ধরিত্রী রক্ষায় সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন
মাতা ধরিত্রী বা পৃথিবীর বয়স এখন প্রায় চার শ চুয়ান্ন কোটি বছর। পৃথিবী সৃষ্টির প্রায় এক শ কোটি বছর পরে সৃষ্টি হয়েছিল প্রাণের। সেই প্রাণ ছিল এককোষী। মহাকালের পরিক্রমায় সেই প্রাণ থেকে প্রায় তিন লক্ষ বছর আগে সৃষ্টি হয়েছিল আধুনিক মানুষের।
কিন্তু মানব সৃষ্টি, তার বিকাশ তথা সভ্যতার দীর্ঘ পথপরিক্রমায় মাতা ধরিত্রী বর্তমানের মতো কখনোই এত কঠিন সংকটের মধ্যে পড়েনি। এ ধরনের সংকটজনক পরিস্থিতিতে এ বছর (২০২৬) মাতা ধরিত্রী দিবসের প্রতিপাদ্য করা হয়েছে, ‘আমাদের শক্তি, আমাদের ধরিত্রী’।
মূলত পৃথিবীব্যাপী অর্থনৈতিক চাপ, যুদ্ধ এবং জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বিশ্বজুড়ে পরিবেশ সুরক্ষা চাপে পড়েছে। অনেক দেশে পরিবেশসংক্রান্ত নীতিমালা পুনর্বিবেচনা করা হচ্ছে।
এসব নীতির পরিবর্তন মানুষের জীবনযাত্রার খরচ, কৃষি, জ্বালানি, স্বাস্থ্য ও দুর্যোগব্যবস্থায় সরাসরি প্রভাব ফেলে। পরিবর্তিত নীতি বাস্তবায়নে জনসম্পৃক্ততা প্রয়োজন হয়। তাই ‘আমাদের শক্তি, আমাদের ধরিত্রী’ প্রতিপাদ্যটির মাধ্যমে পরিবেশ রক্ষায় এবং এসংক্রান্ত পরিবর্তিত নীতিমালার সঠিক বাস্তবায়নে জনসম্পৃক্ততার গুরুত্বের কথা বোঝানো হয়েছে।
প্রতিবছর ২২ এপ্রিল ধরিত্রী দিবস পালনের মাধ্যমে ধরিত্রী রক্ষায় বিশ্বব্যাপী জনসচেতনতা সৃষ্টির চেষ্টা করা হয়। এই দিবসটি ১৯৭০ সালে যুক্তরাষ্ট্রে শুরু হলেও ১৯৯০ সালে তা প্রথম আন্তর্জাতিকভাবে পালিত হয়। জাতিসংঘ ২০০৯ সালে দিবসটির নামকরণ করে ‘আন্তর্জাতিক মাতা ধরিত্রী দিবস’।
এ বছর এই দিবসটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এই কারণে যে বর্তমানে মাতা ধরিত্রীর পরিবেশ অন্য যেকোনো সময়ের চেয়ে কঠিন ও বিপজ্জনক অবস্থায় উপনীত হয়েছে। ‘ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরাম’-এর করা ‘দ্য গ্লোবাল রিস্কস রিপোর্ট’ (২০২৬)-এ বলা হয়েছে : ‘দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর এখন যেকোনো সময়ের চেয়ে অনেক বেশি রাষ্ট্রভিত্তিক সশস্ত্র সংঘাত চলছে। আমরা এখন সশস্ত্র যুদ্ধ এবং এর ফলে সৃষ্ট অস্থিরতা, কৌশলগত সুবিধার জন্য অর্থনৈতিক অস্ত্রের ব্যবহার এবং বিভিন্ন সমাজের মাঝে ক্রমবর্ধমান বিভাজন লক্ষ করছি।
প্রাকৃতিক দুর্যোগ থেকে অর্থনৈতিক ক্ষতি প্রবলভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে। ভূ-অর্থনৈতিক সংঘর্ষ, রাষ্ট্রভিত্তিক সশস্ত্র সংঘাত, ভুল তথ্য ও অপতথ্য, সামাজিক মেরুকরণ, চরম আবহাওয়ার ঘটনা, সাইবার নিরাপত্তাহীনতা, অসমতা, অর্থনৈতিক মন্দা, মূল্যস্ফীতি, সম্পদের বেলুন ফেটে যাওয়া, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার নেতিবাচক ফলাফল—মানবসভ্যতার জন্য ভয়াবহ ঝুঁকি তৈরি করেছে।’
