রাজস্ব আহরণে চাই পরিশীলিত সংস্কার

দেশ রূপান্তর মোহাম্মদ আবদুল মজিদ প্রকাশিত: ২৭ মার্চ ২০২৬, ০৯:৩৮

বাংলাদেশে বিদ্যমান কর সংস্কৃতি নিয়ে চিন্তাভাবনার যথেষ্ট অবকাশ রয়েছে। কেননা দেশের রাজস্ব আহরণ পরিস্থিতি প্রেক্ষাপটের কার্যকর উন্নতির জন্য চেষ্টা অব্যাহত আছে। এটি নিরন্তর প্রয়াসের দাবিদার। বাংলাদেশের ট্যাক্স জিডিপি অনুপাত এখনো কম। এটি একটি অসামঞ্জস্যপূর্ণ পরিস্থিতিও নির্দেশ করে। সম্প্রতি সমীক্ষায় দেখা গিয়েছে, বাংলাদেশের ধনীদের আরও ধনী হওয়ার মাত্রা দক্ষিণ এশিয়ায় অগ্রগামী, এমন কি চীনের চেয়েও। জিডিপি প্রবৃদ্ধি অগ্রসরমান (এবার ৭ অতিক্রম করবে বলে জানা যাচ্ছে) থাকলে রাজস্ব আহরণ বাড়ে না কেন, কম হয় কী করে? তার মানে রাজস্ব আহরণ প্রযোজ্য মতো হচ্ছে না। আহরিত রাজস্বের মধ্যে প্রত্যক্ষ কর-আয়করের অবস্থান এখনো দোটানায়। যারা অবৈধভাবে সম্পদের পাহাড় গড়ে তুলছেন, তারা তো করের আওতায় আসছেন না, উপরন্তু যারা কর দেয় তারা নানাভাবে এড়িয়ে যাচ্ছে, নানাভাবে কর রেয়াত পাচ্ছে। জাতীয় রাজস্ব বোর্ড আহরিত মোট রাজস্ব আয়ের ৩৬/৩৭ শতাংশ ভ্যাট, ৩৩/৩৪ শতাংশ আয়করের এবং ৩০/৩১ শতাংশ কাস্টম ডিউটি (সম্পূরকসহ আমদানি শুল্ক)। অথচ অর্থনীতির স্বতঃসিদ্ধ নিয়ম হচ্ছে, আয়কর হবে সর্বোচ্চ। অন্যগুলো থাকবে তারপর। যে অর্থনীতিতে কোটি কোটি টাকার পণ্য আমদানি হয়, সম্পদ ভোগ করতে পারে, ব্যাংকের পুঁজি পর্যন্ত লোপাট করে পাচার হচ্ছে তাদের কেন আয়করের আওতায় আনা যাচ্ছে না। যে অর্থনীতিতে পাবলিক সেক্টরেই বৃহৎ আয়-ব্যয় হয়, সেখানে রাজস্ব আহরণে জবাবদিহি নিশ্চিত করা যাচ্ছে না। সেক্টর করপোরেশনগুলোর কাছে এনবিআরের পাওনা অনাদায়ি থেকে যাচ্ছে। সরকারি বড় বড় প্রকল্প ও প্রতিষ্ঠানে আমদানি শুল্ক ও কর রেয়াত দেওয়ার বিষয়টি অস্পষ্টতার আাদলে আড়ালে থেকে যাচ্ছে। ট্যাক্স জিডিপি রেশিও ন্যায্য পর্যায়ে উন্নীত হতে হলে, রাজস্ব পরিশোধে সরকারি খাতের ভূমিকা পর্যালোচনার প্রশ্ন এসে যাবে।


স্বাধীনতার পর ৫৫ বছরে দেশ ৯২ বিলিয়ন ডলারের বেশি বিদেশি ঋণ এবং প্রায় ৪২ বিলিয়ন ডলার অনুদান গ্রহণ করা হয়েছে। আর অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে গৃহীত ঋণের পরিমাণ পাহাড় সমান। বিদেশি ঋণের আসলের বার্ষিক কিস্তির পরিমাণ প্রায় বিশ হাজার কোটি টাকা। দেশি-বিদেশি ঋণের বার্ষিক সুদ পরিশোধে বাজেটের প্রায় ২২ শতাংশই চলে যাচ্ছে। এ রকম একটি অর্থনীতিতে অভ্যন্তরীণ সম্পদ আহরণে