টিকার জন্য দায় না দিয়ে পরিস্থিতি সামলে নেওয়া জরুরি
ডা. মুশতাক হোসেন বাংলাদেশের একজন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ। রোগতত্ত্ব, রোগনিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইডিসিআর) মেডিকেল প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। ২০২৫ সালের অক্টোবর মাসে মেডিকেল ভর্তি-ইচ্ছুকদের আন্দোলনে সংহতি জানানোর কারণে তাঁকে ওএসডি করা হয়েছিল। এর বাইরে তিনি এরশাদবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতা এবং ডাকসুর সাবেক সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। হঠাৎ করে এ বছর হামের প্রাদুর্ভাব বেড়ে যাওয়ার মূল কারণ এবং তা নিয়ন্ত্রণের উপায় নিয়ে তাঁর সঙ্গে কথা বলেছেন আজকের পত্রিকার সঙ্গে।
বাংলাদেশে হঠাৎ করে হামের প্রাদুর্ভাব বেড়ে যাওয়ার কারণ কী?
ডা. মুশতাক হোসেন: প্রতিবছরই কমবেশি হামে আক্রান্ত হয় শিশুরা। কিন্তু এ বছর সেটা অনেক বেশি বেড়ে গেছে। এ বছর সেটা বেশি হওয়ার কারণ হলো, প্রতিবার টিকা দেওয়া অভিযানের সময় কিছু কিছু শিশুকে টিকা দেওয়া বাদ পড়ে যায়। শতভাগ টিকা দেওয়া কখনো সম্ভব হয়ে ওঠে না। এতে করে দু-তিন বছর পরপর একটা বড় ধরনের টিকা অভিযান চালানো হয়, সেখানে টিকা পাওয়া এবং না-পাওয়া শিশুরা অন্তর্ভুক্ত থাকে। এই টিকা অভিযান চালানো হয় যেন কোনো শিশুই টিকা দেওয়া থেকে বাদ না পড়ে যায়। কিন্তু প্রতিটি টিকা অভিযানে গড়ে ৯৫ শতাংশ শিশুকে টিকা দেওয়া সম্ভব হয়। সর্বশেষ গণটিকা দেওয়া হয়েছিল ২০২০ সালে। এরপর করোনা, টিকার সমস্যা, জনবলসংকটের কারণে সেই গণটিকা দেওয়া আর সম্ভব হয়নি। আবার অর্থের সংস্থানের ব্যাপার ছিল। এভাবে টিকা না দেওয়া শিশুর সংখ্যা ২০২০ থেকে ২০২৬ সালে এসে এত বেড়ে গেছে যে এ বছর রোগীর সংখ্যা একটা বড় ধরনের বিস্ফোরণ আকার ধারণ করেছে। সাধারণত হামে আক্রান্ত এক হাজার রোগীর মধ্যে মাত্র একজন মারা যায়। এখন রোগীর সংখ্যা যদি হাজার হাজার হয়, তাহলে সেটাকে এক হাজার দিয়ে গুণ করে হিসাব বের করতে হবে। এ কারণেই মূলত আমরা চলতি বছর এ অবস্থার মধ্যে পড়েছি। এ বছর হামের এই প্রাদুর্ভাবকে অবশ্যই মহামারি বলতে হবে। কারণ, ইতিমধ্যে বাংলাদেশে হাম পরিস্থিতি ৫৬টি জেলায় ছড়িয়ে পড়েছে। আর সে অনুপাতে মৃত্যুর সংখ্যাও বেড়ে গেছে।
এই ছয় বছর যে টিকা দেওয়া হলো না, এ ক্ষেত্রে দায় আসলে কার?
