আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধ ইতিহাসের প্যারাডক্স
আমাদের দেশের মানুষের কিছু বৈশিষ্ট্য আছে। এটার কারণ ভৌগোলিক নাকি নৃতাত্ত্বিক, জানি না। রক্তের ডিএনএর মধ্যে এটা আছে হয়তো। পেটে ভাত না থাকলেও আমরা দিনরাত একটা খোয়াবের মধ্যে বাস করি। আর সেটা হচ্ছে রাজনীতি। রাজনীতি মানেই দল। আর দল মানেই দলাদলি, সেটা দেখতেই পাচ্ছি।
সবাই আছে একটা দৌড়ের ওপর—কে কাকে ডিঙিয়ে, মেরে, উপড়ে ফেলে দেশের দখল নেবে। এই দখলদারি জায়েজ করার জন্য দুনিয়ার তাবৎ মুখরোচক শব্দ দিয়ে লেখা হয় লক্ষ্য, আদর্শ, ঘোষণাপত্র। তৈরি হয় দফাওয়ারি কর্মসূচি। তাতে মানুষের দফারফা হওয়ার জোগাড়। তাতে কী? এটি রাজনীতি। আর রাজনীতি তো এ দেশে মহান গণতান্ত্রিক অধিকার। সে অধিকার ছিনিয়ে নেবে, এমন বুকের পাটা আছে কার? তারপরও এক দল আরেক দলের রাজনীতি বন্ধ করে দেয়। এতে নাকি জনস্বার্থ রক্ষা পায়, গণতন্ত্র মজবুত হয়, রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব টিকে যায়।
এ দেশে দল নিষিদ্ধের খেলা চলছে অনেক দিন ধরে। আমরা প্রথমবার স্বাধীন হয়ে পেলাম সাধের পাকিস্তান। শুরুতেই নিষিদ্ধ হলো কমিউনিস্ট পার্টি। কারণ, তারা গণতন্ত্রে বিশ্বাস করে না। তারা শ্রেণি–হিংসার রাজনীতি করে। তার ওপর তারা নাকি ইসলামবিরোধী। ইসলামবিরোধী কিছু একটা মুসলমানের দেশ পাকিস্তানে থাকবে, এটা তো মেনে নেওয়া যায় না!
১৯৫৪ সালে পূর্ব পাকিস্তানে প্রথমে যুক্তফ্রন্টের এবং পরে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে একটা কোয়ালিশন সরকার থাকাকালে কমিউনিস্ট পার্টির ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া হয়েছিল। আইয়ুব খানের সামরিক শাসনের আমলে দলটি আবারও নিষিদ্ধ হয়। সেই নিষেধাজ্ঞা বহাল থাকে একাত্তর সাল পর্যন্ত।
নিষেধের খড়্গ তারপর গিয়ে পড়ে জামায়াতে ইসলামীর ঘাড়ে। ১৯৫৩ সালে লাহোরে আহমদিয়াবিরোধী (কাদিয়ানি) দাঙ্গা উসকে দেওয়ার অভিযোগে দলটি প্রথমবার নিষিদ্ধ হয়। বছরখানেকের মধ্যেই সে নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া হয়। ১৯৬১ সালে সরকারের জারি করা মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশের বিরোধিতা করতে গিয়ে দলটি আবার নিষিদ্ধ হয়। আবার রাজনীতিতে ফিরে আসে ১৯৬৫ সালে।
আইয়ুব খানের সামরিক শাসনের জমানায় আর কোনো রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধ হয়নি। তবে রাজনৈতিক কার্যক্রম নিষিদ্ধ ছিল চার বছরের মতো। ১৯৭১ সালে এসে ইয়াহিয়া খানের সামরিক সরকার আওয়ামী লীগ এবং ওয়ালি খানের নেতৃত্বাধীন ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি নিষিদ্ধ করে। পাকিস্তানে ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি আর কখনো স্বনামে ফিরে আসেনি। ওই দলের লোকেরা পাকিস্তান ন্যাশনাল পার্টি নামে নতুন দল তৈরি করে।
স্বাধীন বাংলাদেশে শুরুর দিকে আইন করে কোনো দল নিষিদ্ধ করা হয়নি। বাহাত্তরের সংবিধানে ধর্মভিত্তিক রাজনীতির ওপর বিধিনিষেধ থাকায় ইসলামপন্থী দলগুলো আপনা-আপনি গর্তে ঢুকে যায়। এগুলোর মধ্যে ছিল মুসলিম লীগ, জামায়াতে ইসলামী, নেজামে ইসলাম পার্টি এবং পাকিস্তান ডেমোক্রেটিক পার্টি। একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের সময় এরা ছিল ইয়াহিয়া সরকারের সহযোগী। এখানে একটি কথা উল্লেখ করা দরকার। এ দলগুলো এমনিতেই ব্রাত্য হয়ে গিয়েছিল ১৯৭০ সালের নির্বাচনের পর। নাগরিকেরা ভোট দিয়ে দলগুলোকে অস্তাচলে পাঠিয়ে দিয়েছিল।
১৯৭৫ সালের ২৫ জানুয়ারি সংবিধানের চতুর্থ সংশোধনী জারি হলে সব রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধ হয়ে যায়। রাষ্ট্রপ্রধান শেখ মুজিবুর রহমান চালু করেন একটি ‘জাতীয়’ রাজনৈতিক দল—বাংলাদেশ কৃষক শ্রমিক আওয়ামী লীগ (বাকশাল)। এটি কার্যত ছিল নতুন মোড়কে আওয়ামী লীগ ও এর মিত্রদের নিয়ে একটি দল।
পঁচাত্তরের ১৫ আগস্ট মুজিব হত্যাকাণ্ডের মধ্য দিয়ে চালচিত্র পাল্টে যায়। বাকশাল ব্যবস্থা বাতিল হয়। রাজনৈতিক দলগুলোর পুনরুত্থান ঘটে। নেতা হিসেবে উত্থান ঘটে জেনারেল জিয়াউর রহমানের। তিনি প্রজ্ঞাপন জারি করে সংবিধানের কিছু ধারা বদলে দেন ও সংশোধন করেন। ফলে ধর্মভিত্তিক দলগুলোর পুনরুত্থান ঘটে। রাজনৈতিক দলের নিবন্ধনের প্রক্রিয়া শুরু হয়।
১৯৭৬-৭৭ সালে জিয়াউর রহমানের সরকারকে উৎখাত করার লক্ষ্যে বেশ কয়েকটি অভ্যুত্থানের চেষ্টা হয়। ওই সময় তিনটি দলকে নিষিদ্ধ করা হয়েছিল—মণি সিংহের নেতৃত্বাধীন বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি), খন্দকার মোশতাক আহমদের ডেমোক্রেটিক লীগ আর এম এ আওয়ালের নেতৃত্বাধীন জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (জাসদ)। ওই সময় কারাবন্দী জলিল-রবের নেতৃত্বাধীন জাসদ দল হিসেবে নিবন্ধন পায়নি।