শিশুর মৃত্যু কি মানতে পারছি, মানসিকভাবে কতখানি ক্ষতির স্বীকার হচ্ছি?
প্রতিনিয়ত কোনো না কোনো কারণে মানুষ মারা যাচ্ছে! রাস্তায় দুর্ঘটনার কবলে পড়ে বা পানিতে বা পারিবারিক রোষানলে পড়েসহ নানাভাবে। যখন একটি পরিবারের একজন সদস্যের প্রয়াণ হয় তখন এর মানে কি একজনেরই চলে যাওয়া?
পরিবারের বাকি সদস্য (ছোট/বড়), আত্মীয়-স্বজন বা নানা মাধ্যমে প্রকাশিত খবরটি যারা পাঠ করেন তাদের মনে মৃত্যু সংবাদটি কি কোনোভাবে প্রভাব ফেলে না? আবার একটি পরিবারের একাধিক সদস্য দুর্ঘটনার কবলে পড়ে মারা গেছেন এমন ঘটনাও নিয়মিত ঘটছে! এগুলো কেবল সে পরিবারের জন্য নয় বরং মানবতাবোধ সম্পন্ন যেকোনো মানুষের জন্য হৃদয়বিদারক ঘটনা।
একাধিক সপ্তাহ ধরে পত্রিকায় প্রকাশিত হাম ও শিশু মৃত্যুজনিত খবরগুলো চোখে পড়ছে। সোশ্যাল মিডিয়ায় স্ক্রল করলেই সদ্য প্রয়াত শিশুদের মুখ ও তাদের জড়িয়ে ধরে বাবা-মায়ের কান্নার ছবি ও ভিডিওগুলো হৃদয়কে নাড়িয়ে দিচ্ছে!
প্রতিবারই ঘটে যাওয়া এমন ঘটনার দৃশ্য সামনে আসলেই আমি ভাবতে থাকি সেই অভিভাবক ও পরিবারের বাকি সদস্যদের ট্রমার মধ্য দিয়ে যাওয়া পরিস্থিতির কথা। একজন মানুষ হিসেবে আমি নিজেও ট্রমার ভেতর দিয়ে যাই। শিশুদের মুখগুলো ভুলতে পারি না। ওদের বাবা-মায়ের কান্নাও নিতে পারি না! আমি নিশ্চিত কেউই পারেন না।
আমি নিজে একটি প্রতিষ্ঠানের কর্ণধার। শিশুদের খেলার জন্যেই এই প্রতিষ্ঠানটি নির্মাণ করেছি। ঈদের ছুটির পর থেকেই সেন্টারে শিশুদের খেলতে আসার সংখ্যা বেশ কমে গেছে! খবর নিয়ে জানা গেছে ঋতুর পরিবর্তনজনিত নানা সমস্যার পাশাপাশি শিশুদের মায়েরা সাম্প্রতিক সময়ে শিশুদের মৃত্যুর কারণে আতঙ্কে ভুগছেন!
সেন্টারে খেলা করে দুই থেকে ৫/৬ বছরের শিশু। আগে অনেকেরই হয়তো টিকা দেওয়া আছে তবু তারা আতঙ্ক থেকে সরে আসতে পারছে না! এছাড়াও নিউমোনিয়াসহ অন্যান্য কারণগুলো তো আছেই!
সেন্টারের শিশুরা যখন সর্দি বা জ্বরের কারণে আসে না তখন একটা সময় পর্যন্ত ওদের খেলা বন্ধ থাকে। বন্ধুদের সাথে কাটানো সময়ের মাধ্যমে শিশুদের মধ্যে যে বিকাশ হওয়ার কথা সেগুলোর পথ তখন সংকীর্ণ হয়ে যায়! আর এটাই স্বাভাবিক!
আবার কয়েকদিনের অসুস্থতার পর যখন খেলতে আসে তখন ওরা থাকে প্রথমত শারীরিকভাবে দুর্বল। ওদের মায়েরা থাকেন একটু বেশিই অস্থির। শিশুদের আবার খেলায় মন ফেরানো, শেখার পরিবেশে মন ঘোরানো হয়ে পড়ে বেশ কঠিন! আর এটাও স্বাভাবিক।
এখন কথা হলো শিশুদের অসুস্থ হওয়া কি অস্বাভাবিক? না অস্বাভাবিক নয়। মানুষ হয়ে জন্ম নিলেই তাকে নানা রকমের অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে যেতেই হয়। আমরা সবাই গিয়েছি কিন্তু শিশুদের কোনো অসুখ যদি সমাজে আতঙ্কের মতো ছড়িয়ে পড়ে তাহলে বিষয়টি আর স্বাভাবিক থাকে না! এখানে তখন বেশকিছু প্রশ্ন চলে আসে; যেমন এখন যে প্রশ্ন সবার মনে, তা হলো হামের টিকা দেওয়া হয়নি কেন?
কেন শিশু হাসপাতালগুলো বা ডাক্তাররা এ বিষয়ে অভিভাবকদের সতর্ক করেননি? কেন সরকার থেকে কোনো রকমের চাপ আসেনি? কেন এ বিষয়ে একজন স্বাস্থ্যকর্মীর কোনো আগাম সতর্কতা আমরা পেলাম না? কেন গণমাধ্যমে এ বিষয়গুলো ঘটনা ঘটে যাওয়ার আগেই প্রকাশিত হয়নি? কেন সমাজের একজন মানুষ জানলাম না যে, হামের টিকা দেওয়া হয়নি? কেন গণমাধ্যম এইরকম সেনসেটিভ বিষয়ে সঠিক ভূমিকা পালন করেনি?
হামের পাশাপাশি নিউমোনিয়া নিয়ে সতর্কতা তৈরি, ডেঙ্গু নিয়ে সতর্কতা তৈরি বা সংক্রমনজনিত যেসব রোগ আছে, সেসব রোগ নিয়ে নিয়মিত আলোচনা বা প্রচারণা টেলিভিশনে, রেডিওতে, খবরের কাগজে বা সোশ্যাল মিডিয়ায় কি প্রচারিত হয়? বা কীভাবে হয়? এ বিষয়গুলো নজরে এনে কর্তৃপক্ষ সংবাদ মাধ্যমগুলোকে কি ঠিকঠাকভাবে কাজে লাগাতে পারছেন?
এমন প্রশ্নগুলোও কিন্তু মাথায় আসছে! এখানে বলে রাখা ভালো এ প্রশ্নগুলোর মধ্য দিয়ে সরকারকে হেয় করার কোনো উদ্দেশ্য নেই বরং সাধারণ মানুষ হিসেবে আমরা ভীষণ কৌতূহলী হয়ে উঠেছি এ সম্পর্কে জানতে! এই প্রশ্নগুলোর উত্তর নিশ্চয়ই সতর্কতা সৃষ্টিতে ভূমিকা রাখবে এবং একই সাথে সাধারণ মানুষকে জবাবদিহি করার কাজটিও করবে যা দিন শেষে আমাদের আতঙ্ক থেকে বের করে এনে হৃদয়কে করবে নির্ভার! আর এটার ভীষণ প্রয়োজন এ মুহূর্তে। সাধারণ মানুষ হিসেবে আমি উত্তর খুঁজছি। জবাব চাই।
- ট্যাগ:
- মতামত
- শিশুর মৃত্যু