শিক্ষামন্ত্রী নকল নিয়ে পড়ে আছেন কেন?
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জয়ী হয়ে সরকার গঠনের পর বিএনপি এহসানুল হক মিলনকে শিক্ষামন্ত্রী হিসেবে নিয়োগ দিয়েছে। কয়েক দিনের মধ্যে তার মন্ত্রীত্বের মেয়াদ দুই মাস পূর্ণ হবে। এই দুই মাসে মন্ত্রীর অধিকাংশ কথাবার্তা পরীক্ষায় নকলকেন্দ্রিক। বিভিন্ন অনুষ্ঠানে, রাস্তাঘাটে শিশুদের সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময়ের সময় তিনি ‘আর নকল চলবে না’ বলে হুমকি-ধমকি দিচ্ছেন—সেসব ভিডিও এখন সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল। মন্ত্রীকে নিয়ে তুমুল হাসাহাসি চলছে।
মন্ত্রীর প্রায় সকল বক্তব্যে কোনো না কোনোভাবে নকলকে টেনে আনার প্রবণতা শুরুতে কিছুদিন নেওয়া গেলেও এখন সেটি আর নেওয়া যাচ্ছে না। অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে, বিএনপি সরকারের এই বহুল চর্চিত মন্ত্রী যেন দুই দশক আগেই পড়ে আছেন।
একথা অস্বীকার করার উপায় নেই যে, এই শতকের গোড়ার দিকে বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থায় পরীক্ষাকেন্দ্রে নকল করা ছিল রীতিমতো ডালভাতের মতো। নকল করতে গিয়ে লুকোছাপারও কোনো দরকার ছিল না। বাড়ির কেউ এসএসসি পরীক্ষার্থী থাকলে, তার জন্য পরিবারের দুই-তিনজন সদস্য স্ট্যান্ডবাই থাকতেন, যাদের কাজ হতো নকল সরবরাহ করা অথবা কেন্দ্রে ঢুকে খাতায় লিখে দেওয়া।
মনে আছে, দোতলা বা তার ওপরের তলায় পরীক্ষার সিট পড়লে বাড়ি থেকে লোকজন মই নিয়ে যেত, যাতে আরামে নকল সরবরাহ করা যায়। কোনো কোনো কেন্দ্রের বাইরে মই ভাড়া দেওয়ার ব্যবসা জমজমাট হয়ে উঠত।
২০০১ সালে বিএনপি সরকার গঠন করল। সে সময় বেগম খালেদা জিয়ার সরকারের শিক্ষামন্ত্রী ছিলেন ওসমান ফারুক, এহসানুল হক মিলন ছিলেন শিক্ষাপ্রতিমন্ত্রী। পরীক্ষায় নকল বন্ধে মিলন তখন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন। নকল বন্ধে তিনি ছিলেন কঠোর; পরীক্ষাচলাকালীন রীতিমতো হেলিকপ্টারে চড়ে দেশের নানা জায়গায় দৌড়ে বেড়াতেন। পরীক্ষা কেন্দ্রকে প্রশাসনের জবাবদিহির আওতায় আনতে পেরেছিলেন তিনি। এসবের ফলও আমরা দেখেছি—মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষায় নকলের প্রবণতা কমে এসেছিল, মিলন প্রশংসিত হয়েছিলেন।
কিন্তু এসব আড়াই দশক আগের কথা। এর মধ্যে দেশের শিক্ষা ব্যবস্থা অনেক পাল্টে গেছে। শুধু দেশে নয়, গত এক দশকে বিশ্বব্যাপী শিক্ষায় বড় ধরনের পরিবর্তন এসেছে। ডিজিটাল শিক্ষা বড় জায়গা দখল করেছে, শ্রেণিকক্ষের ধরন পাল্টেছে। আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স শিক্ষার আশীর্বাদ ও অভিশাপ—উভয় হিসেবেই আবির্ভূত হয়েছে।
আড়াই দশক আগে বাংলাদেশের প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রথম শ্রেণীতে ভর্তির হার ছিল ৭৮ শতাংশ। এখন কোনো কোনো বছর সেই হার ১০০ শতাংশ ছাড়িয়ে যায়। যারা একটু দেরিতে স্কুল শুরু করে, তারাও ভর্তি হয়—তাই মাঝেমধ্যে হার শতভাগ অতিক্রম করে। অতীতের চেয়ে পাশের হার উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে, ডিভিশনের পরিবর্তে জিপিএ চালু হয়েছে, লাখ লাখ শিক্ষার্থী জিপিএ ৫ পেয়ে উত্তীর্ণ হচ্ছে।
১৯৭১ সালে দেশ স্বাধীন হওয়ার সময় যে দেশে সাক্ষরতার হার ছিল ১৬ শতাংশ, সেটি এখন ৭৫ শতাংশে উন্নীত হয়েছে। এহসানুল হক মিলন যখন আগেরবার মন্ত্রী ছিলেন, তখন ৮০ শতাংশ মেয়ে স্কুলে ভর্তি হতো; এখন সেই হার ছেলেদের সমান, কোথাও কোথাও তারও বেশি। তখন দেশে দারিদ্র্যের হার ছিল ৪০ শতাংশের কাছাকাছি। বিটিভিতে ‘নাল পিরান’ নামে নাটক হতো, যেখানে ভুখা ও মঙ্গায় আক্রান্ত মানুষের জীবনচিত্র উঠে আসত। ২০২৪-এ দারিদ্র্যের হার ১৭ শতাংশে নেমে এসেছিল। যদিও অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে সেটি আবার ২৫ শতাংশে উঠে গেছে বলে কিছু প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।
শুধু নকল নয়, আরও যেসব বিষয়ে মন্ত্রী মনোযোগ দিচ্ছেন—যেমন পরীক্ষা যারা নিচ্ছে, পরীক্ষার হলের ভেতরের পরিবেশ, কেন্দ্রে সিসিটিভি বসানো, পরীক্ষার হলে বসে ঘাড় ঘোরানো যাবে কি না—এসবের কোনোটিই বাংলাদেশের শিক্ষাক্ষেত্রের জন্য জরুরি আলাপ নয়। কয়টি ক্লাসরুমে সিসিটিভি লাগাবেন তিনি? সেসব নিরীক্ষা করবে কারা? কী লাভ হবে এসব ফুটেজ দেখে? অপরাধ প্রবণতা কমানোর দিকে নজর না দিয়ে অপরাধী ধরার প্রকল্পে খুব বেশি লাভ হয় না।