কোন পদ্ধতিগত দৃষ্টিভঙ্গিতে আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ করা হলো?
মুহাম্মদ ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকারের ধারাবাহিকতায় তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বিএনপি সরকারও দেশের অন্যতম প্রাচীন রাজনৈতিক দল বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। গত সপ্তাহে জাতীয় সংসদ সন্ত্রাসবিরোধী (সংশোধন) অধ্যাদেশ অনুমোদন করায় আওয়ামী লীগ ও এর অঙ্গসংগঠনগুলোর ওপর নিষেধাজ্ঞা বহাল থাকল। কিন্তু কোন রাজনৈতিক দলের কার্যক্রম নিষিদ্ধ করলেই কি ওই দলের মতবাদ ও রাজনৈতিক কর্মসূচিকে জনপরিসর থেকে মুছে ফেলা যায়? ইতিহাস তা বলে না।
১৯৪০ ও ১৯৫০-এর দশকে যুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে ফ্যাসিবাদ ফিরে আসার আশঙ্কা ও কমিউনিজমের ক্রমবর্ধমান ভয়ের প্রেক্ষাপটে কোন কোন দেশ কিছু রাজনৈতিক দলকে নিষিদ্ধ করে। তবে ফ্যাসিবাদ ও কমিউনিজম ভীতি যখন প্রশমিত হতে শুরু করল, তখন অধিকাংশ গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে রাজনৈতিক মতপ্রকাশের ওপর আরোপিত বিধিনিষেধগুলো কমিয়ে আনা হয়। হিটলারের ক্ষমতায় আরোহণ আর নাৎসি জার্মানির মর্মান্তিক অভিজ্ঞতার পরিপ্রেক্ষিতে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর পর রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধকরণের বিষয়টি সচরাচর খুব একটা গুরুত্বপূর্ণ উদ্বেগের বিষয় ছিল না। বর্তমানে গণতন্ত্র যেসব হুমকির সম্মুখীন, তার প্রকৃতি অনেকটাই পরিবর্তিত হয়েছে। রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধকরণের প্রাসঙ্গিকতাও তাই অনেকটাই হ্রাস পেয়েছে।
ঠিক কোন পরিস্থিতিতে একটি গণতান্ত্রিক দেশে কোন রাজনৈতিক দলকে গণতান্ত্রিক নির্বাচনে অংশগ্রহণ করা থেকে বিরত রাখা যেতে পারে সে প্রশ্নে রাজনৈতিক দার্শনিকেরা প্রধান দুটি দৃষ্টিভঙ্গি চিহ্নিত করেছেন। প্রথম দৃষ্টিভঙ্গিটিকে ‘পদ্ধতিগত দৃষ্টিভঙ্গি’ (procedural view) হিসেবে অভিহিত করা হয়। এই দৃষ্টিভঙ্গি অনুযায়ী, রাজনৈতিক অঙ্গনে সক্রিয় বিভিন্ন গোষ্ঠীর, এমনকি গণতন্ত্রবিরোধী দলগুলোরও, প্রতি সরকারের অবশ্যই নিরপেক্ষ আচরণ করতে হবে। সরকার কোন দলকেই ‘অবৈধ’ বা ‘অসাংবিধানিক’ হিসেবে চিহ্নিত করতে পারে না; বরং তাকে অবশ্যই সব ধরনের মতাদর্শের, তা মধ্যপন্থী হোক বা চরমপন্থী, প্রতি উন্মুক্ত থাকতে হবে। এই পদ্ধতিগত মডেলটিকে প্রায়শই যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পৃক্ত করা হয় এবং একারণেই এটিকে ‘আমেরিকান মডেল’ হিসেবেও অভিহিত করা হয়ে থাকে। এর বিপরীতে, ‘সারবত্তানিষ্ঠ দৃষ্টিভঙ্গি’ (substantive approach) অনুযায়ী গণতন্ত্র কোন স্বয়ংসম্পূর্ণ লক্ষ্য নয়। বরং এটি এমন একটি সমাজ বিনির্মাণের মাধ্যম যেখানে নাগরিকরা স্বশাসন ভোগ করেন। তারা একগুচ্ছ মৌলিক রাজনৈতিক অধিকারের স্থায়ী অধিকারী হন। এই অধিকারগুলো সংরক্ষণের স্বার্থে, একটি গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা সেইসব অসহিষ্ণু সত্তার প্রতি অসহিষ্ণু আচরণ করার অধিকার রাখে, যারা গণতন্ত্রকে ধ্বংস করতে সচেষ্ট।
আওয়ামী লীগকে কোন পদ্ধতিগত দৃষ্টিভঙ্গি অনুযায়ী নিষিদ্ধ করা হলো? সদ্য বিদায়ী অন্তর্বর্তী সরকার যখনই আওয়ামী লীগ কিংবা শেখ হাসিনার নাম উচ্চারণ করত, প্রতিবারই তারা ‘ফ্যাসিস্ট’ শব্দটি ব্যবহার করত। বর্তমান বিএনপি সরকার এবং জামায়াত-নেতৃত্বাধীন বিরোধী দলও আওয়ামী লীগকে একটি ফ্যাসিবাদী দল হিসেবে আখ্যায়িত করাকে রাজনৈতিকভাবে সুবিধাজনক মনে করে।
