হামে শতাধিক শিশুর মৃত্যু ও অকল্পনীয় ব্যর্থতা
খুব বেশিদিন আগের কথা নয়, হাম নিয়ন্ত্রণে নিজেদের সাফল্য নিয়ে বাংলাদেশ আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে কথা বলতে পারত। টিকাদান কর্মসূচি ও কার্যক্রমের জন্য বাংলাদেশ আন্তর্জাতিকভাবে পুরস্কৃত হয়েছে। বাংলাদেশ টিকাদানের আওতা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি করতে সক্ষম হয়েছিল, শিশুর মৃত্যু নাটকীয়ভাবে কমিয়েছিল এবং স্বল্প ব্যয়ে কমিউনিটিভিত্তিক স্বাস্থ্যসেবা জনস্বাস্থ্যের একটি সফল মডেল হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। হাম তখন প্রায় নির্মূলের দ্বারপ্রান্তে বলে মনে করা হচ্ছিল।
সেই আত্মবিশ্বাস এখন ভঙ্গুর হয়ে উঠছে। সম্প্রতি শিশুদের মধ্যে হাম সংক্রমণ অনেকটা মহামারির রূপ নিতে চলেছে। প্রতিরোধযোগ্য একটি রোগে এভাবে শিশুর মৃত্যু কেবল একটি জনস্বাস্থ্য সমস্যা নয়, এটি একটি গুরুতর সতর্কবার্তা। এটি শুধু একটি ভাইরাসের বিষয় নয়, বরং আরো গভীর কিছু। এটি স্বাস্থ্য খাতে বাংলাদেশের অব্যবস্থাপনার এক করুণ চিত্র ও ফাটল।
হাম কোনো রহস্যময় রোগ নয়। এটি পৃথিবীর অন্যতম সংক্রামক ভাইরাস, কিন্তু একই সঙ্গে সবচেয়ে প্রতিরোধযোগ্য রোগগুলোর একটি। টিকার দুই ডোজ প্রায় পূর্ণ সুরক্ষা নিশ্চিত করে। তবু বাংলাদেশে এর পুনরুত্থান ঘটছে এবং শত শত শিশু মৃত্যুবরণ করছে।
সমস্যা টিকার অভাব নয়, সমস্যা হলো টিকা সবার কাছে পৌঁছাচ্ছে না। ইউনিসেফ, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ও GAVI ( Global Alliance for Vaccines and Immunisatio)-এর যৌথ হিসাব অনুযায়ী, বাংলাদেশে এখনো প্রায় পাঁচ লাখ শিশু পূর্ণ টিকাদানের আওতায় আসেনি। এই ঘাটতি কোনো বিমূর্ত বিষয় নয়। এটি সরাসরি ঝুঁকিপূর্ণ শিশুদের একটি বড় অংশ তৈরি করছে, যাদের ওপর হাম দ্রুত আঘাত হানতে পারে।
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা এরই মধ্যে ২০২৬ সালে শিশুদের মধ্যে হাম সংক্রমণ বৃদ্ধির ঢেউ সম্পর্কে সতর্ক করেছেন, যা মৃত্যুর মতো জটিলতার আশঙ্কা বাড়াচ্ছে। শহরের বস্তি, প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চল এবং বাস্তুচ্যুত জনগোষ্ঠী, বিশেষ করে রোহিঙ্গা সম্প্রদায়ের মধ্যে টিকাদানের হার উল্লেখযোগ্যভাবে কম। ইউনিসেফ বারবার উল্লেখ করেছে যে টিকাদানের এই ঘাটতিগুলো মূলত দুর্গম ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর মধ্যেই কেন্দ্রীভূত।
শত শত শিশুর প্রাণহানি ঘটানো এই পরিস্থিতির মোকাবেলা শুধু জরুরি টিকাদান কর্মসূচির মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা যাবে না। প্রয়োজন কাঠামোগত সংস্কার।
১. শুধু কাভারেজ নয়, সমতা নিশ্চিত করা : জাতীয় গড় নয়, ‘জিরো ডোজ’ শিশুদের চিহ্নিত করতে হবে।
২. নিয়মিত টিকাদান জোরদার করা : অভিযান গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু নিয়মিত সেবার বিকল্প নয়।
৩. রিয়াল টাইম ডেটা ব্যবস্থায় বিনিয়োগ : ডিজিটাল ট্র্যাকিং দ্রুত ও লক্ষ্য ভিত্তিক প্রতিক্রিয়া নিশ্চিত করতে পারে।
৪. মাঠ পর্যায়ের কর্মীদের ক্ষমতায়ন : কমিউনিটি স্বাস্থ্যকর্মীদের প্রশিক্ষণ, প্রণোদনা ও সহায়তা দিতে হবে।
৫. জবাবদিহি নিশ্চিত করা : স্বাধীন নিরীক্ষা, কমিউনিটি পর্যবেক্ষণ ও স্বচ্ছতা বাড়াতে হবে।
৬. জন-আস্থা পুনর্গঠন : শুধু সচেতনতা সৃষ্টি নয়, এর বাইরে গিয়ে জনগণের কথা শুনতে হবে।
টিকাদান জনস্বাস্থ্যের সবচেয়ে সাশ্রয়ী ও কার্যকর উদ্যোগগুলোর একটি। প্রয়োজনীয় জ্ঞান ও উপকরণ আমাদের আছে। অবকাঠামোও যথেষ্ট পরিমাণে বিদ্যমান। তার পরও শিশুরা মারা যাচ্ছে। এটিই আজকের বাস্তবতা।
বর্তমান প্রাদুর্ভাবের কারণ অনুসন্ধানে একটি স্বাধীন ও নিরপেক্ষ তদন্ত অপরিহার্য। এতে নীতিগত সিদ্ধান্ত, প্রশাসনিক ত্রুটি এবং সম্ভাব্য অবহেলা বা দুর্নীতির বিষয়গুলো খতিয়ে দেখা জরুরি। যাঁদের দায়িত্বে অবহেলার কারণে এটি হয়েছে, তাঁদের শনাক্ত করে জবাবদিহির আওতায় আনা প্রয়োজন। একই সঙ্গে যাঁরা সন্তান হারিয়েছেন, তাঁদের কণ্ঠ শোনাও রাষ্ট্রের নৈতিক দায়িত্ব।
- ট্যাগ:
- মতামত
- শিশুর মৃত্যু
- হাম রোগ