ডা. মুশতাক হোসেন: এখন তো আর দায় দিয়ে লাভ হবে না। এখন পরিস্থিতিটাকে সামলে নেওয়া জরুরি। তবে আরও জরুরি হলো, স্বাস্থ্যব্যবস্থায় এ ধরনের ভুল যেন আর না করেন আমাদের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের লোকেরা। করোনার কারণে যে গ্যাপটা তৈরি হয়েছে, সেটাকে কভার দেওয়ার জন্য পরবর্তী সময়ে গণহারে টিকা দেওয়ার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু সেটার আয়োজন সম্পন্ন করতে করতে ২০২৩ এবং পরবর্তী সময়ে ২০২৪ সাল নির্ধারণ করা হলেও সে বছর তো আওয়ামী লীগ সরকার বিদায়ই নিল। এরপর অন্তর্বর্তী সরকার প্রস্তুতি নিতে নিতে টিকা দেওয়ার পরিকল্পনা বাদ দিয়ে দেওয়া হয়। অপারেশন প্ল্যান বন্ধ করার কথা ছিল আওয়ামী লীগ আমলে। এটা দ্রুততার সঙ্গে বাস্তবায়ন করার জন্য রাজস্ব খাত থেকে অর্থ পাওয়ার ব্যাপার ছিল। কিন্তু সেখান থেকে না নিয়ে অন্তর্বর্তী সরকারের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় বিকল্প ব্যবস্থা না করে সেটা এক ঝটকায় বন্ধ করে দিয়েছে। টিকা কেনার জন্য যখন তারা উদ্যোগ নিল তখন অর্থ মন্ত্রণালয় অভিযোগ দিল যে এর আগে দুবার টিকা কেনার সময় দুর্নীতি হয়েছিল। কিন্তু এই অভিযোগের পরেও স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় কোনো জবাব দেওয়ার প্রয়োজন মনে করেনি। এ কারণে অর্থ মন্ত্রণালয় নতুন করে টিকার জন্য অর্থ বরাদ্দের ব্যবস্থা করেনি। তখন স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ও এ বিষয়ে আর কোনো উদ্যোগ গ্রহণ করার প্রয়োজন বোধ করেনি। ভেবেছে, নির্বাচনের মাধ্যমে নতুন সরকার দায়িত্ব গ্রহণ করলে তখন ব্যাপারটি দেখা যাবে।
এ ছাড়া অর্থ মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে মিটমাট না করা, প্রধান নির্বাহীর নজরে না আনা এবং আন্তমন্ত্রণালয়ের সভায় বিষয়টা উপস্থাপন না করার কারণে বিষয়টি আরও জটিল আকার ধারণ করেছে। এটা শুধু হামের টিকা নিয়ে হয়নি, প্রায় সব টিকার ক্ষেত্রে একই ঘটনা ঘটেছে। এবং যুক্তরাষ্ট্রের অনুদান, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এবং বেসরকারি সংস্থাগুলোর অনুদানও বন্ধ হয়ে যাওয়ার কারণে একই সমস্যা ম্যালেরিয়া, এইচআইভি ও যক্ষ্মার টিকার ক্ষেত্রেও হয়েছে। সেসব রোগও কিন্তু যেকোনো মুহূর্তে বিস্ফোরণ ঘটাতে পারে।
তবে বর্তমান সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পরপরই সবচেয়ে গুরুত্ব দিয়ে যে কাজগুলো করার কথা ছিল, তা করছে। আর যেভাবে হামের বিস্তার ঘটছে এবং সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালে যেভাবে রোগী ভর্তি হচ্ছে—সেসব স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের না জানার কথা নয়। যদিও সেখানে আইসিইউ নিয়ে অনেক বাড়াবাড়ি ঘটনা ঘটেছিল। স্বাস্থ্যমন্ত্রীর প্রত্যক্ষ হস্তক্ষেপে দুটি নতুন আইসিইউ মেশিনের ব্যবস্থা করেছে। ডিএনসিসি হাসপাতালকে তিনি শুধু হামের রোগীর জন্য বরাদ্দ দিয়েছেন। ফলে এই জরুরি পরিস্থিতিতে যা করণীয় সেটা তাঁরা এখন করছেন। কিন্তু স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় যদি আগে থেকে অর্থাৎ পত্রপত্রিকা ও মিডিয়ায় এ বিষয়ে সংবাদ হওয়ার সময়ই বিষয়টির দিকে বিশেষ নজর দিত, তাহলে আমরা বেশ কিছু শিশুর প্রাণ বাঁচাতে পারতাম।
অন্যান্য টিকার কথাও আপনি উল্লেখ করেছেন। হামের মতো সেসব টিকা যথাসময়ে না দিলে তখন পরিস্থিতি যে ভয়াবহ আকার ধারণ করবে না, সেই নিশ্চয়তা কতটুকু?
