ঈদের ছুটিতে দুর্ঘটনা: কলার মোচা প্রযুক্তিই কি শেষ সম্বল
ঈদের ছুটিতে এ দেশে দুর্ঘটনা বলেকয়ে আসে। কারণ, একই ধরনের দুর্ঘটনা একই সময়ে এখানে একইভাবে ঘটে।
ঈদের ঠিক পরের দিন ২২ মার্চ রোববার ভোরে কুমিল্লার পদুয়ার বাজার রেলক্রসিংয়ে একটি বাস রেললাইনে উঠে পড়ে। চট্টগ্রাম থেকে ঢাকাগামী ‘ঢাকা মেইল ট্রেন’ সেটিকে ধাক্কাতে ধাক্কাতে মাইলখানেক নিয়ে যায়। দুর্ঘটনার পর তাৎক্ষণিকভাবে সাতজনের লাশ উদ্ধার করা হয়। পরে নিহতের সংখ্যা বাড়তে বাড়তে ১২ জনে দাঁড়ায়। চট্টগ্রামের সঙ্গে রেল যোগাযোগ আবার চালু করতে পাঁচ ঘণ্টা পার হয়ে যায়। যথারীতি গোটা তিনেক তদন্ত কমিটি গঠিত হয়। প্রমাণ সাপেক্ষে হতাহত ব্যক্তিদের পরিবারকে শ্রেণিমতো অনুদান (ক্ষতিপূরণ নয়) দেওয়ার প্রতিশ্রুতিও দেওয়া হয়।
ঈদের আগে ১৮ মার্চ বুধবার বেলা আড়াইটার দিকে আরেকটি যাত্রীবাহী ট্রেন ‘নীলসাগর এক্সপ্রেস’ বগুড়ার আদমদীঘিতে লাইনচ্যুত হয়। নয়টি বগি লাইনের বাইরে চলে যায়। ফলে উত্তরের পাঁচ জেলা—নীলফামারী, দিনাজপুর, ঠাকুরগাঁও, পঞ্চগড় ও জয়পুরহাটের সঙ্গে ঢাকার রেল যোগাযোগ বন্ধ হয়ে যায়। আশপাশের তিনটি স্টেশনে আটকা পড়ে আরও পাঁচটি ট্রেন। ঈদে ঘরমুখী মানুষ চরম বিড়ম্বনায় পড়ে। দুর্ঘটনায় পড়া ট্রেনের ছাদে থাকা যাত্রীরা নিচে পড়ে আহত হন। বগির ভেতরে থাকা যাত্রীরাও আহত হন। সরকারি হিসাবে সেখানে আহত ব্যক্তির সংখ্যা ৬৬।
পদুয়ার বাজার ক্রসিংয়ে দুর্ঘটনা ‘নতুন নয়’। সর্বশেষ এই দুর্ঘটনার সময় নবনির্বাচিত স্থানীয় এমপি মনিরুল হক সিঙ্গাপুরে চিকিৎসাধীন ছিলেন। সেখান থেকে তিনি সড়ক পরিবহন ও সেতু, রেল এবং নৌপরিবহনমন্ত্রী শেখ রবিউল আলমকে কান্নাজড়িত কণ্ঠে টেলিফোনে বলেন, ‘এই লাশ দেখতে দেখতে আমি বৃদ্ধ হয়ে গেছি। ভাই রবিউল, এটা নতুন ঘটনা নয়। এক শ বছর ধরে এই ঘটনা ঘটছে। কেউ বিচার করে না।...এই পদুয়ার বাজার রেলওয়ে ব্যারিকেড ঠিক করেন। (তাহলে) আমি শান্তি পাব জীবনে।’ এই কথোপকথনের দৃশ্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেখা গেছে।
রেলের তালিকা অনুযায়ী পূর্বাঞ্চলে গত আট বছরে আটটি বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটেছে। এতে ৬৭ জনের মৃত্যু হয়েছে। এর আগে ২০২৩ সালের ২৩ অক্টোবর ভৈরব দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছিলেন ১৯ জন আর গুরুতর আহতের সংখ্যা কমপক্ষে ৫০। ওই দিন ভৈরব রেলস্টেশনের আউটার পয়েন্টে ঢাকাগামী আন্তনগর এগারসিন্দুর এক্সপ্রেসের সঙ্গে একটি মালবাহী ট্রেনের সংঘর্ষ হয়। ওই ঘটনায় চালক, সহকারী চালক ও গার্ড সংকেত ভালোভাবে লক্ষ না করায় দুর্ঘটনা ঘটেছে বলে তদন্ত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
সচেতন পাঠক আর রেল কর্মকর্তাদের নিশ্চয় মনে আছে বড়তাকিয়া ট্র্যাজেডির কথা। কোচিং সেন্টারের শিক্ষক এবং শিক্ষার্থীদের বহনকারী এক মাইক্রোবাসকে ধাক্কা দেয় চট্টগ্রামগামী মহানগর প্রভাতী ট্রেন। সেটি ছিল ২০২২ সালের ২৯ জুলাইয়ের ভরা দুপুর। মহানগর প্রভাতী মাইক্রোবাসটিকে ধাক্কাতে ধাক্কাতে প্রায় এক কিলোমিটার ঠেলে নিয়ে যায়। এতে নিহত হন ১৩ জন। প্রায় পাঁচজন পঙ্গুত্ব বরণ করেন। এই ঘটনায় মাইক্রোবাসের চালক ও গেটম্যানকে দায়ী করে দুটি তদন্ত কমিটি।
