নতুন সরকারের চ্যালেঞ্জ ও সম্ভাবনা
একটি অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের মাধ্যমে নতুন সরকারের ক্ষমতায় আগমন যে কোনো দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও এটি একইভাবে আশা ও চ্যালেঞ্জের এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে। প্রধানমন্ত্রীসহ অনেক নতুন নেতৃত্বের রাষ্ট্র পরিচালনায় আসা একটি প্রজন্মগত ও কাঠামোগত পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়। তবে ইতিহাস বলে, এ ধরনের পরিবর্তনের প্রাথমিক পর্যায় সাধারণত মসৃণ হয় না; বরং রাষ্ট্রের প্রশাসনিক কাঠামো, প্রতিষ্ঠান এবং রাজনৈতিক সংস্কৃতি একটি অভিযোজন প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যায়। বাংলাদেশের স্বাধীনতাপরবর্তী রাজনৈতিক ইতিহাস বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ১৯৭১ সালে স্বাধীনতা অর্জনের পর যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ পুনর্গঠনের কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হয়েছিল। এরপর ১৯৭৫ সালে রাজনৈতিক পট পরিবর্তন, গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার পর আবার দীর্ঘ সামরিক শাসনের সময়কাল (১৯৮২-১৯৯০) গণতান্ত্রিক ধারাবাহিকতাকে বাধাগ্রস্ত করে। ১৯৯১ সালে সংসদীয় গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার মাধ্যমে একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা হলেও রাজনৈতিক মেরুকরণ, সংঘাতমুখী রাজনীতি এবং শাসনব্যবস্থার নানা দুর্বলতা থেকে দেশ পুরোপুরি মুক্ত হতে পারেনি। এ প্রেক্ষাপটে একটি নির্বাচিত নতুন সরকারের আগমন গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে আরও শক্তিশালী করার একটি সুযোগ হিসাবে বিবেচিত হতে পারে। তাই একটি নতুন সরকারের প্রাথমিক পর্যায়ে কিছু ত্রুটিবিচ্যুতি বা অনিয়ম দেখা দেওয়া অস্বাভাবিক নয়। দলীয়করণ, স্বজনপ্রীতি, চাঁদাবাজি, গণতান্ত্রিক চর্চার ঘাটতি কিংবা জুলাই আন্দোলনের চেতনা থেকে বিচ্যুতি-এ ধরনের বিষয়গুলো শুরুতে দেখা দিতে পারে, বিশেষ করে যখন নেতৃত্ব নতুন হয় এবং প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো পুনর্গঠনের পর্যায়ে থাকে। বিশ্বব্যাপী বহু দেশের অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, এ ধরনের প্রাথমিক সমস্যাগুলো সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সংশোধনের মাধ্যমে একটি সুসংগঠিত শাসনব্যবস্থায় রূপ নিতে পারে।
এক্ষেত্রে সময় একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। কোনো সরকারের সাফল্য শুধু তার প্রাথমিক কার্যক্রম দিয়ে বিচার করা যায় না; বরং তার শেখার ক্ষমতা, ভুল সংশোধনের সদিচ্ছা এবং দীর্ঘমেয়াদি দৃষ্টিভঙ্গিই প্রকৃত মূল্যায়নের মানদণ্ড। একটি দায়িত্বশীল সরকার সমালোচনাকে বিরোধিতা হিসাবে নয়, বরং পথনির্দেশনা হিসাবে গ্রহণ করে। স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে পারলে সরকার সঠিক পথে এগিয়ে যেতে পারে। একই সঙ্গে রাজনৈতিক দল ও সাধারণ জনগণের কাছ থেকেও পরিপক্ব আচরণ প্রত্যাশিত। বাংলাদেশের অতীত অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, হরতাল, অবরোধ ও সহিংস রাজনৈতিক কর্মসূচি দেশের অর্থনীতিকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে অতীতে দেশের অর্থনীতি বিলিয়ন ডলারের ক্ষতির মুখে পড়েছে।
