মাছের শরীরে বিষাক্ত ধাতু
বিষাক্ত ধাতু বলতে এমন ক্ষতিকর ধাতুকে বোঝায়, যেসবের সামান্য পরিমাণও মানবদেহের জন্য ক্ষতিকারক। যেমন আর্সেনিক, সিসা, পারদ, ক্যাডমিয়াম, ক্রোমিয়াম, নিকেল প্রভৃতি। এসব ধাতু শুধু মানবদেহ নয়, পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্যের জন্যও ক্ষতিকর। এসব ভারী ধাতুর কারণে শ্বাসকষ্ট, কিডনিজনিত সমস্যা, স্নায়বিক সমস্যা এমনকি ক্যানসারও হতে পারে। ভারী ধাতুর বিষাক্ততায় সাধারণত অবসাদ, মাথাব্যথা, বমি বমি ভাব, পেটব্যথা, স্মৃতির সমস্যা, পেশির দুর্বলতা ইত্যাদি সমস্যা হতে পারে। যেমন ক্যাডমিয়াম ভারী ধাতুর সংস্পর্শে এলে ফুসফুসের প্রদাহ হয়। এর ফলে ফুসফুসের ক্যানসার, অস্টিওম্যালাসিয়া কিংবা হাড় নরম হয়ে যাওয়া, প্রস্রাবে অতিরিক্ত আমিষ থাকা বা কিডনিজনিত সমস্যা হতে পারে। সিসার কারণে বমি বমি ভাব, পক্ষাঘাত ইত্যাদি হতে পারে। ক্রোমিয়ামের কারণে পরিপাকতন্ত্রে রক্তক্ষরণ, লোহিত রক্তকণিকার ধ্বংস হওয়া, ফুসফুসের ক্যানসার ইত্যাদি হতে পারে। আর্সেনিকের কারণে বমি, ডায়রিয়া, ডায়াবেটিস ইত্যাদি হতে পারে।
সম্প্রতি বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্ব উপকূলীয় এলাকায় বিষাক্ত ধাতুর দূষণ বাড়ছে বলে একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। প্রতিবেদনটি করা হয়েছে সায়েন্স অব দ্য টোটাল এনভায়রনমেন্টে প্রকাশিত একটি গবেষণার ফলাফল থেকে। গবেষণাটি মাতামুহুরী নদী, বাকখালী নদী, মহেশখালী চ্যানেল, নাফ নদী, সেন্ট মার্টিন দ্বীপসহ বিভিন্ন উপকূলীয় এলাকায় পরিচালিত হয়। এখানে প্রযুক্তির মাধ্যমে নদী ও মোহনার পলিতে জমে থাকা বিভিন্ন ধাতুর মাত্রা নির্ণীত হয়। এতে ক্যাডমিয়াম, কপার, ক্রোমিয়াম, নিকেল, সিসাসহ বিভিন্ন ধাতুর মাত্রা নির্ণয় করা হয়। গবেষণায় সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা হিসেবে চিহ্নিত করা হয় বাকখালী ও মহেশখালীকে। এখানে গবেষকেরা পিএলআইয়ের মাত্রা পেয়েছেন ২ শতাংশের বেশি। এটি উচ্চমাত্রার দূষণকে বোঝায়। আর সবচেয়ে বেশি বিষাক্ত ধাতু মিলেছে ক্যাডমিয়াম। বাকখালীতে ক্যাডমিয়ামের দূষণের মাত্রা ছিল ৩৩১ দশমিক ৯১ শতাংশ আর মহেশখালীতে ২৯৫ দশমিক ৪৩ শতাংশ।
ভারী ধাতুদূষণের কারণ হিসেবে যেগুলো চিহ্নিত করা হয়েছে, সেগুলো হলো—শিল্পকারখানার অপরিশোধিত বর্জ্য, পয়োনিষ্কাশন থেকে বর্জ্য, জাহাজ ভাঙা থেকে বর্জ্য। এ ছাড়া নগর ও কৃষি এলাকার বিভিন্ন বর্জ্যও এসব দূষণ বাড়াচ্ছে। এতে জলজ বাস্তুসংস্থান হুমকির মুখে পড়ছে। জলে থাকা ফাইটোপ্লাঙ্কটন এবং জুওপ্লাঙ্কটনের শরীরে এসব ধাতু যাচ্ছে। এসব প্লাঙ্কটন খেয়ে মাছের শরীরেও ভারী ধাতু যাচ্ছে। এর ফলে মাছের রোগ বেড়ে যাচ্ছে। এ ছাড়া প্রজননক্ষমতা কমে যাচ্ছে। মাছের শরীর থেকে এসব ভারী ধাতু মানুষের শরীরেও প্রবেশ করছে।
