ট্রাম্প-নেতানিয়াহু জুটির আস্ফালনের পরিণতি
“একটি আস্ত সভ্যতা আজ মৃত্যুবরণ করবে। আর কখনো ফিরে আসবে না। আমি চাই না এটা ঘটুক, তবু হয়তো ঘটবে। যেহেতু শাসনক্ষমতার সম্পূর্ণ পরিবর্তন ঘটে গেছে যেখানে ভিন্নরকম, আকর্ষণীয় ও কম উগ্র গোষ্ঠি এখন ক্ষমতায়, কে জানে হয়তো কোনো চমৎকার বৈপ্লবিক ঘটনা ঘটতে যাচ্ছে। পৃথিবীর দীর্ঘ জটিল ইতিহাসে আজই তার ফয়সালা হবে। ৪৭ বছরের লুণ্ঠন, দুর্নীতি ও মৃত্যু শেষ হবে আজ। ইরানের মহান জনগণের ওপর ঈশ্বরের কল্যাণ বর্ষিত হোক।”
এই প্রলাপ কোনো কার্টুন চরিত্রের নয়, বাংলা সিনেমার কোনো ভিলেনেরও নয়, কোনো পাড়ার মাস্তানেরও নয়—পৃথিবীর সবচেয়ে ধনী, শক্তিশালী ও সভ্যতাগর্বী রাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের। যুক্তরাষ্ট্রের চেয়ে কয়েকশো গুণ বেশি ঐতিহ্যসমৃদ্ধ একটি দেশের জনগণকে পারমাণবিক বোমা মেরে নিশ্চিহ্ন করে দেয়ার হুমকি। পারমাণবিক বোমা মারার হুমকির সঙ্গে সঙ্গে তার মুখ দিয়ে অনর্গল এফ-বোমাও নির্গত হয়—সভ্যতা ধ্বংস করা ছাড়া তার শিক্ষার ঝুলিতে আর কিছু নেইও। ৭ এপ্রিল এই হুমকির দুদিন আগে ট্রাম্প তার ট্রুথ সোশ্যাল সামাজিক মাধ্যমে চ-শব্দ-ভরা যে পোস্ট করেছিলেন তাতেও ছিলো এই লাগামহীনতা—“মঙ্গলবার ইরানে হবে বৈদ্যুতিক স্থাপনা ও সেতু ধ্বংস উদযাপনের দিন—এক ঢিলে দুই পাখি!!! অতীতে কেউ এমন দেখেনি!!! ক্রেজি বাস্টার্ডরা, ‘এফ—’ প্রণালি খুলে দে, তোদের নরকে ঢুকাবো—খালি দ্যাখ!!!”
এই হলো বর্তমান যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের ভাষা! এক অসংস্কৃত ধনী ক্ষমতাগর্বীর অসহায় আস্ফালন! ইরান যে ভেনেজুয়েলা নয় তা বুঝতে তার ৪০ দিন সময় লেগেছে। ফলে ৭ তারিখে পারমাণবিক বোমা ফেলে ইরানকে পৃথিবী থেকে মুছে ফেলার হুমকির পরই তাকে সুর পাল্টে যুদ্ধবিরতির গান গাইতে হয়েছে। যেকোনো পরাজয়কে জয়ের পোশাক পরাতে পারঙ্গম ট্রাম্প ভাব করেছেন যে তার হুমকির ভয়েই ইরান যুদ্ধবিরতির চুক্তিতে বসতে ও হরমুজ প্রণালি খুলে দিতে রাজি হয়ে গেছে।
অথচ ইরান বলেছে তারা পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় আলোচনায় বসতে রাজি হয়েছে, সঙ্গে ইরান ১০ দফা দাবি উত্থপান করেছে যা হজম করা ট্রাম্প ও নেতানিয়াহু উভয়ের জন্যই কষ্টকর। ইরান ভয়ে যে হরমুজ প্রণালি খুলে দিচ্ছে বলে ট্রাম্প বাগাড়ম্বর করছিলেন, দেখা গেল তার উল্টা, এ প্রণালি দিয়ে জাহাজ যাবে কেবল ইরানি সামরিক বাহিনীর সঙ্গে সমন্বয়ের মাধ্যমে। শুধু তাই নয়, ইরান সমস্ত যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করেছে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে। কেননা তারা জানে আলোচনা-বৈঠক ট্রাম্প ও নেতানিয়াহুর চক্রের একটি পুরনো ছল যা তারা ব্যবহার করেন অতর্কিতভাবে প্রতিপক্ষের ওপর হামলা চালানোর জন্য।
স্পষ্টতই পাকিস্তানের যুদ্ধবিরতির প্রস্তাবটি ট্রাম্পকে একটি সুযোগ এনে দিয়েছে যুদ্ধের ফাঁদ থেকে বেরিয়ে যাওয়ার ও আংশিক বিজয় ঘোষণার। কিন্তু বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর কাছে ব্যাপারটি পছন্দ নয়। অতএব যুদ্ধবিরতি ঘোষণার পরপরই ইসরায়েল আবার গণহত্যা শুরু করে লেবাননজুড়ে। বুধবারে ১০ মিনিটে ১০০ হামলা চালিয়ে রাজধানী বৈরুতে ৯১ জনসহ ২৫৪ জনকে হত্যা করা হয় ও আহত হন এগারোশোর বেশি মানুষ। নেতানিয়াহুর দাবি, লেবানন এই যুদ্ধবিরতির অন্তর্ভুক্ত নয়। অথচ কথাটা ডাহা মিথ্যা, লেবানন এই যুদ্ধবিরতির অনিবার্য অংশ—যুদ্ধবিরতিতে মধ্যস্থতাকারী পাকিস্তানের বরাত দিয়ে জানান ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি।
