খাল খনন নয়, প্রয়োজন নদী পুনঃখনন

প্রথম আলো মাহবুব সিদ্দিকী প্রকাশিত: ০৫ এপ্রিল ২০২৬, ১৮:০৪

গত শতাব্দীর ১৯৭০-এর দশকের শেষ সময় থেকে শুরু হয়ে ১৯৮০-এর দশকের শুরু অবধি সমগ্র বাংলাদেশে মৃত বা অর্ধমৃত নদী জাগিয়ে তোলার অভাবনীয় এক মহাকর্মযজ্ঞ চলেছিল। টানা তিন বছরব্যাপী চলতে থাকা সেই নদী খননের কাজগুলো ছিল একেকটি ‘ঐতিহাসিক গল্প’। একটি দেশের প্রাণপ্রকৃতি রক্ষার তাগিদে এত বড় উদ্যোগ গ্রহণ এবং বাস্তবায়নের প্রচেষ্টা পৃথিবীর ইতিহাসে বিরল।


সেই সময়ে আমাদের পার্শ্ববর্তী দেশ ভারত ফারাক্কা বাঁধের মাধ্যমে গঙ্গার পানি প্রত্যাহার শুরু করেছিল। এ ছাড়া বাংলাদেশের তিন দিক দিয়ে প্রবেশ করা অভিন্ন নদ-নদীগুলোর উজানে ভারত বিভিন্ন স্থাপনা নির্মাণ করে পানি প্রত্যাহার করতে শুরু করে। এর ফলে বাংলাদেশের অভ্যন্তরের শত শত নদ–নদী প্রয়োজনীয় পানির প্রবাহ না পেয়ে শুকিয়ে যেতে থাকে।


কয়েক বছরের মধ্যেই বাংলাদেশের বাস্তুতন্ত্রে এর বিরূপ প্রভাব দেখা যায়। বাংলাদেশের প্রাণপ্রকৃতি-পরিবেশের ওপর নেমে আসা সেই অশনিসংকেত উপলব্ধি করেছিলেন তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান। বাংলাদেশে তখনকার কিছু নদীবিশেষজ্ঞ এবং প্রকৃতিবিদের পরামর্শ নিয়ে একক উদ্যোগ ও প্রচেষ্টায় তিনি শুরু করেছিলেন মৃত ও অর্ধমৃত নদ–নদী পুনঃখননের কাজ।


কিছু কিছু মজে যাওয়া মানবসৃষ্ট খাল ও খাঁড়ি সেই পুনঃখননের তালিকায় ছিল। মৃত নদী পুনঃখননের পাশাপাশি শুরু হয় বৃক্ষরোপণ ও সবুজ বনায়নের কাজ। সমগ্র জাতি ঐক্যবদ্ধ হয়ে এই দুই মহাকর্মযজ্ঞে নিজেদের সম্পৃক্ত করেছিল। এর আগেই ১৯৭৭ সালে ভারতের সঙ্গে পাঁচ বছর মেয়াদি সফল গঙ্গা চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়।


২.


১৯৭৮ থেকে ১৯৮১ সালের প্রথম কয়েক মাস পর্যন্ত মৃত নদী পুনঃখননের সেই বিশাল কর্মযজ্ঞের সঙ্গে আমার সরাসরি সংশ্লিষ্টতা ছিল। সেই অভিজ্ঞতার কথা প্রকাশ করা এই সময় প্রাসঙ্গিক বলে মনে করছি।


ওই সময়ে আমি সরকারি দায়িত্ব নিয়ে পাবনা জেলায় কর্মরত। জিয়াউর রহমান একাধিকবার পাবনা জেলার বিভিন্ন প্রান্তে এসেছেন। অন্যান্য বাহিনীর পাশাপাশি পুলিশ বিভাগের পক্ষ থেকে আমার দায়িত্ব ছিল তাঁর ব্যক্তিগত নিরাপত্তায় নিয়োজিত থাকা। এর ফলে সুযোগ হয়েছিল একেবারে কাছ থেকে তাঁর প্রতিটি পদক্ষেপ, তাৎক্ষণিক আদেশ, নির্দেশ ও মন্তব্য দেখার এবং শোনার। তাঁর ক্ষণস্থায়ী শাসনকালের মধ্যে তিন বছর নদী খননের কাজে তিনি দেশের প্রায় প্রতিটি কোণে নিজে হাজির হয়ে পরিবেশ রক্ষার বার্তা পৌঁছে দিতে সক্ষম হয়েছিলেন।


