গণপিটুনি থেকে সাইবার বুলিং, নিষ্ঠুরতার উৎস কোথায়

ঢাকা পোষ্ট ডা. হেলাল উদ্দিন আহমেদ প্রকাশিত: ১৬ এপ্রিল ২০২৬, ১২:০২

‘কারও কথা আমার পছন্দ হলো না, তাকে গিয়ে লাগিয়ে দিলাম দু’ঘা।’ ‘কারও বিশ্বাস বা কথার সাথে আমার মতের মিল নেই- দলবল নিয়ে তাকে কুপিয়ে মেরেই ফেললাম!’ ‘তুচ্ছ কারণে হত্যা করলাম আমার প্রতিবেশীকেই।’ ‘কখনো কয়েকজন মিলে চুরির অপবাদ দিয়ে পিটিয়ে মেরে ফেললাম কাউকে।’ ‘কখনো কবর থেকে লাশ তুলে শুরু করলাম উল্লাস!’ ‘পিটিয়ে মেরেই ক্ষান্ত নয়- মৃতদেহ ঝুলিয়ে পুড়িয়ে দেওয়া হলো।’


না, এগুলো মধ্যযুগীয় ঘটনা নয়; আমাদের চারপাশেরই খবর। খবরগুলো আমাদের বিস্মিত, ক্ষুব্ধ আর বেদনার্ত করে, আমাদের চোখ ঝাপসা হয়ে আসে।


মানুষকে বলা হয় সৃষ্টির সেরা জীব। সভ্যতার ইতিহাসে মানুষ যেমন সৃষ্টি করেছে শিল্প, বিজ্ঞান, সাহিত্যের উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত; রচনা করেছে বিপদে মানুষের পাশে দাঁড়ানোর সভ্যরীতি, তেমনি আবার সেই মানুষই লিখেছে রক্ত, ধ্বংস আর নিষ্ঠুরতার ইতিহাস।


হিরোশিমা আর নাগাসাকিতে পারমাণবিক বোমার আঘাতে থমকে দাঁড়িয়েছিল মানবিকতা। মানুষের ওপর মানুষ কেন এত ‘হিংস্র’ হয়ে ওঠে? এই প্রশ্নের উত্তর একক কোনো কারণে সীমাবদ্ধ নয়। এটি মানুষের মন, শৈশবের বিকাশ, সমাজ ও পারিপার্শ্বিকতার এক জটিল সমীকরণ। 


নিষ্ঠুরতা কোনো আকস্মিক বিকৃতি নয়; এটি ধীরে ধীরে গড়ে ওঠা এক মানসিক কাঠামো, যেখানে মানুষের অনুভূতি, শিক্ষা, প্রবৃত্তি  আর অভিজ্ঞতা একে অপরের সঙ্গে সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে।


সিগমুন্ড ফ্রয়েডের দৃষ্টিতে নিষ্ঠুরতা


মনোবিজ্ঞানী সিগমুন্ড ফ্রয়েডের মতে এই ধরনের আচরণের পেছনে রয়েছে মানুষের অবদমিত কামনা-বাসনা, যাকে তিনি তুলনা করেছেন অবচেতন মনের জানালা খুলে দেওয়ার সঙ্গে। অবচেতনে মানুষ যা করতে চায়, যা কামনা করে, যা পেতে চায়-চেতন মনে সে তার শিক্ষা, সভ্যতা, সামাজিকতা আর নৈতিকতা দিয়ে সেগুলো ঢেকে রাখে।


সেই অবদমিত কামনা, সরাসরি পূরণ হয় না বলে হিংস্রতা আর নৃশংসতার মধ্য দিয়ে ভিন্নরপথে পূরণ করার চেষ্টা চলে। কখনো এই হিংস্রতা সে একাই প্রকাশ করে আবার কখনো প্রকাশ করে যূথবদ্ধভাবে। এই যূথবদ্ধ হিংস্রতার প্রকাশকে ফরাসি সমাজ-মনোবিজ্ঞানী গুস্তাভলি বন ব্যাখ্যা করে বলেন, এই অবদমিত কামনার প্রকাশ কখনো কখনো ছোঁয়াচে হয়ে যায় এবং দলবদ্ধভাবে নৃশংসতাকে প্রকাশ করে।


