জ্ঞানভিত্তিক সমাজ ও রাষ্ট্র গঠনে মানসম্মত শিক্ষার অপরিহার্যতা

কালের কণ্ঠ ড. মোহাম্মদ ছিদ্দিকুর রহমান খান প্রকাশিত: ১০ এপ্রিল ২০২৬, ১১:৩৩

বাংলাদেশ আজ এক গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে। বিশ্বায়ন, চতুর্থ শিল্প বিপ্লব ও প্রযুক্তিনির্ভর জ্ঞান-অর্থনীতির যুগে বাংলাদেশকে টিকে থাকতে হলে একটি জ্ঞানভিত্তিক সমাজ ও রাষ্ট্র গঠন অপরিহার্য। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান কিছুদিন আগে বাংলা একাডেমির একুশে বইমেলা উদ্বোধনকালে জ্ঞানভিত্তিক আলোকিত সমাজ গঠনের জন্য আহবান জানিয়েছেন। এর আগে ২০২৪ সালের জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনার পতনের পর ৭ আগস্ট প্রদত্ত এক ভাষণে বিএনপির সাবেক চেয়ারপারসন প্রয়াত প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া বলেছিলেন, ‘তরুণেরা যে স্বপ্ন নিয়ে বুকের রক্ত ঢেলে দিয়েছে, সেই স্বপ্ন বাস্তবায়ন করতে মেধা, যোগ্যতা ও জ্ঞানভিত্তিক গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ গড়ে তুলতে হবে।’


বিএনপির বিভিন্ন নীতিগত ঘোষণায় শিক্ষার মানোন্নয়ন ও জ্ঞানভিত্তিক সমাজ ও রাষ্ট্র গঠনের কথা বলা হয়েছে। জ্ঞানভিত্তিক সমাজ ও রাষ্ট্র বলতে এমন একটি সমাজ ও রাষ্ট্র ব্যবস্থাকে বোঝায়, যেখানে জ্ঞান, তথ্য, গবেষণা ও উদ্ভাবনই উন্নয়নের প্রধান চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করে। এ ধরনের সমাজে মানুষের চিন্তা-সৃজনশীলতা, বিজ্ঞানমনস্কতা এবং উদ্ভাবনী ক্ষমতা বৃদ্ধি পায়, যা অর্থনৈতিক অগ্রগতি ও সামাজিক কল্যাণ নিশ্চিত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। একটি জ্ঞানভিত্তিক সমাজ ও রাষ্ট্রের অগ্রগতি নির্ভর করে তার মানবসম্পদের গুণগত মানের ওপর, আর সেই মানবসম্পদ গড়ে ওঠে মানসম্মত শিক্ষার মাধ্যমে। তাই একটি আলোকিত জ্ঞানভিত্তিক সমাজ গঠনের জন্য মানসম্মত শিক্ষা নিঃসন্দেহে অপরিহার্য পূর্বশর্ত।


সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশ সর্বজনীন শিক্ষা বিস্তারের ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে। প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরে ভর্তির হার বৃদ্ধি, নারীশিক্ষার প্রসার এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সংখ্যা বৃদ্ধি দেশের শিক্ষাব্যবস্থার অগ্রগতি নির্দেশ করে। তবে এই অগ্রগতির পাশাপাশি মানসম্পন্ন শিক্ষা নিশ্চিত হয়েছে কি না এ বিষয়ে প্রশ্ন করার অবকাশ রয়েছে।


বলা যায়, শিক্ষার পরিমাণগত সম্প্রসারণে সফলতা অর্জিত হলেও গুণগত মান নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে এখনো অনেক সীমাবদ্ধতা রয়ে গেছে। আমরা জানি যে শিক্ষা কেবল তথ্য আহরণ বা পরীক্ষায় ভালো ফল করার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, এটি একটি সমন্বিত রূপান্তর প্রক্রিয়া, যার মাধ্যমে মানুষ বৌদ্ধিক, নৈতিক ও সামাজিকভাবে পরিপূর্ণ হয়ে ওঠে। আর এরূপ মানুষই একটি জ্ঞানভিত্তিক সমাজ ও রাষ্ট্র গঠনে অনুঘটক হিসেবে কাজ করে। ফলে একটি জাতির সামগ্রিক উন্নয়ন এবং জ্ঞানভিত্তিক সমাজ ও রাষ্ট্রের জন্য শিক্ষার মান নিশ্চিত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ—


