ঈদের আনন্দযাত্রা যখন মৃত্যুর মিছিল
ঈদের কয়েক দিন আগে থেকেই ঢাকার রাস্তায় একটা অদ্ভুত প্রাণচাঞ্চল্য তৈরি হয়। মানুষ বাসের টিকিটের জন্য লড়াই শুরু করে, তারপর ব্যাগ গুছিয়ে ছোটা শুরু হয়। সবার মুখে একটাই কথা—বাড়ি যাব। এই ‘বাড়ি যাওয়া’র ভেতরে লুকিয়ে থাকে বছরের সমস্ত ক্লান্তি ধুয়ে নেওয়ার স্বপ্ন, মায়ের মুখ দেখার আকাঙ্ক্ষা, শিকড়ের কাছে ফেরার তীব্র টান। কিন্তু এই আনন্দের যাত্রা বারবার পরিণত হয় শোকের মিছিলে। এবারের ঈদেও তার ব্যতিক্রম হয়নি।
সড়ক, রেল ও নৌপথে এবারের ঈদযাত্রায় প্রাণ হারিয়েছে ২৬ মার্চ সকাল পর্যন্ত ২৭৪ জন। আহত হয়েছে সহস্রাধিক। এই সংখ্যাগুলো পত্রিকার পাতায় ছাপা হয়, কিছুদিন আলোচনা হয়, তারপর ধীরে ধীরে বিস্মৃতির অতলে হারিয়ে যায়। কিন্তু যে পরিবারগুলো তাদের স্বজনকে হারিয়েছে, তাদের কাছে এই সংখ্যা কোনো পরিসংখ্যান নয়, এটি তাদের পুরো পৃথিবীটাকে উল্টে দেওয়ার গল্প।
তাহলে প্রশ্ন হলো, প্রতিবছর ঈদের সময় এই রক্তঝরা বাস্তবতার কেন পুনরাবৃত্তি হয়? উত্তরটা খুঁজতে গেলে দেখা যায়, এর পেছনে কোনো একক কারণ নেই। কারণগুলো স্তরে স্তরে জমা হয়ে থাকে, যেন পুরোনো ক্ষতের ওপর নতুন ক্ষত।
ঈদের সময় যাত্রীসংখ্যা হঠাৎ করেই কয়েক গুণ বেড়ে যায়, কিন্তু যানবাহনের সংখ্যা সেই অনুপাতে বাড়ে না। ফলে বাসে দাঁড়িয়ে যাত্রা করতে হয়, ট্রেনের ছাদে উঠতে হয়, লঞ্চে ধারণক্ষমতার দ্বিগুণ মানুষ উঠতে বাধ্য হয়। এই অতিরিক্ত চাপ যানবাহনের ভারসাম্য নষ্ট করে এবং বিপদের মাত্রা বাড়িয়ে তোলে। এর সঙ্গে যোগ হয় চালকের ক্লান্তি। টানা ১২ থেকে ১৬ ঘণ্টা গাড়ি চালানো কোনো মানুষের পক্ষে নিরাপদ নয়। ক্লান্ত চোখে সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় দেরি হয়, আর সেই কয়েক সেকেন্ডের দেরিই কখনো কখনো একটি জীবনের পরিসমাপ্তি টেনে দেয়।
রাস্তার দুরবস্থার কথাও অস্বীকার করার উপায় নেই। অনেক মহাসড়ক এখনো সরু, গর্তে ভরা, নির্মাণাধীন। এর ওপর দিয়ে দ্রুতগতিতে ভারবাহী যান চলাচল করলে দুর্ঘটনা ঘটবেই। ফিটনেসবিহীন গাড়ি ঈদের মৌসুমে রাস্তায় নামে অনায়াসে। কারণ, নজরদারি তখন আনুষ্ঠানিকতায় পরিণত হয়। ব্রেক কাজ করে না, টায়ার পুরোনো, ইঞ্জিনে গোলমাল—এই ধরনের গাড়ি মহাসড়কে চলা মানে চলন্ত বিপদ ডেকে আনা।
প্রশ্ন হলো, এত আলোচনা, এত সুপারিশ, প্রতিবছর কমিটি গঠন ও রিপোর্ট তৈরি হওয়ার পরেও কেন পরিস্থিতির কোনো দৃশ্যমান উন্নতি হয় না? উত্তরটা অস্বস্তিকর হলেও সত্যি যে সমস্যাটা কেবল অবকাঠামোগত নয়, এটা মনোভাবগত। যাত্রী চালককে চাপ দেন দ্রুত চালাতে, চালক ক্লান্ত থাকলেও থামেন না। কারণ, মালিকের চাপ আছে, মালিক ফিটনেসবিহীন গাড়ি নামান। কারণ, জবাবদিহির ভয় নেই, আর যাদের জবাবদিহি নিশ্চিত করার কথা, তারা অনেক সময় বাস্তবতার চেয়ে আশার বাণী শোনাতে বেশি আগ্রহী।
মোটরসাইকেল দুর্ঘটনার বিষয়টি এবার আলাদাভাবে উদ্বেগজনক। মোট দুর্ঘটনার প্রায় ৪০ শতাংশই মোটরসাইকেলসংক্রান্ত। তরুণ প্রজন্মের কাছে মোটরসাইকেল এখন স্বাধীনতার প্রতীক, কিন্তু হেলমেট না পরা, অতিরিক্ত গতি আর ট্রাফিক আইন না মানার সংস্কৃতি এই স্বাধীনতাকে মৃত্যুর ফাঁদে পরিণত করছে। পরিবারগুলো এই ঝুঁকি সম্পর্কে সচেতন থাকলে অনেক দুর্ঘটনা এড়ানো সম্ভব হতো।
- ট্যাগ:
- মতামত
- দুর্ঘটনায় নিহত
- ঈদযাত্রা