জাতীয় সার্বভৌমত্ব রক্ষা করাও এ মুহূর্তে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে বাংলাদেশ আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক শক্তির প্রভাবের মধ্যে থাকে। অতীতে দেশকে বিভিন্ন কূটনৈতিক ভারসাম্য রক্ষা করে এগিয়ে যেতে হয়েছে। তাই বিদেশি প্রভাব মোকাবিলা এবং স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতি পরিচালনার জন্য একটি স্থিতিশীল ও শক্তিশালী অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক পরিবেশ অপরিহার্য। অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে বাংলাদেশ গত কয়েক দশকে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে। ১৯৭০-এর দশকে যেখানে দেশকে ‘তলাবিহীন ঝুড়ি’ বলা হতো, সেখানে বর্তমানে এটি দক্ষিণ এশিয়ার দ্রুত বর্ধনশীল অর্থনীতির অন্যতম। গত এক দশকে গড়ে ৬-৭ শতাংশ জিডিপি প্রবৃদ্ধি, তৈরি পোশাক খাতের বিস্তার, প্রবাসী আয় এবং সেবা খাতের উন্নয়ন দেশের অর্থনীতিকে শক্তিশালী করেছে। তবে বৈশ্বিক অস্থিরতা, জ্বালানি সংকট এবং ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতা নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে। এ পরিস্থিতিতে অর্থনীতিকে আরও বহুমুখীকরণ, আর্থিক শৃঙ্খলা এবং বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করা জরুরি। জাতীয় নিরাপত্তার ক্ষেত্রেও সশস্ত্র বাহিনীর আধুনিকায়ন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ‘ফোর্সেস গোল ২০৩০’-এর মতো উদ্যোগের মাধ্যমে সেনা, নৌ ও বিমানবাহিনীর সক্ষমতা বৃদ্ধির প্রচেষ্টা ইতোমধ্যেই শুরু হয়েছে। বর্তমান সময়ে সাইবার নিরাপত্তা, সামুদ্রিক নিরাপত্তা এবং আঞ্চলিক অস্থিতিশীলতার মতো নতুন চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় এ আধুনিকায়ন আরও জোরদার করা প্রয়োজন। শিক্ষা খাতেও উন্নয়ন অপরিহার্য। স্বাধীনতার পর যেখানে সাক্ষরতার হার ছিল প্রায় ৩০ শতাংশ, বর্তমানে তা ৭৫ শতাংশের বেশি। তবে মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করা, প্রযুক্তিনির্ভর দক্ষতা বৃদ্ধি এবং শহর-গ্রামের বৈষম্য কমানো এখন সময়ের দাবি।
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়নও সরকারের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ। জনগণের আস্থা অর্জনের জন্য অপরাধ দমন, দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ এবং আইনের নিরপেক্ষ প্রয়োগ নিশ্চিত করা অপরিহার্য। একটি কার্যকর বিচারব্যবস্থা এবং শক্তিশালী প্রশাসনিক কাঠামোই একটি স্থিতিশীল রাষ্ট্রের ভিত্তি। একটি নতুন সরকারের প্রাথমিক পর্যায়ে কিছু সীমাবদ্ধতা থাকতেই পারে, যা ইতিহাসের আলোকে অস্বাভাবিক নয়। গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো-সরকার কোনদিকে এগোচ্ছে। সময়, অভিজ্ঞতা এবং সমালোচনা গ্রহণের মানসিকতার মাধ্যমে সঠিক পথে অগ্রসর হওয়া সম্ভব। একই সঙ্গে রাজনৈতিক দল ও জনগণকে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে, যাতে অপ্রয়োজনীয় অস্থিরতা সৃষ্টি না হয়। বর্তমান বৈশ্বিক ও আঞ্চলিক প্রেক্ষাপটে বিচক্ষণ নেতৃত্ব, জাতীয় ঐক্য এবং সুদূরপ্রসারী কৌশলই বাংলাদেশকে একটি শক্তিশালী, সমৃদ্ধ ও সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসাবে প্রতিষ্ঠিত করতে পারে।
বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) নেতৃত্বাধীন নতুন সরকারের ক্ষমতায় আগমন বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড় নির্দেশ করে। মানুষ শুধু নেতৃত্বের পরিবর্তন চায় না; তারা চায় শাসনব্যবস্থার একটি মৌলিক পরিবর্তন-যেখানে থাকবে জবাবদিহিতা, স্বচ্ছতা এবং জনগণকেন্দ্রিক নীতি। তবে এ যাত্রা সহজ নয়। অতীতের রাজনৈতিক মেরুকরণ, দুর্বল প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো এবং অর্থনৈতিক চাপ-সবকিছুই সরকারের সামনে জটিল বাস্তবতা তৈরি করেছে। ইতিহাস থেকে শিক্ষা নেওয়া এখানে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশের অতীত রাজনীতিতে বারবার দেখা গেছে-প্রতিশোধমূলক রাজনীতি, পারস্পরিক অবিশ্বাস এবং সংঘাতমুখী আচরণ শাসনব্যবস্থাকে দুর্বল করেছে। এই চক্র থেকে বেরিয়ে আসতে হলে নতুন সরকারকে সচেতনভাবে একটি ভিন্নপথ বেছে নিতে হবে। এক্ষেত্রে সবচেয়ে জরুরি বিষয় হলো রাজনৈতিক পরিপক্বতা ও সংযম। সরকারকে অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে এগোতে হবে, নিজেদের অতীত ভুল এবং পূর্ববর্তী সরকারগুলোর ভুল থেকে শিক্ষা নিতে হবে। পুরোনো ধাঁচের দুর্নীতিগ্রস্ত, সংঘাতমুখী রাজনীতি-যেখানে একে অপরকে আক্রমণ, হেয়প্রতিপন্ন এবং প্রতিদ্বন্দ্বীকে নির্মূল করার প্রবণতা ছিল-সেখান থেকে বেরিয়ে এসে পারস্পরিক সম্মান, সহনশীলতা এবং মতের ভিন্নতাকে গ্রহণ করার সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হবে। গণতন্ত্রে মতপার্থক্য স্বাভাবিক, কিন্তু তা যেন শত্রুতায় রূপ না নেয়-এটি নিশ্চিত করা জরুরি।
একই সঙ্গে সরকারের কিছু প্রাথমিক পদক্ষেপ নিয়ে জনমনে উদ্বেগ ও সমালোচনা তৈরি হয়েছে। স্বজনপ্রীতি, দলীয়করণ, চাঁদাবাজি-এ ধরনের অভিযোগ বিশেষভাবে আলোচনায় এসেছে। মন্ত্রীদের আত্মীয়স্বজন বা দলীয় লোকদের বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড, আইসিটিসহ, বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় এবং অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানে নিয়োগ দেওয়ার অভিযোগ জনমনে প্রশ্ন তুলেছে। এসব অভিযোগ সত্য হোক বা না হোক, এর ধারণাটিই সরকারের ভাবমূর্তির জন্য ক্ষতিকর। নতুন সরকারের প্রতি জনগণের আস্থা তখনই টেকসই হবে, যখন তারা দেখবে যে নিয়োগ ও সিদ্ধান্তগুলো যোগ্যতা ও ন্যায়নীতির ভিত্তিতে হচ্ছে। এছাড়া পূর্বে সম্মত কিছু বিষয়, যেমন: জুলাই সনদ এবং গণভোটের প্রশ্ন নিয়ে নতুন করে বিতর্ক সৃষ্টি হওয়াও অস্থিরতার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। নীতিগত ধারাবাহিকতা ও পূর্ব প্রতিশ্রুতির প্রতি সম্মান দেখানো একটি সরকারের বিশ্বাসযোগ্যতা গড়ে তুলতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এক্ষেত্রে কোনো অস্পষ্টতা বা দ্বিধা জনগণের মধ্যে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করতে পারে। জনগণের প্রত্যাশা স্পষ্ট-তারা একটি নতুন, পরিবর্তিত বাংলাদেশ দেখতে চায়। এর অর্থ হলো সুশাসন প্রতিষ্ঠা, দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান এবং শক্তিশালী প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো গড়ে তোলা। সরকারকে নিশ্চিত করতে হবে যে প্রশাসন ও গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানে নিয়োগ হবে মেধা ও যোগ্যতার ভিত্তিতে, কোনো দলীয় আনুগত্যের ভিত্তিতে নয়। একই সঙ্গে জবাবদিহিমূলক ব্যবস্থা শক্তিশালী করা এবং স্বাধীন প্রতিষ্ঠানগুলোকে কার্যকর করা অত্যন্ত জরুরি।