প্রথমত, মানসম্মত শিক্ষা মানুষের মানসিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশের অন্যতম প্রধান উপায়। এটি মানুষকে শুধু পুথিগত জ্ঞানে সীমাবদ্ধ রাখে না, বরং তার মধ্যে বিশ্লেষণধর্মী চিন্তা, সমস্যা সমাধানের দক্ষতা এবং নতুন কিছু উদ্ভাবনের সামর্থ্য গড়ে তোলে। বর্তমান সময়ে তথ্য-প্রযুক্তির বিস্তারের ফলে তথ্যের প্রাচুর্য ঘটেছে, কিন্তু আমাদের বিদ্যমান শিক্ষাব্যবস্থায় শিক্ষার্থীদের সেই তথ্যকে সঠিকভাবে বিশ্লেষণ ও প্রয়োগ করার দক্ষতা তৈরি করে না। একটি উন্নত মানসম্পন্ন ও কার্যকর শিক্ষাব্যবস্থা শিক্ষার্থীদের সমালোচনামূলক চিন্তা-ভাবনা ও সৃজনশীলতা বিকাশে সহায়তা করে, যার ফলে তারা কেবল জ্ঞান গ্রহণকারী হিসেবে নয়, বরং নতুন জ্ঞান সৃষ্টিকারী হিসেবেও আত্মপ্রকাশ করতে পারে। এ ধরনের দক্ষ ও সৃজনশীল মানবসম্পদই একটি জ্ঞানভিত্তিক সমাজ ও রাষ্ট্র গঠনের মূলভিত্তি হিসেবে কাজ করে।


দ্বিতীয়ত, মানসম্মত শিক্ষা সমাজে নৈতিকতা ও মানবিক মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। কেবল প্রযুক্তিগত দক্ষতা দিয়ে একটি জাতির উন্নয়ন সম্ভব নয়, যদি সেখানে সততা, সহনশীলতা, ন্যায়বোধ ও সামাজিক দায়বদ্ধতা না থাকে। একটি কার্যকর শিক্ষাব্যবস্থা শিক্ষার্থীদের মধ্যে দেশপ্রেম, সহমর্মিতা, সহনশীলতা ও বৈচিত্র্যের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ জাগ্রত করে। এর মাধ্যমে তারা কেবল ব্যক্তিগত উন্নয়ন নয়, বরং সমাজের কল্যাণে কাজ করতে উদ্বুদ্ধ হয়। সত্যিকার অর্থে একটি উন্নত ও আলোকিত সমাজ গঠনের জন্য এসব নৈতিক ও মানবিক মূল্যবোধ অপরিহার্য।


তৃতীয়ত, অর্থনৈতিক উন্নয়ন এবং মানসম্মত শিক্ষার মধ্যে সম্পর্ক অত্যন্ত গভীর ও পারস্পরিক নির্ভরশীল। বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, যেসব দেশের শিক্ষাব্যবস্থা উন্নত ও কার্যকর, সেসব দেশের উৎপাদনশীলতা, উদ্ভাবনশীলতা ও সামগ্রিক অর্থনৈতিক অগ্রগতি তুলনামূলকভাবে অনেক বেশি। বর্তমান বিশ্বে জ্ঞানভিত্তিক অর্থনীতির গুরুত্ব ক্রমাগত বাড়ছে। আর জ্ঞানভিত্তিক অর্থনীতিতে শারীরিক শ্রমের চেয়ে জ্ঞান, দক্ষতা ও সৃজনশীলতার মূল্য অনেক বেশি। ফলে দক্ষ ও প্রশিক্ষিত মানবসম্পদ তৈরি করতে না পারলে একটি দেশ বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ে। বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশের জন্য বিষয়টি আরো তাৎপর্যপূর্ণ। টেকসই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জন এবং দীর্ঘ মেয়াদে উন্নয়নের ধারা বজায় রাখতে মানসম্মত শিক্ষার কোনো বিকল্প নেই। বিশেষ করে চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের যুগে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, রোবটিকস, বিগ ডেটার মতো তথ্য-প্রযুক্তিনির্ভর দক্ষতা অর্জন অপরিহার্য হয়ে উঠেছে। শিক্ষাব্যবস্থাকে এসব নতুন বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ না করলে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম বৈশ্বিক শ্রমবাজারে প্রতিযোগিতা করতে পারবে না। সুতরাং জাতীয় উন্নয়নের জন্য দেশের সম্ভাবনাময় তরুণ প্রজন্মের পূর্ণ সক্ষমতা কাজে লাগাতে সময়ের চাহিদা অনুযায়ী পাঠ্যক্রম, শিক্ষণপদ্ধতি এবং মূল্যায়নব্যবস্থায় প্রয়োজনীয় পরিবর্তন আনতে হবে।

সম্পূর্ণ আর্টিকেলটি পড়ুন

প্রতিদিন ৩৫০০+ সংবাদ পড়ুন প্রিয়-তে

আরও