শিক্ষাগুরুর বিভীষিকাকাল
‘ও ভাই...আমরা শিক্ষক মানুষ, আমরা রাজনীতি করি না। আমরা ছাত্র আন্দোলনের পক্ষে ছিলাম। ভাই, আমাদের মাইরেন না ভাই। আমাদের ওপর হামলা কইরেন না ভাই! ও ভাই...আমাদের বাঁচান, আমাদের বাঁচান...।’ এভাবেই বদ্ধ ঘরের ভেতরে প্রাণভিক্ষা চেয়ে বুকফাটা আর্তনাদ করছিলেন কয়েকজন মানুষ। কেউ এ-ঘর থেকে ও-ঘরে ছোটাছুটি করে বাঁচার আকুতি জানাচ্ছেন, কেউ মোবাইল ফোনে কাউকে ফোন করার চেষ্টায়। বাইরে থেকে দরজায় সজোরে একের পর এক আঘাত। ধারালো অস্ত্রের কোপে ফেটে যাচ্ছে দরজার কাঠ...।
আমাদের অনুসন্ধানে পাওয়া ৫ মিনিট ৫০ সেকেন্ডের একটি ভিডিও ফুটেজে দেখা গেছে এই ভয়াবহ চিত্র। ঘটনাটি ২০২৪ সালের ১৮ আগস্টের। সেদিন বরিশালের গৌরনদীতে ‘মাহিলাড়া এএন মাধ্যমিক বিদ্যালয়’-এর স্টাফ কোয়ার্টারে প্রধান শিক্ষকের বাসায় এ হামলা করা হয়। প্রধান শিক্ষক প্রণয় কান্তি অধিকারীকে সপরিবারে ঘরের ভেতরে আটকে বিভীষিকাময় পরিস্থিতি সৃষ্টি করে শতাধিক ব্যক্তি।
প্রণয় কান্তির মেয়ে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আদৃতা অধিকারী ফেসবুক লাইভে ভয়াবহ পরিস্থিতি দেখানো শুরু করলে এক পর্যায়ে সেনাবাহিনী গিয়ে উদ্ধার করে আক্রান্ত পরিবারটিকে।
সে যাত্রায় প্রাণে বাঁচলেও পরে জোর করে পদত্যাগ করানো হয় প্রধান শিক্ষক প্রণয় অধিকারীকে। এরপর তিনি বরণ করেন নির্বাসিত জীবন। শুরু হয় বঞ্চনা আর মানবেতর জীবনযাপন। সেদিনের দুঃসহ স্মৃতি মনে করতেও ভয় পান এই শিক্ষক।
গত ১৯ এপ্রিল দুপুরে ফোনে যোগাযোগ করা হলে অজ্ঞাত স্থান থেকে প্রণয় অধিকারী বলেন, ‘আমার প্রাণের ক্যাম্পাসের ভেতরে আমাকে সপরিবারে এভাবে মেরে ফেলার চেষ্টা করেছে, এ কথা যতবার ভাবি, আমার গা শিউরে ওঠে।’
আর্থিক অনিয়ম ও স্বেচ্ছাচারিতার অভিযোগ শুনিয়ে কোমলমতি শিক্ষার্থীদের উত্তেজিত করে দেন প্রতিষ্ঠানের কিছু শিক্ষক, এমন অভিযোগ প্রণয় কান্তির। কালের কণ্ঠকে তিনি বলেন, ‘আমি জীবনে কোনো দিন রাজনীতি করিনি। এখন মনে হয়, আমার দোষ একটাই—আমি কড়া প্রশাসক, কখনো কোনো অনিয়ম প্রশ্রয় দিইনি। অথচ আমাকে অপরাধী বানিয়ে কোমলমতি শিক্ষার্থীদের উত্তেজিত করে এমন জঘন্য কাজে নামিয়ে দেওয়া হয়।’
- ট্যাগ:
- বাংলাদেশ
- শিক্ষক
- ছাত্র আন্দোলন
- মব ভায়োলেন্স