উপকূলীয় এলাকা বলতে সমুদ্রতীরবর্তী বা উপকূল রেখা বরাবর এলাকাকে বোঝায়। এই উপকূলীয় এলাকা ঘিরে রয়েছে গুরুত্বপূর্ণ জীববৈচিত্র্য। বাংলাদেশে উপকূলীয় এলাকার দৈর্ঘ্য ৭১০ কিলোমিটার। নানা প্রাকৃতিক সম্পদে ভরপুর এই উপকূল এলাকা। একে ঘিরে তৈরি হয়েছে বিশাল অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড। এখানকার বড় অংশের মানুষ মৎস্যজীবী। প্রায় ২৮ প্রজাতির চিংড়িসহ ১৮৭ প্রজাতির মাছ শিকার করা হয় উপকূলীয় এলাকায়। উপকূলীয় অঞ্চলের ১১ হাজার ৫০০ হেক্টরজুড়ে রয়েছে চিংড়ি চাষ। কক্সবাজারে প্রায় ১৪৫ কিলোমিটার এলাকাজুড়ে রয়েছে দীর্ঘ সমুদ্রসৈকত। এই অঞ্চলে নৌ-বাণিজ্য ও নৌপরিবহন হচ্ছে। জাহাজভাঙা শিল্প, তেল ও গ্যাস অনুসন্ধান—এসব তো রয়েছেই। বাংলাদেশে জনসংখ্যার ঘনত্ব বেশি হওয়ায় এসব অঞ্চলে পরিবেশগত নানা সমস্যার সৃষ্টি হচ্ছে। উপকূলীয় অঞ্চলে কৃষিজমি কমে যাচ্ছে। বাড়ছে মৎস্যজীবী মানুষের সংখ্যা। এ ছাড়া উপকূলীয় সম্পদের অতিব্যবহার, পানিদূষণ, ম্যানগ্রোভ বন ধ্বংস ইত্যাদি লেগেই আছে। এসবের কারণে বিষাক্ত ধাতুও সৃষ্টি হচ্ছে।
একসময় এসব বিষাক্ত ধাতুদূষণ ঢাকার আশপাশের নদ-নদীতে দেখা যেত। উপকূলীয় এলাকায় এমন ভারী ধাতুর পাওয়ার পর আশঙ্কা করা হচ্ছে, এমন ভারী ধাতুর বিস্তার হয় বাংলাদেশের এখন অনেক জায়গাতেই। বেশ কিছুদিন আগে মৃগেল মাছেও ক্ষতিকর ভারী ধাতু পাওয়া গেছে। মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউট এবং বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের দুজন গবেষক নাটোরের একটি বাণিজ্যিক খামারের রুই, মৃগেল, সিলভার কার্প, বাটা এবং পুঁটি মাছের ওপর গবেষণা চালান। এই গবেষণায় তাঁরা মৃগেল মাছে বিপজ্জনক ক্রোমিয়ামের উপস্থিতি পেয়েছেন। সেখানে প্রতি কেজি মৃগেল মাছে ৬৫৪ মিলিগ্রাম ক্রোমিয়াম পাওয়া গেছে। সাধারণ খাবারে ১৫ মিলিগ্রাম ক্রোমিয়াম সহনশীল। এ ছাড়া প্রাপ্ত ফল থেকে দেখা যায়, ক্রোমিয়ামের উপস্থিতি স্বাভাবিকের চেয়ে চার গুণ বেশি। মৃগেল ছাড়া অন্য কোনো মাছে অবশ্য কোনো ধরনের ক্রোমিয়াম পাননি। এ ছাড়া রুই মাছে দশমিক ০৩৪, মৃগেলে দশমিক ০২৬, সিলভার কার্পে দশমিক ০১৭, বাটা মাছে দশমিক ০২৫, পুঁটি মাছে দশমিক ০৪৯ মিলিগ্রাম ক্যাডমিয়াম পাওয়া গেছে।