সেই সময় সিরাজগঞ্জসহ বৃহত্তর পাবনা জেলায় মধ্যে জিয়াউর রহমান মোট তিনবার সফর করেন এবং কমবেশি ১০টি প্রায় বিলুপ্ত নদ–নদী পুনঃখনন করে প্রবাহ ফিরিয়ে আনতে সক্ষম হন। নদ–নদীগুলো ছিল প্রাচীন আত্রাই, ইছামতী ও করতোয়া। আরও ছিল বাদাই, চন্দ্রাবতী, কাগেশ্বরী, মুক্তাহার, ধানবান্দী, বান্নাই ইত্যাদি। তাঁর নিরলস প্রচেষ্টা ও দক্ষ নেতৃত্বগুণে তিন বছরের মধ্যেই বাংলাদেশের প্রায় ৩০০ মৃত বা অর্ধমৃত নদ–নদী ফিরে পেয়েছিল নিজেদের জীবন্ত সত্তা।


আমার জানামতে তৎকালীন বৃহত্তর পাবনা জেলায় আলোচ্য তিন বছরের মধ্যে নতুন করে কোনো খাল খনন করা হয়নি। পুনঃখনন করা হয়েছিল উল্লিখিত নদ–নদীগুলো। কেবল পাবনার চলনবিল অঞ্চলের কয়েকটি খাল পুনঃখনন করা হয়েছিল। বিভ্রান্তি দেখা দেয় অন্যত্র। নদী খননের সেই কর্মযজ্ঞকে দেশের তৎকালীন প্রশাসন ও বিভিন্ন গণমাধ্যম নাম দেয় ‘খাল খনন’।


৩.


অনাদিকাল থেকে বয়ে চলা নদীর প্রবাহগুলো অকৃপণভাবে তাদের অমূল্য সম্পদ বিলিয়ে দিয়েছে দুই পারের জনবসতিকে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে প্রাকৃতিক ও মানবসৃষ্ট কারণে সেসব স্বাভাবিক প্রবাহে ব্যত্যয় ঘটতে শুরু করে। তলদেশ ভরাট হয়ে শুকিয়ে যাওয়ার মতো পর্যায়ে পৌঁছে যায় বহু নদী। স্থানীয় প্রশাসনের মাধ্যমে কিংবা রাষ্ট্রীয়ভাবে সেসব নদী পুনরুদ্ধারের জন্য নদী খননের কাজ শুরু হয়। পুনঃখনন করতে গিয়ে অনেক নদীর আসল বৈশিষ্ট্য পাল্টে দিয়ে তার অবয়ব মারাত্মকভাবে সংকুচিত করে ফেলা হয়। চোখের নিমেষে মৃত বা অর্ধমৃত হয়ে পড়া প্রশস্ত একটি নদী হারিয়ে ফেলে তার আগের অবয়ব। নদীর দুই পারে থেকে যায় বিস্তৃত ও প্রশস্ত ভূখণ্ড। নদী নিষ্প্রাণ হয়ে পড়ে।


নদী খনন কর্তৃপক্ষ, বিশেষ করে বিভিন্ন বিভাগের প্রকৌশলীরা নতুনভাবে প্রাণ পাওয়া নদীগুলোকে চিহ্নিত করেছিলেন খাল হিসেবে। আর কর্মসূচির নাম দিয়েছিলেন ‘খাল খনন’। ভূমি অফিসের কর্মকর্তা–কর্মচারীরা এই প্রক্রিয়ার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত থাকেন এবং সচেতনভাবেই নানা অযৌক্তিক সিদ্ধান্ত বাস্তবে রূপ দিতে সাহায্য করেন। তাঁদের কাছে দালিলিক প্রমাণ না থাকার কারণ নেই যেসব বিলুপ্তপ্রায় পানিপ্রবাহ পুনঃখনন করা হচ্ছে, সেগুলো খাল নয়, কোনো দিনই খাল ছিল না।


বিলুপ্তপ্রায় এসব নদ–নদীর ভিন্ন ভিন্ন নাম রয়েছে। খননের পর এগুলো পূর্ববর্তী সত্তা ফিরে পেলে তাদের নিজ নিজ নামে অভিহিত করাই ছিল যুক্তিযুক্ত। সেটি না করে নদীকে তাঁরা খাল নামে অভিহিত করেছেন। কিন্তু নদী কখনো খাল হয় না; খাল কখনো কখনো নদীতে রূপান্তরিত হতে পারে।

সম্পূর্ণ আর্টিকেলটি পড়ুন

প্রতিদিন ৩৫০০+ সংবাদ পড়ুন প্রিয়-তে

আরও