নিউমুরিং নিয়ে সরকার এখন কী করবে
চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের (সিপিএ) আওতাধীন নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) পরিচালনার দায়িত্ব দুবাইভিত্তিক কোম্পানি ডিপি ওয়ার্ল্ডের কাছে হস্তান্তরের বিরুদ্ধে গত বছরের জুলাইয়ে সুপ্রিম কোর্টে রিট আবেদন করেছিলেন যুব অর্থনীতিবিদ ফোরামের সভাপতি মির্জা ওয়ালিদ হাসান। ওই রিট আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে গত বছরের ৩০ জুলাই মহামান্য আদালত একটি রুল জারি করেন। ওই রুলের জবাবের ওপর শুনানি শেষে প্রথমে বিভক্ত রায় হয় এবং পরে কয়েক স্তর পেরিয়ে গত ১২ মার্চ সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ বিদেশি কোম্পানির সঙ্গে চুক্তি স্বাক্ষরের প্রক্রিয়াকে বৈধ বলে রায় দেন। এ রায়ের পরিপ্রেক্ষিতে সরকার এখন খুব স্বাভাবিকভাবেই নিয়ম মেনে এনসিটিকে ডিপি ওয়ার্ল্ডের কাছে হস্তান্তরের প্রক্রিয়া শুরু করতে পারে। কিন্তু অন্তর্বর্তী সরকার জনমত ও জনস্বার্থের বিরুদ্ধে গিয়ে দেশের বন্দর-টার্মিনাল বিদেশিদের হাতে তুলে দেওয়ার মতো অধিকতর বিতর্কিত যে সিদ্ধান্তটি বাস্তবায়নে প্রায় মরিয়া হয়ে উঠেছিল, নতুন নির্বাচিত সরকারও সেটিকে এগিয়ে নিয়ে যাবে কি না কিংবা সেটি এগিয়ে নিয়ে যাওয়াটা তাদের উচিত হবে কি না, সেটি একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হয়ে দেখা দিয়েছে।
এনসিটিসহ বিভিন্ন সমুদ্র ও নদীবন্দর-টার্মিনাল পরিচালনার দায়িত্ব বিদেশি কোম্পানিকে দেওয়ার প্রতিবাদে দেশে দীর্ঘদিন ধরেই আন্দোলন চালিয়ে আসছে শ্রমিক-কর্মচারী ঐক্য পরিষদ (স্কপ), তেল-গ্যাস-খনিজ সম্পদ ও বিদ্যুৎ-বন্দর রক্ষা জাতীয় কমিটি, বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি) প্রভৃতি রাজনৈতিক দল ও সংগঠন। গত ১৭ ফেব্রুয়ারি নতুন সরকার গঠিত হওয়ার আগপর্যন্ত ক্ষমতাসীন বিএনপিও ওই আন্দোলনকে জোরালো সমর্থন জানিয়েছিল। এমনকি আন্দোলন চালাতে গিয়ে বিএনপির অঙ্গসংগঠন জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দলের চট্টগ্রাম বন্দরের নেতা-কর্মীরা বদলিসহ বিভিন্ন ধরনের হয়রানিরও শিকার হন। অন্যদিকে দেশের সাধারণ মানুষও নিজেদের সমুদ্র ও নদীবন্দরসমূহের পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব দেশীয় প্রতিষ্ঠানের কাছে রেখে দেওয়ার পক্ষে বলেই গণমাধ্যমের খবরাখবর থেকে প্রতীয়মান হচ্ছে।
প্রশ্ন হচ্ছে, বাংলাদেশ তার বন্দরসমূহের (স্থল, নৌ ও বিমান) ব্যবস্থাপনা বিদেশিদের হাতে তুলে দিতে চায় কেন? এ ক্ষেত্রে অন্তরালের উদ্দেশ্য যা-ই থাকুক, সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের বক্তব্য হচ্ছে, এতে করে বন্দরসমূহের ব্যবস্থাপনা দক্ষতা বৃদ্ধি পাবে এবং সেখানকার কাজকর্মে বাড়তি গতি আসবে। তাহলে তাৎক্ষণিকভাবে পাল্টা প্রশ্ন চলে আসে: স্বাধীনতার পর ইতিমধ্যে ৫৫ বছর পেরিয়ে গেলেও বাংলাদেশ কেন সে দক্ষতা অর্জন করতে পারল না? কেন ১৮৬০ সালে যাত্রা শুরু করা চট্টগ্রাম বন্দর ১৬৬ বছর পরও এশিয়ার এ অঞ্চলের অন্যতম সেরা বন্দর নয়? কেন বাংলাদেশের মানুষ বিদেশে গিয়ে ভিন দেশের নানা ক্ষেত্রে দৃষ্টান্তমূলক মেধা ও যোগ্যতার স্বাক্ষর রাখতে পারলেও দেশের বন্দর, প্ল্যান্ট ও অন্যান্য স্থাপনার পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণের জন্য বিদেশিদের ডাকা হচ্ছে?