‘ফ্যাসিবাদী’ শব্দটি মুসোলিনির ইতালি কিংবা হিটলারের জার্মানির এমন উগ্র জাতীয়তাবাদী শাসনব্যবস্থার সঙ্গে সম্পর্কিত যা সহিংসতা, মিথ এবং সমাজের আমূল রূপান্তরের নেশায় আচ্ছন্ন ছিল। ফ্যাসিবাদ সাধারণত একটি উগ্র ডানপন্থী রাজনৈতিক মতাদর্শ যার মূল বৈশিষ্ট্য হলো একনায়কতান্ত্রিক ক্ষমতা, বিরোধীদের জোরপূর্বক দমন এবং সমাজ ও অর্থনীতির ওপর কঠোর নিয়ন্ত্রণ ও শৃঙ্খলারোপ। ফ্যাসিবাদের সঙ্গে আগ্রাসী সম্প্রসারণবাদ এবং সামরিকীকরণের বিষয়টিও ওতপ্রোতভাবে জড়িত। এছাড়া এতে থাকে পূর্ণাঙ্গ মতাদর্শিক নিয়ন্ত্রণ—যার আওতায় সংস্কৃতি, শিক্ষা এবং ব্যক্তিগত জীবনসহ জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রকে নিয়ন্ত্রণ করার জন্য সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চালানো হয়। বর্জনমূলক জাতীয়তাবাদও ফ্যাসিবাদের একটি অন্যতম বৈশিষ্ট্য যেখানে প্রকাশ্য বর্ণবাদ, বিদেশিদের প্রতি বিদ্বেষ বা সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর নিপীড়ন নিয়মিত ঘটনা।
কোন কোন পর্যবেক্ষকের মতে, ২০০৯ থেকে ২০০২৪ সালে আওয়ামী লীগ ক্রমশ ক্ষমতাকে কেন্দ্রীভূত করেছিল। তারা ভিন্নমত দমন আর বিরোধীপক্ষকে কোণঠাসা করতে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোও ব্যবহার করে। বিচার বিভাগকে নিয়ন্ত্রণ, সংবাদপত্রের স্বাধীনতা খর্ব এবং নির্বাচনি ফলাফলের ওপর প্রভাব বিস্তারের মতো পদক্ষেপগুলোকে এক ধরনের কর্তৃত্ববাদী প্রবণতার লক্ষণ হিসেবে দেখা যায়। যদিও এই বৈশিষ্ট্যগুলো নিঃসন্দেহে উদ্বেগজনক ছিল, তবুও এগুলো স্বয়ংক্রিয়ভাবে ফ্যাসিবাদের সমার্থক হয়ে ওঠে না। কর্তৃত্ববাদ একটি বিস্তৃত পরিসরে বিদ্যমান থাকে। আওয়ামী লীগের শাসনব্যবস্থায়ও এর উপস্থিতি ছিল, তবে তা ফ্যাসিবাদের পূর্ণাঙ্গ মানদণ্ডগুলো পূরণ করে না।
ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা এক শক্তিশালী ‘ব্যক্তিত্বের আরাধনা’ (personality cult) এবং বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধকেন্দ্রিক জাতীয়তাবাদী প্রচারণার প্রবণতাও ছিল। সমালোচকরা মাঝেমধ্যে এই উপাদানগুলোকে ফ্যাসিবাদের সঙ্গে সাদৃশ্যপূর্ণ বৈশিষ্ট্য বলে উল্লেখ করেন। তবে, প্রথাগত ফ্যাসিবাদ সাধারণত এক আগ্রাসী ধরনের উগ্র জাতীয়তাবাদকে ধারণ করে, যার সঙ্গে প্রায়শই সুনির্দিষ্ট বর্জনমূলক বা পরদেশবিদ্বেষী মতাদর্শ যুক্ত থাকে। আওয়ামী লীগের জাতীয়তাবাদ অত্যন্ত শক্তিশালী হলেও, এটি ঐতিহাসিক ফ্যাসিবাদের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট চরম বর্ণবাদী বা জাতিগত মতাদর্শগুলোকে অপরিহার্যভাবে ধারণ করে না।
দলটির সমালোচকরা যুক্তি দেন যে, নির্বাচনি প্রক্রিয়ায় কারসাজি এবং রাজনৈতিক বিরোধীদের দমনের বিষয়টি ক্ষমতা সুসংহতকরণের নামান্তর ছিল, যা ফ্যাসিবাদী শাসনব্যবস্থায় পরিলক্ষিত হয়। ঐতিহাসিক ফ্যাসিবাদী শাসনব্যবস্থাগুলোর বিপরীতে, আওয়ামী লীগের শাসনকালে বাংলাদেশে নিয়মিতভাবে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। একাধিক রাজনৈতিক দলের অস্তিত্বও বজায় ছিল। যদিও কারো কারো মতে, এই প্রক্রিয়াটি এমন সব শর্তের অধীনে পরিচালিত হয়েছে যা শাসক দলের অনুকূলে পক্ষপাতদুষ্ট ছিল। তবে, ফ্যাসিবাদ-সংশ্লিষ্ট সর্বগ্রাসী শাসনব্যবস্থাগুলো থেকে বেশ কিছু মৌলিক দিক থেকে এই ‘হাইব্রিড’ মডেলটি ভিন্ন ছিল।