স্বাস্থ্য খাতের স্বাস্থ্য ফেরাতে এই মুহূর্তে যা করতে হবে
এই মুহূর্তে স্বাস্থ্য খাতে সরকারের করণীয় নির্ধারণ করতে গেলে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভারসাম্যের প্রশ্ন সামনে আসে। সেটি হলো—তাৎক্ষণিক পদক্ষেপ এবং মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি সংস্কারের মধ্যে সমন্বয়।
বাস্তবতা হলো, এ দুটি লক্ষ্য একে অপরের পরিপূরক। বর্তমান অবস্থার উন্নয়ন জনগণের আস্থা বাড়াবে এবং সংস্কারের জন্য একটি সহায়ক পরিবেশ তৈরি করবে।
কেননা, জনগণ অধিক সুবিধা পেতে শুরু করলে সংস্কার কার্যক্রমকে বাধাগ্রস্ত করবে না। একই সঙ্গে, টেকসই সংস্কার স্বাস্থ্য খাতকে দীর্ঘ মেয়াদে আরও শক্তিশালী ও জনমুখী করে তুলবে।
সরকার ইতিমধ্যেই অন্যান্য খাতের মতো স্বাস্থ্য খাতেও প্রথম ১৮০ দিনের একটি কর্মসূচি প্রণয়ন করছে। এর ফলে নির্বাচনী ইশতেহারে দেওয়া প্রতিশ্রুতিগুলোর পাশাপাশি আরও বিস্তৃত প্রেক্ষাপটে স্বাস্থ্য খাতের কাঠামোগত পরিবর্তনের নানা উপাদান অন্তর্ভুক্ত হওয়ার কথা।
এসব উদ্যোগের ফলাফল ধীরে ধীরে দৃশ্যমান হবে। তবে এই মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার পাশাপাশি বর্তমান সময়ে মানুষের জন্য কী করা জরুরি, সে প্রশ্ন আরও গুরুত্বপূর্ণ।
নির্বাচনী ইশতেহারের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের উদ্যোগ যেমন প্রয়োজন, তেমনি জনগণকে তাৎক্ষণিক সেবা দেওয়ার জন্য বিদ্যমান স্বাস্থ্যব্যবস্থাকে আরও কার্যকর করা অত্যন্ত জরুরি।
উল্লেখ্য, যেকোনো বড় ধরনের সংস্কার বাস্তবায়নে সময় লাগে। একই সঙ্গে, সংস্কার চলাকালে স্বাভাবিক সেবা বিঘ্ন ঘটার ঝুঁকি থাকে। অনেক ক্ষেত্রে সমাজের সবচেয়ে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীই এই পরিবর্তনের সময় সবচেয়ে বেশি ভোগান্তির শিকার হয়।
এক অর্থে এটিকে সংস্কারের একটি ট্র্যাজেডি বলা যায়, যেখানে পরিবর্তনের লক্ষ্য উন্নয়ন হলেও অস্থায়ীভাবে কিছু মানুষের কষ্ট বেড়ে যায়।
তবে সঠিকভাবে পরিকল্পিত ও বাস্তবায়িত সংস্কার মধ্য ও দীর্ঘ মেয়াদে অধিকাংশ মানুষের জন্য সুফল বয়ে আনে। বিপরীতে সংস্কার যদি সঠিকভাবে বাস্তবায়িত না হয়, তাহলে তা কাঙ্ক্ষিত ফল তো দেয়ই না, বরং জনদুর্ভোগ বাড়ায়, যা জনগণের আস্থা আরও কমিয়ে দেয়।
দীর্ঘকাল পর দেশে স্বাভাবিক সরকারব্যবস্থা ফিরে আসায় বর্তমান সরকারের প্রতি জনগণের প্রত্যাশা অনেক বেড়েছে। নির্বাচনী ইশতেহারে দেওয়া প্রতিশ্রুতিগুলো ছিল বিস্তৃত ও উচ্চাভিলাষী। ফলে সাধারণ মানুষ সেগুলোর বাস্তব প্রতিফলন দেখতে আগ্রহী।
এ প্রত্যাশা পূরণ করতে হলে সরকারকে একদিকে যেমন সঠিক প্রস্তুতির ভিত্তিতে দ্রুত সংস্কার কার্যক্রম শুরু করতে হবে, অন্যদিকে বিদ্যমান ব্যবস্থাকে আরও কার্যকর করে জনগণের তাৎক্ষণিক সেবা নিশ্চিত করতে হবে।
বর্তমানে স্বাস্থ্য খাতের কাঠামোবদ্ধ অনেক চ্যালেঞ্জের মধ্যে অন্যতম প্রধান সমস্যা হলো বরাদ্দকৃত বাজেটের সঠিক ব্যবহার বা খরচ করতে না পারা। বিষয়টিকে কয়েকটি পয়েন্টে বিশ্লেষণ করা যায়।
একটি আদর্শ স্বাস্থ্যব্যবস্থার জন্য যে পরিমাণ অর্থ প্রয়োজন, বর্তমানে বরাদ্দ দেওয়া হয় তার মাত্র তিন ভাগের এক ভাগ। বছরের মাঝামাঝি সময়ে যখন বাজেট পর্যালোচনা করা হয়, তখন দেখা যায় কাঙ্ক্ষিত অগ্রগতি না হওয়ায় সেই অপর্যাপ্ত বরাদ্দেরও প্রায় তিন ভাগের এক ভাগ কমিয়ে দেওয়া হয়। অবশিষ্ট বরাদ্দের প্রায় তিন ভাগের এক ভাগ অব্যয়িত থাকে। যে অর্থটুকু খরচ করা হয়, তার মধ্যেও প্রায় তিন ভাগের এক ভাগ অপচয় হয়। সব মিলিয়ে দেখা যায়, স্বাস্থ্য খাতের মোট বাজেটের মাত্র তিন ভাগের এক ভাগ প্রকৃত অর্থে জনগণের সেবায় কার্যকরভাবে ব্যবহৃত হয়। তাই বলা যায়, স্বাস্থ্য খাতের প্রস্তাবিত বরাদ্দ থেকে শুরু করে কার্যকর ব্যয় পর্যন্ত প্রতিটি ধাপের প্রায় তিন ভাগের এক ভাগই এক অদৃশ্য জালে বন্দী হয়ে আছে।
- ট্যাগ:
- মতামত
- স্বাস্থ্য খাতের উন্নয়ন