ইতিহাসের শিক্ষা, বর্তমানের বাস্তবতা ও ভবিষ্যতের পথরেখা
একটি রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক যাত্রায় সংসদ কেবল একটি সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান নয়, বরং জনগণের সার্বভৌম ইচ্ছার প্রতিফলন। রাষ্ট্র পরিচালনার মূল দিকনির্দেশনা, আইন প্রণয়ন, নীতিনির্ধারণ এবং সরকারের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার প্রধান মঞ্চ হলো সংসদ। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে—আমাদের সংসদ কি সত্যিই সেই প্রত্যাশিত ভূমিকা পালন করতে পারছে? দেশ গড়ার স্বপ্ন বাস্তবায়ন করতে হলে এই প্রশ্নের সৎ উত্তর খুঁজে বের করা এবং প্রয়োজনীয় সংস্কার করা এখন সময়ের দাবি।
বাংলাদেশের সংসদীয় ইতিহাস বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, স্বাধীনতার পরপরই একটি কার্যকর সংসদ গঠনের প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল। ১৯৭২ সালের সংবিধান প্রণয়নের মাধ্যমে একটি প্রগতিশীল ও গণতান্ত্রিক কাঠামো প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেওয়া হয়। প্রথম সংসদে বিতর্ক, মতবিনিময় ও নীতিনির্ধারণের একটি প্রাণবন্ত পরিবেশ ছিল। কিন্তু রাজনৈতিক অস্থিরতা, অর্থনৈতিক সংকট এবং পরবর্তীতে একদলীয় শাসনব্যবস্থার প্রবর্তনের ফলে সেই ধারাবাহিকতা ভেঙে যায়।
পরবর্তী সময়ে সামরিক শাসনের দীর্ঘ অধ্যায় সংসদীয় গণতন্ত্রকে আরও দুর্বল করে তোলে। সংসদ তখন কার্যত একটি আনুষ্ঠানিক প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়, যেখানে প্রকৃত বিতর্ক বা বিরোধী মতের সুযোগ সীমিত ছিল। ১৯৯১ সালে গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার পর সংসদ আবার তার কার্যকারিতা ফিরে পাওয়ার সুযোগ পায়। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে, সেই সুযোগ পুরোপুরি কাজে লাগানো যায়নি।
১৯৯১-পরবর্তী সংসদগুলোর একটি বড় সমস্যা ছিল বিরোধী দলের সংসদ বর্জন। প্রায় প্রতিটি মেয়াদেই বিরোধী দল দীর্ঘ সময় ধরে সংসদে অনুপস্থিত থেকেছে। ফলে সংসদে কার্যকর বিতর্ক, সমালোচনা ও বিকল্প মতামতের অভাব দেখা দিয়েছে। একতরফা আইন পাস, দ্রুত বিল অনুমোদন এবং সংসদীয় কমিটির দুর্বলতা সংসদের কার্যকারিতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে।
কার্যকর সংসদের অন্যতম শর্ত হলো শক্তিশালী ও সক্রিয় বিরোধী দল। গণতন্ত্রে বিরোধী দল সরকারের প্রতিপক্ষ নয়, বরং গণতান্ত্রিক ভারসাম্যের একটি অপরিহার্য অংশ। তারা সরকারের ভুলত্রুটি তুলে ধরে, বিকল্প প্রস্তাব দেয় এবং জনগণের স্বার্থ রক্ষায় সোচ্চার থাকে। কিন্তু যদি বিরোধী দলকে দমন করা হয় বা তারা নিজেরাই সংসদ থেকে দূরে থাকে, তাহলে সংসদ তার প্রাণশক্তি হারায়।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো সংসদে বিতর্কের মান। অনেক সময় দেখা যায়, গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় ইস্যুগুলো নিয়ে গভীর ও তথ্যভিত্তিক আলোচনা হয় না। ব্যক্তিগত আক্রমণ, কটূক্তি এবং রাজনৈতিক প্রতিহিংসা সংসদের পরিবেশকে কলুষিত করে। এতে জনগণের কাছে সংসদের গ্রহণযোগ্যতা কমে যায় এবং তরুণ প্রজন্ম রাজনীতির প্রতি আগ্রহ হারায়।
সংসদীয় কমিটিগুলো একটি কার্যকর সংসদের মেরুদণ্ড হিসেবে বিবেচিত। উন্নত গণতান্ত্রিক দেশগুলোতে এসব কমিটি অত্যন্ত শক্তিশালী এবং প্রভাবশালী। তারা বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের কাজ পর্যবেক্ষণ করে, নীতিনির্ধারণে ভূমিকা রাখে এবং দুর্নীতি প্রতিরোধে কার্যকর পদক্ষেপ নেয়। কিন্তু আমাদের দেশে সংসদীয় কমিটিগুলোর কার্যকারিতা এখনও প্রত্যাশিত পর্যায়ে পৌঁছায়নি। অনেক ক্ষেত্রে তাদের সুপারিশ বাস্তবায়িত হয় না, যা একটি বড় দুর্বলতা।