নীতিনির্ধারণে হঠকারিতা, পরিকল্পনার অভাবে চাপে এইচএসসি ২০২৬ ব্যাচ?
বাংলাদেশের উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষাব্যবস্থা একটি সুসংগঠিত কাঠামোর ওপর দাঁড়িয়ে থাকার কথা; যেখানে সিলেবাস, পাঠদান, মূল্যায়ন ও পরীক্ষা সবকিছু একটি নির্ধারিত সময়চক্র মেনে চলবে। কিন্তু বাস্তবতা বারবারই দেখিয়েছে, এই কাঠামোর ভেতরে সমন্বয়ের অভাব গভীরতর হচ্ছে। চলতি বছরের এইচএসসি ও সমমান পরীক্ষা ঘিরে যে অনিশ্চয়তা, উদ্বেগ এবং ক্ষোভ তৈরি হয়েছে, তা কেবল একটি পরীক্ষার সময়সূচি নিয়ে নয়; বরং এটি আমাদের শিক্ষা পরিকল্পনার দুর্বলতা ও নীতিনির্ধারণের অসংগতির একটি স্পষ্ট প্রতিচ্ছবি।
আগামী ৭ জুন থেকে পরীক্ষা শুরু হতে পারে- এমন একটি সম্ভাব্য তারিখ ঘিরে শিক্ষার্থীরা যখন মানসিক প্রস্তুতি নিতে চেষ্টা করছে, তখনো আনুষ্ঠানিক রুটিন প্রকাশ না হওয়া তাদের উদ্বেগকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। অন্যান্য বছর যেখানে অন্তত দুই মাস আগে রুটিন প্রকাশ করা হয়, সেখানে এবার পরীক্ষা শুরু হতে সম্ভাব্য সময় বাকি থাকলেও রুটিন অনিশ্চিত। এতে শিক্ষার্থীদের শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতি ব্যাহত হচ্ছে, যা কোনোভাবেই কাম্য নয়। একটি জাতীয় পাবলিক পরীক্ষার ক্ষেত্রে এমন অনিশ্চয়তা শুধু প্রশাসনিক ব্যর্থতাই নয়, এটি শিক্ষার্থীদের প্রতি এক ধরনের অবিচারও। এই পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে প্রস্তুতির সময় সংকট।
প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী একজন শিক্ষার্থী একাদশ শ্রেণিতে ভর্তি হওয়ার পর এইচএসসি পরীক্ষায় বসতে প্রায় ২২ থেকে ২৩ মাস সময় পায়। কিন্তু এবারের ব্যাচ বাস্তবে পেয়েছে ২০ মাসেরও কম সময়। এর মধ্যে আবার নিয়মিত ক্লাসের সংখ্যা ছিল অস্বাভাবিকভাবে কম। একাদশ শ্রেণিতে ক্লাস শুরু হয়েছে দেরিতে, অক্টোবর মাসে; ভর্তি প্রক্রিয়া দীর্ঘায়িত হওয়ায় কার্যকর ক্লাস শুরু হয়েছে নভেম্বর থেকে। ছুটি ও অন্যান্য বিঘ্ন বাদ দিলে একাদশে ক্লাস হয়েছে প্রায় সাড়ে তিন মাস। দ্বাদশ শ্রেণিতে একই চিত্র—জুলাইয়ের শেষ থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত মিলিয়ে কার্যকর ক্লাস হয়েছে প্রায় তিন মাস। অর্থাৎ, পুরো দুই বছরের শিক্ষাজীবনে শিক্ষার্থীরা মাত্র সাড়ে ছয় মাসের মতো নিয়মিত ক্লাস পেয়েছে।
এমন একটি প্রেক্ষাপটে পূর্ণ সিলেবাসে পরীক্ষা নেওয়ার সিদ্ধান্ত স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে ওঠে। গত কয়েক বছর ধরে সংক্ষিপ্ত সিলেবাসে পরীক্ষা নেওয়া হলেও এবার পাঁচ বছর পর পূর্ণ সিলেবাসে ফেরা হচ্ছে। এটি নিঃসন্দেহে একটি ইতিবাচক উদ্যোগ হতে পারত, যদি পর্যাপ্ত সময় ও প্রস্তুতির সুযোগ নিশ্চিত করা হতো। কিন্তু বাস্তবে তা হয়নি। ফলে শিক্ষার্থীরা একদিকে সময়ের স্বল্পতা, অন্যদিকে বিস্তৃত সিলেবাস; এই দ্বৈত চাপের মধ্যে পড়েছে।
শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও অভিভাবকদের বক্তব্যে একটি বিষয় পরিষ্কার; এই পরিস্থিতিতে অন্তত এক থেকে তিন মাস সময় বাড়ানো প্রয়োজন। তাদের আশঙ্কা, পর্যাপ্ত প্রস্তুতির সুযোগ না পেলে ফলাফলে বড় ধরনের বিপর্যয় ঘটতে পারে। বিশেষ করে বিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থীরা উচ্চতর গণিতসহ জটিল বিষয়গুলোতে যথাযথ প্রস্তুতি নিতে পারেনি বলে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন শিক্ষকরা। এই আশঙ্কা অমূলক নয়; কারণ শিক্ষা একটি ধারাবাহিক প্রক্রিয়া, যা হঠাৎ করে তাড়াহুড়ো করে সম্পন্ন করা যায় না।
এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যে বিষয়টি সামনে আসে, তা হলো পরিকল্পনার অভাব। যদি সরকার বা শিক্ষা মন্ত্রণালয় সিদ্ধান্ত নেয় যে ভবিষ্যতে এইচএসসি পরীক্ষা জুন মাসে নেওয়া হবে, তাহলে সেটি শিক্ষাবর্ষের শুরুতেই স্পষ্ট করে জানাতে হবে। উদাহরণস্বরূপ, যদি ২০২৮ সালের পরীক্ষা ফেব্রুয়ারিতে নেওয়ার পরিকল্পনা থাকে, তবে তা এখনই ঘোষণা করা উচিত। এতে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা সেই অনুযায়ী তাদের প্রস্তুতি নিতে পারবে। কিন্তু হঠাৎ করে নির্ধারিত সময়ের দুই মাস আগে পরীক্ষা এগিয়ে আনা হলে সেই সময়ের ঘাটতি কীভাবে পূরণ হবে; এ প্রশ্নের কোনো সুস্পষ্ট উত্তর নেই।
- ট্যাগ:
- মতামত
- ব্যবস্থা
- উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা