারণেই একবারে হয়তো জিডিপির ৬ শতাংশ শিক্ষা খাতে বরাদ্দ দেওয়া সম্ভব নয়। তবে ধীরে ধীরে এ খাতে ব্যয় বরাদ্দ বাড়াতে হবে। শিক্ষা উন্নয়ন ব্যতীত কোনো দেশ কাক্সিক্ষত মাত্রায় অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নতি অর্জন করতে পারে না।
- ট্যাগ:
- মতামত
- প্রাকবাজেট আলোচনা
- জাতীয় বাজেট