খাতওয়ারি অসামঞ্জস্যতাকে স্বাভাবিক অবস্থায় আনতে উপযুক্ত উদ্যোগ গ্রহণের বিকল্প নেই। বলা বাহুল্য, অভ্যন্তরীণ সম্পদ আহরণ এক ধরনের নাজুক কাঠামোর কারণে রাজস্ব আহরণ কার্যকর অবস্থায় উন্নীত হতে পারছে না। অর্থনীতিতে আয়বৈষম্য বাড়ছে, অর্থ পাচারের সুযোগ ও কারণ সৃষ্টি হচ্ছে। সব সেক্টর থেকে যথাযথভাবে রাজস্ব আহরণের সুযোগ ও উপায় অবারিত হলে রাজস্ব আহরণ পরিস্থিতির উন্নয়ন হবে। রাজস্ব যথাযথভাবে আহরিত হলে ট্যাক্স জিডিপি অনুপাত বাড়বে এবং অসামঞ্জস্যতা দূর হবে। যে দেশের ১২ লক্ষাধিক লোক ক্রেডিট কার্ড ব্যবহার করতে পারে, এডিপিতে ব্যাপক অর্থব্যয়ে মেগা প্রকল্প বাস্তবায়িত হয়, মাসে শত শত গাড়ি আমদানি হয়, সেখানে এত কম রাজস্ব আহরিত হতে পারে না। এটা পুনঃপুন পর্যালোচনা করা আবশ্যক। দেশে বিদ্যমান রাজস্ব আহরণ আইন, এর কাঠামো এবং এর প্রয়োগ কৌশল সম্পর্কে, সর্বোপরি একটি কার্যকর কর সংস্কৃতি গড়ে তোলার ক্ষেত্রে দৃঢ়চিত্ত রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতিসহ সবার নিরপেক্ষ দৃষ্টিভঙ্গির বিষয়টিই আজ বিশেষভাবে বিবেচ্য হয়ে উঠছে। এটি এ কারণে যে, করদাতা আর কর আহরণকারীর মধ্যে সম্পর্কের টানাপড়েন যত বাড়বে, কর সংস্কৃতির বিকাশ তত বাধাগ্রস্ত হবে। কর রেয়াত বা অবকাশের রাজনৈতিক প্রয়োগ শুধু সাময়িক সমস্যার সৃষ্টি করবে না দীর্ঘমেয়াদে অপপ্রয়োগের পথ উন্মোচিত হবে। রাজস্ব আহরণ ব্যবস্থা যেখানে সামাজিক সুবিচার ব্যবস্থাপনায় রাষ্ট্র ও নাগরিকের মধ্যে পারস্পরিক-পরিপূরক দায়িত্ব পালনের বিষয়, ঔপনিবেশিক শাসনকাঠামোয় সংগতকারণেই যার যথার্থতা অনুসরণ ছিল অনুপস্থিত, আজকের বাংলাদেশ অতীতের ঔপনিবেশিক শাসনামলে যেভাবে ব্যবসা-বাণিজ্য বিনিয়োগ তথা আর্থ-সামাজিক রাজনৈতিক দিক দিয়ে বিপুল বৈষম্যমূলক আচরণের শিকার ছিল তা এখনো অব্যাহত থাকা সমীচীন হবে না। একটি স্বাধীন সার্বভৌম গণপ্রজাতন্ত্রী দেশের অর্থনীতি মুক্তবাজার অর্থনীতিতে অবগাহন করে আধুনিক হতে চাইলেও, সে দেশের আয়কর আইনের ভাষা ও দৃষ্টিভঙ্গি এখনো যেন ঔপনিবেশিক আমলের পারস্পরিক অবিশ্বাস, সংশয়, সন্দেহ, পক্ষপাতিত্ব এবং জটিলতার আবর্তে আইনের আষ্টেপৃষ্ঠে বাঁধা পড়ার ভীতিপ্রদ পরিস্থিতির পথ-পরিক্রমায়।