এর আগে চট্টগ্রামের খুলশীর ঝাউতলা রেলক্রসিংয়ে গেটম্যানের অবহেলায় ২০২১ সালের ৪ ডিসেম্বর ডেমু ট্রেনের সঙ্গে সংঘর্ষে তিনজনের মৃত্যু হয়। এই তালিকা শেষ হওয়ার নয়। তবে বর্ণনা থেকে একটা বিষয় পরিষ্কার। তা হলো, সব সময় দায়ী হন সবচেয়ে নিচের কর্মীরা। এখানেই ‘ফুলস্টপ’। তাঁদের যাঁরা তত্ত্বাবধান করেন, তাঁরা থেকে যান ধরাছোঁয়ার বাইরে।
‘সব কটাকে ছেড়ে দিয়ে বেঁড়েটাকে ধর’—এটাই এখন চর্চিত চর্চা; বন্দোবস্তের অপরিহার্য অংশ।
এবারের রেল দুর্ঘটনায় নিহতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারত, যদি সব বন্দোবস্তের বাইরে গিয়ে দিনাজপুরের ফুলবাড়ীর দিনমজুর এনামুল হক এগিয়ে না আসতেন কলার মোচা নিয়ে। রেলসড়ক ধরে কাজে যাওয়ার সময় তাঁর চোখে পড়ে লাইনের প্রায় এক ফুট অংশ ভাঙা। কিছুক্ষণের মধ্যেই এসে যাবে পঞ্চগড়গামী আন্তনগর পঞ্চগড় এক্সপ্রেস। কিছু খুঁজে না পেয়ে লাঠির আগায় কলার মোচা বেঁধে দাঁড়িয়ে যান রেললাইনে। মাত্র ৫ মিনিটের মধ্যেই এক্সপ্রেস ট্রেনটি কাছাকাছি চলে আসে। তাঁর কলার মোচার সিগন্যাল দেখে চালক গাড়ি থামিয়ে দেন। কয়েক শ যাত্রী ভয়াবহ দুর্ঘটনার হাত থেকে বেঁচে যান। প্রতিদিন ওই পথে ঢাকা, রাজশাহী, দিনাজপুর, পঞ্চগড়, পার্বতীপুর, চিলাহাটিসহ উত্তরাঞ্চলে ১০-১৫টি ট্রেন যাতায়াত করে।
এ দেশটা যেমন সাধারণ মানুষের হাতে তৈরি, তেমনি সাধারণ মানুষের হাতেই দেশটা নিরাপদ। অথচ তাঁদের সম্পৃক্ত করার কোনো প্রক্রিয়া নেই। এনামুলরা কতবার আর নিজের গরজে লাঠির আগায় কলার মোচা নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকবেন? এনামুল বা কলার মোচা কোনোটাই এই দেশে অফুরন্ত নয়।
মানুষ গাফেল নয়, কিন্তু দেশের চালকেরা গাফেল হলে সেটা ঘরে ঘরে ছড়িয়ে পড়ে ছোঁয়াচে রোগের মতো। ঈদের আনন্দ মাটি হয়েছে দেওয়ানগঞ্জের শিশুদের। পৌরসভার তৈরি এক কথিত ভাসমান সেতু পরিণত হয়েছিল মৃত্যুফাঁদে। পৌরসভা সেটা জানত; কিন্তু চালু রেখেছিল। পৌরসভার সহকারী প্রকৌশলী জানিয়েছেন, সেতুটি ঝুঁকিপূর্ণ হওয়ায় সতর্কতামূলক সাইনবোর্ড লাগানো হয়েছিল। দেশের অনেক মহাসড়কে সেতুর সামনে এ রকম দায়সারা সতর্কতামূলক সাইনবোর্ড ঝুলিয়ে রাখার রেওয়াজ আছে। তিনি কি জানতেন না কাছাকাছি একটি ইকোপার্কে যাতায়াত সহজ করতে ভাঙা সেতুটি অস্থায়ীভাবে মেরামত করা হয়েছিল?
এ ধরনের মেরামতি কাজ যে মানুষের মনে ভুয়া নিরাপত্তা ধারণা তৈরি করে? তাঁর অনুমতি ও ব্যবস্থাপনা সহযোগিতা ছাড়া এ রকম ভোগিযোগি মার্কা মেরামত সম্ভব ছিল কি? পৌরসভাগুলো সেই ২০২৪ সাল থেকেই চলে গেছে আমলাদের বগলে। কে কার প্রশ্নের কী জবাব দেবে?
গণগাফিলতির এক অপূর্ব বর্ণনা দিয়েছেন একজন ফেরি পারাপার বাসযাত্রী। যেদিন দৌলতদিয়া ট্র্যাজেডি ঘটে, সেদিনই রাতে (২৫ মার্চ) তিনি যাচ্ছিলেন একই ঘাট দিয়ে। তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লিখেছেন, ‘তিন নম্বর ঘাট দিয়ে ফেরিতে উঠি গন্তব্যের জেলার সবচেয়ে নামজাদা পরিবহনে। দেখলাম দেশ–কাঁপানো এক ট্র্যাজেডির পরেও কারও হুঁশ হয়নি। দুর্ঘটনার ২৪ ঘণ্টাও পার হয়নি, মানুষ নির্বিকার বাস ফেরিতে ওঠার সময় কেউই নামল না। দরজাও ছিল আটকানো, চাইলেও নামার উপায় ছিল না। নামার ব্যাপারে না বাস কোম্পানি, না যাত্রী, কারও কোনো হেলদোল ছিল না। কেবল আমি ক্ষীণ স্বরে একবার–দুইবার বলতে পারলাম, যাত্রী নামায়ে নিলে ভালো হইতো না ভাই? কেউ কানে তোলেনি সেই মিনমিনে আকুতি।’
- ট্যাগ:
- মতামত
- ঈদের ছুটি
- দুর্ঘটনায় নিহত