ডা. মুশতাক হোসেন: বাকি সংক্রামক রোগগুলোতেও একই ঘটনা ঘটার আশঙ্কা রয়েছে। যেমন পোলিও, ধনুষ্টঙ্কার, হুপিং কাশি, নিউমোনিয়া, ডায়রিয়ার টিকার ক্ষেত্রেও গ্লোবাল ফান্ড থেকে অর্থ আসা বন্ধ হয়ে গেছে। ট্রাম্প ক্ষমতায় আসার পরে সেই ফান্ডে বরাদ্দ বাতিল করে দিয়েছে। এখন আমাদের দেশে হামের যে ধাক্কাটা যাচ্ছে, সেখান থেকে শিক্ষা নিয়ে আমাদের ওই রোগের টিকা দেওয়ার ক্ষেত্রে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া উচিত। নতুবা ওই সব রোগের প্রাদুর্ভাবের আশঙ্কা রয়েছে।
বর্তমানে হামের যে ভ্যারিয়েন্ট বা ধরনটি দেখা যাচ্ছে, সেটি কি আগের তুলনায় বেশি সংক্রামক?
ডা. মুশতাক হোসেন: হাম ভাইরাসের ভ্যারিয়েন্ট বা ধরন খুব বেশি একটা হয় না। প্রথমবার এটা যখন আবিষ্কৃত হয়েছিল, এরপর একবার শুধু এটাকে নবায়ন করা হয়েছে। কিন্তু এরপর এর যে আর কোনো নতুন ভ্যারিয়েন্ট হয়েছে, সেটা জানা যায়নি। এবার যেহেতু ৯ মাসের চেয়েও কম বয়সী শিশুদের বাংলাদেশসহ বিশ্বের অন্যান্য দেশেও আক্রান্ত হতে দেখা যাচ্ছে, সেহেতু চিকিৎসাবিজ্ঞানীরা অনুসন্ধান করে দেখছেন যে নতুন ভ্যারিয়েন্টে আক্রান্ত হলো কি না। তবে এখন পর্যন্ত নতুন ভ্যারিয়েন্টের কোনো প্রমাণ মেলেনি। ভবিষ্যতে জানা যেতে পারে।
দেশের অনেক জায়গায় টিকার সংকটের খবর শোনা যাচ্ছে—এই বিষয়ে প্রকৃত চিত্র কী? সরকার বা স্বাস্থ্য বিভাগ এই পরিস্থিতি সামাল দিতে কতটা প্রস্তুত?
ডা. মুশতাক হোসেন: সরকার জরুরি ভিত্তিতে কাজ করছে, এটা ভালো লক্ষণ। সরকারের পক্ষ থেকে আর একটা উদ্যোগ নিলে ভালো হবে। এর আগে যেসব দক্ষ ও যোগ্য ব্যক্তি করোনাসহ নানা দুর্যোগে ভালো কাজ করেছেন এবং এখন অবসরে গেছেন, রাজনৈতিক বিবেচনার বাইরেও অনেক নির্দলীয় লোক আছেন, তাঁদেরকে নিয়ে যদি নতুন কৌশল গ্রহণ করা হয়, তাহলে পরিস্থিতি তাড়াতাড়ি নিয়ন্ত্রণে আসবে। আমি আশাবাদী, তাঁরাও এগিয়ে আসবেন। তবে মাঠপর্যায়ের কর্মীদের নানা বিক্ষুব্ধতা আছে। শেখ হাসিনার পতনের পর অনেকের চাকরি চলে গেছে। তাঁদের স্থায়ী চাকরির ব্যবস্থা করতে না পারলেও অন্তত ভাতা দিয়েও কাজে লাগানো উচিত। আর যাঁদের চাকরি এখনো আছে, মন্ত্রী তাঁদের বেতন বাড়ানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। এখন সবকিছু বাস্তবায়নের দিকে এগিয়ে যাওয়া উচিত। রিসোর্স ও অভিজ্ঞতা দিয়ে যদি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ঠিকভাবে সমন্বয় করতে পারে, নিশ্চয়ই তারা সফল হবে।
- ট্যাগ:
- মতামত
- প্রাদুর্ভাব
- হাম রোগ