শিশু মৃত্যু : প্রতিরোধযোগ্য এক ট্র্যাজেডির সামনে রাষ্ট্রের জবাবদিহিতা
বাংলাদেশে ফিরে এসেছে পুরোনো আতঙ্ক-হাম। যে রোগকে আমরা একসময় নিয়ন্ত্রণে এনে প্রায় নির্মূলের পথে নিয়ে গিয়েছিলাম, সেই রোগই আজ আমাদের শিশুর প্রাণ কেড়ে নিচ্ছে। এটা কোনো অচেনা রোগ নয়, কোনো দুরারোগ্য ব্যাধিও নয়।
এটা সম্পূর্ণ প্রতিরোধযোগ্য সংক্রমণ-যার টিকা বহুবছর ধরেই সহজলভ্য। তবুও যখন এই রোগে শিশুর মৃত্যু ঘটে, মা-বাবার বুক খালি হয়ে যায়-তখন সেটা কেবল স্বাস্থ্যসংকট থাকে না, সেটা একটি রাষ্ট্র, একটি সমাজ এবং একটি ব্যবস্থার গভীর ব্যর্থতার প্রতিচ্ছবি হয়ে দাঁড়ায়।
২০২৬ সালের মার্চ-এপ্রিল-মাত্র একমাসে বাংলাদেশে ১০০-র বেশি শিশু হামে মারা গেছে, আক্রান্তের সংখ্যা হাজার ছাড়িয়েছে আগেই। ভয়াবহ হলো-আক্রান্তদের এক-তৃতীয়াংশই ৯ মাস বয়সের নিচের শিশু, যারা এখনো নিয়মিত টিকা নেওয়ার বয়সে পৌঁছায়নি। অর্থাৎ, তারা নিজেদের সুরক্ষা করার সুযোগ পাওয়ার আগেই একটি ভেঙে পড়া সমষ্টিগত সুরক্ষার প্রচণ্ড ব্যর্থতার শিকার হয়েছে।
বাংলাদেশ এক দশকের মধ্যে এখন সবচেয়ে বৃহৎ হামের প্রাদুর্ভাবের মুখোমুখি। হাজার-হাজার সন্দেহভাজন সংক্রমণ, শতাধিক মৃত্যু-এই চিত্র আচমকা তৈরি হয়নি। নিশ্চিত করে বলা যায়, বাংলাদেশের এই পরিস্থিতি কোনো আকস্মিক ঘটনা নয়। এর পেছনে বছরের পর বছর জমে থাকা অব্যবস্থাপনা, টিকার ঘাটতি এবং স্বাস্থ্যব্যবস্থার দুর্বলতা কাজ করেছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এটা ‘ইমিউনিটি গ্যাপ’-এর সরাসরি ফল, যেখানে বিপুল সংখ্যক শিশু টিকার বাইরে থেকে গেছে।
এই বাস্তবতা বুঝতে ‘হার্ড ইমিউনিটি’ বা সমষ্টিগত প্রতিরোধ ক্ষমতার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। হামের মতো অত্যন্ত সংক্রামক রোগের ক্ষেত্রে সমাজের অন্তত ৯৫ শতাংশ মানুষকে টিকার আওতায় আনতে হয়, যাতে ভাইরাস ছড়াতে না পারে। কিন্তু বাংলাদেশে সেই কভারেজ অনেকক্ষেত্রে ৮৫ থেকে ৯০ শতাংশের মধ্যে সীমাবদ্ধ।
এই সামান্য ঘাটতিই ভয়াবহ হয়ে উঠেছে। কারণ, হামের সংক্রমণ ক্ষমতা এত বেশি যে একজন আক্রান্ত ব্যক্তি সহজেই ১৫ থেকে ১৮ জনকে সংক্রমিত করতে পারে। ফলে যখন বড় অংশের শিশু টিকার বাইরে থাকে, তখন ছোট সংক্রমণও দ্রুত জাতীয় সংকটে রূপ নেয়।
২০২০ সালের পর থেকে বাংলাদেশে বড় আকারের মিজেলস-রুবেলা ক্যাম্পেইন নিয়মিতভাবে না হওয়ায় বড় ধরনের ‘ইমিউনিটি গ্যাপ’ তৈরি হয়েছে। ২০২৫ সালের হিসাব অনুযায়ী, বাংলাদেশে প্রায় ৫ লাখ শিশু পূর্ণ টিকাদান থেকে বঞ্চিত ছিল-যা আজকের এই সংকটের ভিত্তি তৈরি করেছে।
এরসঙ্গে যুক্ত হয়েছে স্বাস্থ্যব্যবস্থার কাঠামোগত দুর্বলতা। দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল, উপকূলীয় এলাকা এবং শহরের বস্তিগুলোয় এখনো টিকাদান সেবা সমানভাবে পৌঁছায় না। কোথাও টিকার সরবরাহ অনিয়মিত, কোথাও কোল্ড-চেইন ব্যবস্থাপনায় ঘাটতি, কোথাও আবার প্রশিক্ষিত স্বাস্থ্যকর্মীর অভাব।
অনেকক্ষেত্রে অভিভাবকরা সময়মতো জানতেই পারেন না কখন, কোথায় এবং কীভাবে তাদের শিশুকে টিকা দিতে হবে। আবার অনেকেই স্বাস্থ্যকেন্দ্রে গিয়ে টিকা না পেয়ে ফিরে আসেন। এই অভিজ্ঞতাগুলো মানুষের মধ্যে আস্থাহীনতা তৈরি করেছে, যা শেষ পর্যন্ত টিকাদান ব্যবস্থাকেই দুর্বল করে তুলেছে।
তথ্য না জানা এখানে একমাত্র সমস্যা নয়। বড় সমস্যা হলো তথ্য না পাওয়া। অনেক মা জানেন না হামের লক্ষণ কতটা বিপজ্জনক, কখন দ্রুত চিকিৎসা নিতে হবে, কিংবা টিকার সময়সূচি কী! ফলে অনেকক্ষেত্রে তারা প্রথমে স্থানীয় ফার্মেসি বা অপ্রশিক্ষিত চিকিৎসার ওপর নির্ভর করেন, যার ফলে চিকিৎসা নিতে দেরি হয় এবং জটিলতা বাড়ে। এই যোগাযোগ ব্যর্থতা সরাসরি শিশুমৃত্যুর ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়।
অন্যদিকে, অপুষ্টিও এই সংকটকে আরও তীব্র করে তুলেছে। অপুষ্ট শিশুদের শরীরে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম থাকায় তারা দ্রুত সংক্রমিত হয় এবং মৃত্যুঝুঁকিও বেশি থাকে। ফলে হামের প্রাদুর্ভাব শুধু সংক্রামক রোগের সমস্যা নয়-এটা পুষ্টি, দারিদ্র্য এবং সামাজিক বৈষম্যের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত।
- ট্যাগ:
- মতামত
- শিশুর মৃত্যু
- হাম রোগ