পাহাড়ের সবুজে স্বপ্নের খামার
চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড উপজেলার সিলিমপুর। পাহাড় ঘেঁষা এই এলাকাটির প্রাকৃতিক সৌন্দর্য যে কাউকে মুগ্ধ করবে। পাহাড়ের ভাঁজে ভাঁজে মানুষের বসবাস, আর চারপাশে সবুজের এক বিস্তীর্ণ ক্যানভাস। এই শান্ত, স্নিগ্ধ ও সবুজ অরণ্যে মিশে থাকা গ্রামীণ জীবনের মাঝেই রচিত হয়েছে এক নতুন সম্ভাবনার গল্প। দূর থেকে দেখলে মনে হবে প্রকৃতিরই এক অবিচ্ছেদ্য অংশ, কিন্তু কাছে গেলে বোঝা যায় এটি একটি আধুনিক ডেইরি ফার্ম ‘চৌধুরী এগ্রো’।
সিলিমপুরের এই চৌধুরী এগ্রো ফার্মটিতে এসে এক ভিন্ন রকম প্রশান্তি অনুভূত হলো। খামারটির আয়োজন হয়তো করপোরেট পরিসরের মতো বিশাল নয়, কিন্তু এর প্রতিটি কোনায় জড়িয়ে আছে চরম গোছানো এক পরিপাটি রূপ, যা অনেকটাই আমাদের দেশজ কুটিরশিল্পের নান্দনিকতাকে মনে করিয়ে দেয়। আর এই অসাধারণ উদ্যোগের পেছনে রয়েছেন সাগর চৌধুরী নামের এক উচ্চশিক্ষিত তরুণ, যিনি সুদূর ইংল্যান্ড থেকে বিশ্ববাণিজ্য বা গ্লোবাল ট্রেড বিষয়ে উচ্চতর পড়াশোনা শেষ করে এসে মাটি ও মানুষের টানে গড়ে তুলেছেন এই খামার।
আমাদের সমাজে একটি বদ্ধমূল ধারণা রয়েছে যে, উচ্চশিক্ষা মানেই শীতাতপনিয়ন্ত্রিত কক্ষে বসে করপোরেট চাকরি করা। বিশেষ করে কেউ যদি বিদেশের মাটিতে, তা-ও আবার ইংল্যান্ডের মতো উন্নত দেশ থেকে পড়াশোনা করে আসেন, তবে তাঁর কাছে সমাজের প্রত্যাশা থাকে আকাশচুম্বী। কিন্তু সাগর চৌধুরী সেই প্রথাগত ছক ভেঙেছেন। বিশ্ববাণিজ্যের মতো বিষয়ে জ্ঞান অর্জন করে তিনি সেই জ্ঞান প্রয়োগ করেছেন নিজ দেশের কৃষিতে।
সাগরের এই উদ্যোগ প্রমাণ করে যে কৃষি এখন আর কেবল অশিক্ষিত বা অর্ধশিক্ষিত মানুষের টিকে থাকার পেশা নয়। কৃষি এখন একটি সম্মানজনক ও লাভজনক শিল্প। আধুনিক প্রযুক্তি ও বৈজ্ঞানিক পদ্ধতির নিখুঁত ব্যবহারের মাধ্যমে সাগর তাঁর খামারটিকে একটি সুসংগঠিত ডেইরি ইউনিটে রূপ দিয়েছেন। এখানে উন্নত জাতের গাভি পালন করা হচ্ছে সম্পূর্ণ বিজ্ঞানসম্মত উপায়ে। তাঁর এই উদ্যোগ তরুণ প্রজন্মের জন্য এক বিশাল অনুপ্রেরণা।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বাংলাদেশে গরুর খামার বা ডেইরি খাতে তরুণদের আগ্রহ অভাবনীয় হারে বেড়েছে। বেকারত্বের অভিশাপ থেকে মুক্তি, অপেক্ষাকৃত স্বল্প মূলধনে ব্যবসা শুরুর সুযোগ এবং দ্রুত আয়ের হাতছানি—এই বিষয়গুলো তরুণ উদ্যোক্তাদের কৃষিমুখী করছে। ইন্টারনেট, বিশেষ করে ইউটিউব ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সফল খামারিদের রঙিন গল্প দেখে অনেকেই রাতারাতি বড়লোক হওয়ার স্বপ্ন নিয়ে এই খাতে যুক্ত হচ্ছেন।
তবে সাগরের অভিজ্ঞতা আমাদের এক ভিন্ন বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড় করায়। খামার গড়ার প্রথম দিকে সাগরকে একটি বড় উপলব্ধির ভেতর দিয়ে যেতে হয়েছে। বইয়ের পাতায় পড়া বিদ্যা কিংবা ইউটিউবের ঝকঝকে ভিডিও দেখে খামার পরিচালনা করা আর বাস্তবে রোদ-বৃষ্টি মাথায় নিয়ে মাঠে কাজ করার মধ্যে রয়েছে আকাশ-পাতাল তফাত। ইউটিউবের ভিডিওগুলো অনেক সময়ই সফলতার গল্পগুলোকে অতিমাত্রায় মহিমান্বিত করে দেখায়, কিন্তু এর পেছনের হাড়ভাঙা খাটুনি, গরুর রোগবালাই, খাদ্যের মূল্যবৃদ্ধি বা বাজারজাতকরণের সংগ্রামগুলো আড়ালেই থেকে যায়।
- ট্যাগ:
- মতামত
- বাণিজ্যিক খামার