ইরানকে ধ্বংস করে মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে ইসরায়েলের একচ্ছত্র আধিপত্য নিশ্চিত করে অবৈধ সম্প্রসারণ চালিয়ে যাওয়া নেতানিয়াহুর পঞ্চাশ বছরের স্বপ্ন। কিন্তু তা এখন নেতানিয়াহুর দুঃস্বপ্নে পরিণত হওয়ার পথে। নেতানিয়াহুর স্বার্থ যত বেশিদিন সম্ভব আমেরিকাকে ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে জড়িয়ে রাখা যায়। সে কারণে আলোচনা ও যুদ্ধবিরতি বানচাল করতে ইসরায়েল উদগ্রীব। ইরান-আমেরিকার আলোচনাকে নেতানিয়াহু গণহত্যার লাইসেন্স হিসেবে ব্যবহার করতে চান। কিন্তু ইরান অনড়—তারা জানিয়েছে আলোচনা হবে বন্দুকের ট্রিগারে হাত রেখে। কেননা আমেরিকা ও ইসরায়েলের কোনো কথায় এখন আর কেউ বিশ্বাস করে না।
যুক্তরাষ্ট্র তার মিত্রদের হারাচ্ছে, ইরানের কাছে চড় খাওয়ার পর আরও হারাবে, কারণ বিশ্বের সবাই জানল যুক্তরাষ্ট্রের কোনো মুরোদ নেই কাউকে কোনোরকম নিরাপত্তা দেয়ার—মধ্যপ্রাচ্যের মার্কিন পদলেহী সব দেশ সাক্ষী। যুক্তরাষ্ট্রের সৈন্যরা তাদের নিরাপত্তা দেবে কী, নিজেরাই পালিয়ে প্রাণ বাঁচাচ্ছে। অন্যদিকে ইরানের মিত্রশক্তি আগেও যেমন ছিল, এখনও তেমনি অটুট। হিজবুল্লাহ ও হুতিদের কথা বাদ দিয়েও বলা যায়, সারা বিশ্বের সাধারণ মানুষের নৈতিক সমর্থন এখন ইরানের ঝুলিতে। এমনকি যে ইরানি জনগণকে উসকানি দিয়েছিলেন ট্রাম্প মোল্লাতন্ত্রের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর জন্য, সেই ইরানিরাও দেশপ্রেমের ব্যাপারে কোনো আপস করেনি। ইরানের এই দৃঢ়তা ও ইরানি জনগণের এই ঐক্য মার্কিন আগ্রাসনের পরবর্তী সম্ভাব্য শিকার কিউবাসহ অন্যান্য দেশকে নৈতিক শক্তি জোগাবে। অতএব যুক্তরাষ্ট্রের হার হবে দীর্ঘমেয়াদী।
ট্রাম্পের দুই সপ্তাহ যুদ্ধবিরতি ঘোষণার পর খ্যাতিমান গ্রিক অর্থনীতিবিদ ইয়ানিস ভারাওফ্যাকিস তার এক্স-পোস্টে লেখেন: “প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প পিছু হটলেন একটি অবৈধ ও ধ্বংসাত্মক যুদ্ধ বাধিয়ে, যা সারা বিশ্বের অর্থনীতিকে ধাক্কা দিল (আর ইউরোপের আপ্রাসঙ্গিকতা ও ভণ্ডামি আবার প্রমাণ করল), এবং ইরানকে গণহত্যা ও সভ্যতা নিশ্চিহ্ন করে দেয়ার হুমকি দিয়ে। রোমান সাম্রাজ্যের পতনের কালে একজন রোমান সম্রাট গথিক যোদ্ধাদের হাতে তার সৈন্যবাহিনীর বিরাট পরাজয়ের পর যেভাবে বিজয় ঘোষণা করতেন ও রোমে জয়ের উৎসব আয়োজন করতেন, আজকের এই আধুনিক আমেরিকান নীরোও সেভাবে আমাদেরকে বোঝাতে চেষ্টা করছেন যে তিনি জিতে গেছেন। সত্য হচ্ছে, হরমুজ প্রণালি দিয়ে কোন জাহাজ যাবে কিংবা যাবে না তা এখন ইরান ঠিক করছে, আর প্রথমবারের মত তারা টোল আদায় করছে। বোমা বর্ষণ বন্ধের যেসব শর্ত ট্রাম্প দিয়েছিলেন, হোয়াইট হাউজের সেই দাবিগুলো এখন ধুলায় বিলীন। ইরানের সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম হস্তান্তর, ইরানি মিসাইলের ধ্বংসসাধন, শাসনব্যবস্থা পরিবর্তনের বৃথা আশা, ইরানি তেলব্যবসা নিয়ে পরিকল্পনা—সব লক্ষ্য এখন বিস্মৃতির অতলে। কিন্তু যা কখনো বিস্মৃতির অতলে যাবে না তা হচ্ছে হাজার হাজার মানুষকে হত্যা ও পঙ্গু করাসহ, ইরান আক্রমণের প্রথম দিনই একটি স্কুলে হামলা চালিয়ে ১৮০ জন স্কুলছাত্রীকে খুন করা।”
আরেকটি পোস্টে তিনি মন্তব্য করেন, “মানসিক বিকারগ্রস্ত আহাম্মকটা কি ইরানে গণহত্যা চালানোর পরিকল্পনা স্বীকার করলেন? হ্যাঁ, তাই। তিনি কি মনে করছেন, ইরানি নেতৃত্ব পিছু হটবে? যদি তা মনে করেন তবে আমি যা ভেবেছিলাম তিনি তারচেয়ে বেশি বিকারগ্রস্ত।”