শুধু বন্দর নিয়ে আলোচনার মাধ্যমে জবাব পাওয়া সম্ভব নয়। এ বিষয়ে পূর্ণাঙ্গ উত্তর পেতে হলে একই সঙ্গে বাংলাদেশের সামগ্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থা ও তার আওতাধীন অর্থনৈতিক উন্নয়ন প্রক্রিয়াকেও বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন। এখানে সংক্ষেপে শুধু এটুকু বলব, বাংলাদেশের রাষ্ট্রব্যবস্থা ও উন্নয়ন প্রক্রিয়ার প্রায় প্রতিটি স্তরেই রয়েছে নিজস্ব সামর্থ্য ও যোগ্যতা ব্যবহারের ব্যাপারে একধরনের নির্লিপ্ত দৃষ্টিভঙ্গি ও উদ্যমহীনতা। এবং সে নির্লিপ্ত দৃষ্টিভঙ্গি একদিকে যেমন জাতিগতভাবে নিজেদের আত্মনির্ভরশীল হিসেবে গড়ে তোলার স্বপ্ন ও আকাঙ্ক্ষা পূরণের পথে বড় বাধা, অন্যদিকে তেমনি তা নিজস্ব মেধা ও সৃজনশীলতার দুর্ভাগ্যজনক অপচয়ও। আর তারই প্রকারান্তরিক ফলাফল হচ্ছে, দীর্ঘ সাড়ে পাঁচ দশক পরও এ দেশের বিভিন্ন বন্দর ও অন্যান্য স্থাপনার পরিচালন ও রক্ষণাবেক্ষণ বিদেশি কোম্পানির কাছে দেওয়াটা সমীচীন হবে কি না, তা নিয়ে বিতর্ক অব্যাহত থাকা। আর এ বিষয়ে আদালতের সর্বশেষ রায়ের পরিপ্রেক্ষিতে শেষোক্ত এ বিতর্ক আরও জোরদার হওয়ার সুযোগ সৃষ্টি হলো। অর্থাৎ, এ বিষয়ে জনদাবি ও সরকারি সিদ্ধান্তের মধ্যে যে বৈপরীত্য বিরাজমান ছিল, সেটি হয়তো আরও কিছুদিন চলতেই থাকবে।
বস্তুনিষ্ঠ দৃষ্টিকোণ থেকে সহজ-সরল ভাষায় বলি—নিউমুরিংসহ দেশের অন্যান্য বন্দর ও টার্মিনালগুলো দক্ষতার সঙ্গে পরিচালনার ৭০ থেকে ৮০ শতাংশ সামর্থ্য বাংলাদেশের নিজেরই রয়েছে। এমনকি এতৎসংক্রান্ত কোনো কোনো কাজে বাংলাদেশের সামর্থ্য বিদেশিদের চেয়েও অগ্রবর্তী। এ অবস্থায় বন্দর পরিচালনাসংক্রান্ত জনবলের ব্যবস্থাপনা ও কারিগরি দক্ষতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে ৫ থেকে ১০ বছর মেয়াদি একটি সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা নিয়ে এগোতে পারলে ওই সময়ের মধ্যেই অবশিষ্ট ২০ থেকে ৩০ শতাংশ দক্ষতা অর্জন করা সম্ভব হবে বলে মনে করি। আর এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশের নিজস্ব জনবলের ওপর নির্ভর করতে পারার উদাহরণ তো এই এনসিটিকে ঘিরেই রয়েছে। এনসিটির পরিচালন দায়িত্ব ২০২৫ সালের জুলাই থেকে চিটাগং ড্রাইডক লিমিটেডের (সিডিডিএল) হাতে ন্যস্ত হওয়ার পর অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকেই (জুলাই-সেপ্টেম্বর ২০২৫) এর কনটেইনার হ্যান্ডলিং পূর্ববর্তী অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় ১৪ শতাংশ বেড়ে গিয়েছে। তো দায়িত্ব গ্রহণের প্রথম তিন মাসেই যদি সিডিডিএল এই পরিসরের দক্ষতা দেখাতে পারে, তাহলে তাদের পক্ষে অদূর ভবিষ্যতে দেখাতে না পারার তো কোনো কারণ নেই।