সুইডিশ একাডেমি অব সায়েন্সেস এবং স্টকহোম বিশ্ববিদ্যালয়ের যৌথ উদ্যোগে গড়ে উঠা ‘স্টকহোম রেজিলিয়েন্স সেন্টার’-এর হালনাগাদ (২০২৫) প্রকাশনায় বলা হয়েছে : পৃথিবীর ‘পরিবেশ প্রান্তসীমা’সংক্রান্ত ৯টি বিষয়ের মধ্যে সাতটি বিষয় এরই মধ্যেই ‘লাল দাগ’ পেরিয়ে গেছে। অর্থাৎ মাতা ধরিত্রীর পরিবেশ এখন অতীতের যেকোনো সময়ের তুলনায় ভয়াবহ বিপদের সম্মুখীন। চলমান যুদ্ধগুলো এই বিপদকে আরো বহুগুণ বৃদ্ধি করে তুলছে। নিষ্ঠুর এই যুদ্ধে মৃত্যু হচ্ছে অসংখ্য নিরপরাধ মানুষের। ধ্বংস হচ্ছে স্থাপনা, জীববৈচিত্র্য তথা বাস্তুতন্ত্র। প্রকৃতপক্ষে পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে চলমান যুদ্ধ ও সংঘাত ‘পৃথিবীর সহ্যসীমা’র ওপরে নেতিবাচক অভিঘাত তৈরি করছে।
পৃথিবীর ‘পরিবেশ প্রান্তসীমা’কে ‘পৃথিবীর সহ্যসীমা’ বা ‘প্লানেটরি বাউন্ডারিস’ বলা হয়। অর্থাৎ এই সীমানার মধ্যে মানুষ তথা অন্যান্য জীব বিপর্যয়কর পরিবেশগত পরিবর্তন এড়িয়ে নিজেরা এবং ভবিষ্যৎ বংশধররা নিরাপদে বসবাস করতে পারে। পরিবেশগত এই প্রান্তসীমানার মধ্যে আছে ৯টি বিষয়, যথা : ১. জলবায়ু ২. জীবমণ্ডলের অখণ্ডতা/জীববৈচিত্র্য ৩. ভূমিব্যবস্থা ৪. মিঠা পানি ব্যবস্থা ৫. জৈব-ভূ-রাসায়নিক প্রবাহ (বিশেষ করে নাইট্রোজেন ও ফসফরাস চক্র) ৬. নতুন সত্তা/দূষক (যেমন—রাসায়নিক দূষণ, প্লাস্টিকস ইত্যাদি) ৭. মহাসাগরের অম্লত্ব ৮. বায়ুমণ্ডলে অ্যারোসল (বাতাসে ভেসে থাকা ক্ষুদ্র কঠিন/তরল কণা) মাত্রা, এবং ৯. ওজোনস্তর।
উপরোক্ত এই ৯টি বিষয় সর্বোচ্চ যে পরিমাণ বা অবস্থায় থাকলে তা মানুষ তথা প্রকৃতির জন্য ক্ষতির কারণ হবে না—সেটিই হচ্ছে ‘পৃথিবীর সহ্যসীমা’ বা ‘প্লানেটরি বাউন্ডারিস’। মূলত মানবসৃষ্ট কর্মকাণ্ডের জন্যই এগুলোর পরিবর্তন হচ্ছে। ২০০৯ সালে প্রভাবশালী বিজ্ঞান জার্নাল ‘নেচার’ ‘পৃথিবীর সহ্যসীমা’সংক্রান্ত প্রথম এই ধারণা প্রকাশ করে। পরবর্তীকালে এই ধারণাটি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় (জাতিসংঘ)-এর পাশাপাশি সর্বস্তরের সরকার, সুধীসমাজ এবং বিজ্ঞানী মহলে অত্যন্ত প্রভাবশালী ধারণা হয়ে ওঠে। বর্তমানে এর সঙ্গে যুদ্ধ এবং অন্য আরো কিছু বিষয় যোগ হয়ে পৃথিবীর সহ্যসীমার প্রাচীরকে অত্যন্ত ঝুঁকিগ্রস্ত করে তুলেছে।
‘স্টকহোম রেজিলিয়েন্স সেন্টার’-এর তথ্যানুসারে বিগত ষোলো বছরে পৃথিবীর যেসব বিষয় সহ্যসীমার লাল দাগ পেরিয়ে গেছে, তার সংখ্যা হচ্ছে সাতটি (উপরোক্ত তালিকার ১ থেকে ৭ নম্বর অবধি)। উল্লিখিত সেন্টার তাদের ‘প্ল্যানেটার হেলথ চেক ২০২৫’ নামক বৈজ্ঞানিক মূল্যায়ন প্রতিবেদনে বৈজ্ঞানিক তথ্যসমূহ সংগ্রহ ও বিশ্লেষণ করে বলছে : পৃথিবীর সামগ্রিক স্বাস্থ্য বর্তমানে গুরুতর ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে এবং আমরা দ্রুতগতিতে উচ্চ ঝুঁকির দিকে ধাবিত হচ্ছি। পরিবেশ ক্রমাগতভাবে অবনতিশীল হচ্ছে। বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য যে ২০২৫ সালের মূল্যায়নে প্রথমবারের মতো মহাসাগরের অম্লতাকে নিরাপদ সীমা অতিক্রমকারী হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। বায়ুমণ্ডলীয় অ্যারোসল এবং ওজোনস্তর ক্ষয় এখনো নিরাপদ সীমার মধ্যে রয়েছে—যদিও এগুলোর ক্ষেত্রে সতর্কতা প্রয়োজন।
- ট্যাগ:
- মতামত
- বিশ্ব ধরিত্রী দিবস