ফ্রয়েড মানুষের আচরণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বলেছিলেন, আমরা যা করি তার সবটাই সচেতন সিদ্ধান্ত নয়। আমাদের ভেতরে কাজ করে এক বিশাল অবচেতন জগৎ, যেখানে দমন করা ইচ্ছা, ভয়, রাগ ও আকাঙ্ক্ষা জমা হয়ে থাকে। তার মতে, মানুষের মধ্যে দুটি মৌলিক প্রবৃত্তি কাজ করে, জীবন প্রবৃত্তি (ইরোস) এবং ধ্বংস প্রবৃত্তি (থ্যানাটোস)।


এই ধ্বংস প্রবৃত্তি কখনো কখনো প্রকাশ পায় আগ্রাসন, সহিংসতা বা নিষ্ঠুর আচরণ হিসেবে। আজকের দিনে সভ্যতার ধারক ও বাহক ইংরেজরা ১৪৩১ খ্রিষ্টাব্দে ফরাসি বীরকন্যা জোয়ান অব আর্ককে অপবাদ দিয়ে আগুনে জীবন্ত পুড়িয়ে হত্যা করেছিল। সভ্য মার্কিন মুলুকের মিসিসিপি, জর্জিয়া ইত্যাদি অঞ্চলে ১৮৮০ সাল থেকে ১৯৩০ সালের মধ্যে প্রায় ২ হাজার ৪০০ মানুষকে কেবল জাতিগত বিরোধের জেরে বিনা বিচারে বা প্রহসনের বিচারে ঝুলিয়ে হত্যা করা হয়েছিল, যাকে বলা হতো ‘লিঞ্চিং মব বা গণপিটুনি’।


মানুষের মধ্যে এই হিংস্রতার ব্যাখ্যা হচ্ছে যে, একজন হতাশ মানুষ নিজের হতাশাকে কাটাতে, নিজের অপ্রাপ্তিবোধের তাড়না থেকে নিজের চাইতে দুর্বল কাউকে বেছে নেয়। আর সেই দুর্বলের ওপর হিংস্রতা দেখিয়ে একধরনের মানসিক পরিপূর্ণতা পেতে চায়। এই তত্ত্বকে বলা হয় ‘ফ্রাস্ট্রেশন-অ্যাগ্রেসন হাইপোথিসিস’। এ কারণেই আমরা দেখি দুর্বলের ওপর অপেক্ষাকৃত সবলের আস্ফালন এবং হিংস্রতা।


এরিক এরিকসনের বিশ্লেষণ


মার্কিন মনোবিশ্লেষক এরিক এরিকসন মানুষের জীবনকে বলেছিলেন, ধারাবাহিক মানসিক বিকাশের যাত্রা; মাতৃগর্ভ থেকে ক্রমাগত মানুষ বিকশিত হতে থাকে, সেই সাথে পরিবর্তন হয় তার চিন্তার, আচরণের। এই ধারাবাহিক বিকাশের প্রতিটি বাঁকে থাকে নানান সংকট বা চ্যালেঞ্জ।


শৈশবে যদি একজন শিশু যথেষ্ট ভালোবাসা, নিরাপত্তা ও সমানুভূতি না পায়, তবে তার মধ্যে জন্ম নেয় নিরাপত্তাহীনতা, অনিশ্চয়তা;  কৈশোরে যখন সে নিজের আত্মপরিচয় খুঁজতে যায় তখন সেই অনিশ্চয়তা আরও গভীরে রূপ নেয়। এই অবস্থায় ব্যক্তি নিজের পরিচয় খুঁজে না পেয়ে আত্মপরিচয় সংকটে বিভ্রান্ত হয়ে পড়ে।


এরিকসনের মতে, এই ‘আইডেন্টিটি কনফিউশন’ অনেক সময় আক্রমণাত্মক আচরণে রূপ নিতে পারে। কারণ মানুষ যখন নিজের ভেতরেই নিজেকে স্থির করতে পারে না, তখন সে বাইরের পৃথিবীতে শক্তি প্রদর্শনের মধ্য দিয়ে নিজের অস্তিত্ব প্রমাণ করতে চায়।


এরিকসনের মতে নিষ্ঠুরতা এখানে আর নিছক রাগ বা ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ নয়; এটি নিজের আত্মপরিচয় খুঁজে বের করার হাহাকারের প্রতিধ্বনি। অর্থাৎ নিষ্ঠুর মানুষ আসলে ভুগছে তার আইডেন্টিটি ক্রাইসিসে।

সম্পূর্ণ আর্টিকেলটি পড়ুন

প্রতিদিন ৩৫০০+ সংবাদ পড়ুন প্রিয়-তে

আরও