স্বেচ্ছায় করদানে সক্ষম করদাতাকে উদ্বুদ্ধকরণের ক্ষেত্রে স্বতঃস্ফূর্ততায় বাধা হয়ে দাঁড়ায়, নিরুৎসাহিতবোধের কারণ হয়ে দাঁড়ায় বিদ্যমান আইনের ভাষা ও দৃষ্টিভঙ্গি এবং সার্বিক সীমাবদ্ধতা। বাংলাদেশের বিদ্যমান শুল্ক ও করনীতি ছাড়াও এর নীতি প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন একই সংস্থার (জাতীয় রাজস্ব বোর্ড) ওপর আরোপিত থাকায় ওই নীতি যেমনি করে উত্তম নীতি থেকে ক্রমে সরে যাচ্ছে, অন্যদিকে প্রণীত নীতিভিত্তিক রাজস্ব ব্যবস্থাপনা ও প্রশাসনও ক্রমাগত অনুৎপাদনশীল, হয়রানিমূলক হয়ে উঠছে বলে অভিযোগ। এ নিরিখে উত্তম নীতি প্রণয়ন ও প্রণীত নীতি যথাযথভাবে বাস্তবায়নের স্বার্থে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের নীতি প্রণয়ন কাজকে বাস্তবায়ন ও প্রশাসন হতে আলাদা করা আবশ্যক বলে ব্যাপক সংখ্যক অংশীজন মনে করেন। বিনিয়োগের অন্যতম একটি শর্ত হচ্ছে স্থিতিশীল শুল্ক ও কর কাঠামো। বাংলাদেশে রাজস্বনীতি তথা শুল্ক ও করহার ঘন ঘন পরিবর্তন করা হয় মর্মে, দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীরা অভিযোগ করেন। এটি কর পরিপালন ও ব্যবসায় বিনিয়োগে ঋণাত্মক প্রভাব ফেলে। কাজেই মধ্য ও দীর্ঘ মেয়াদে স্থিতিশীল শুল্ক ও কর কাঠামো প্রতিষ্ঠার জন্য রাজস্ব বোর্ডের সংস্কার দরকার। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা অপর্যাপ্ত, খুবই কম। এ কারণে এটা যথাযথ রাজস্বনীতি প্রণয়ন, প্রণীত নীতির যথাযথ বাস্তবায়ন, স্বেচ্ছায় কর পরিপালনে উদ্বুদ্ধকরণ, কর লঙ্ঘনের ক্ষেত্র যথাসময়ে চিহ্নিতকরণপূর্বক যথাযথ প্রায়োগিক ব্যবস্থা (enforcement measures) গ্রহণ ইত্যাদিতে ব্যর্থ হচ্ছে। প্রাতিষ্ঠানিক এ অপর্যাপ্ত সক্ষমতার মূল কারণ হচ্ছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের কর ব্যবস্থাকে এখনো তথ্যপ্রযুক্তি দিয়ে কার্যকরও সমন্বিতভাবে অটোমেটেড করা হয়নি। কার্যকর ও সমন্বিত অটোমেশন না হওয়ায় তিনটি কর ব্যবস্থাই এখনো পরস্পর থেকে প্রায় সম্পূর্ণ আলাদা। ফলে কর ফাঁকি, যোগসাজশ, নির্বিচারে স্বেচ্ছা ক্ষমতা প্রয়োগ, হয়রানি, অনিয়ম ইত্যাদির ব্যাপক অভিযোগ আছে। তা ছাড়া এখানে করসেবার সংখ্যা ও মান সন্তোষজনক নয় বলে স্বেচ্ছায় কর পরিপালনে তা সহায়ক নয়। অধিকন্তু রাজস্বনীতি ও প্রণীত নীতির ব্যবস্থাপনায় করদাতার উত্থাপিত অভিযোগ ও সৃষ্ট বিরোধ যথাসময়ে নিষ্পত্তির বর্তমান ব্যবস্থাও যথাযথ নয় বলেও অভিযোগ আছে। যথোপযুক্ত রাজস্বনীতি প্রণয়ন ও তার যথাযথ বাস্তবায়ন দেশে অর্থনৈতিক সুশাসন প্রতিষ্ঠায় সবচেয়ে বেশি প্রভাব সৃষ্টিকারী বিবেচনায় আন্তর্জাতিক উত্তম চর্চার আলোকে ‘রাজস্বনীতি প্রণয়ন বিভাগ’ ও প্রণীত নীতি বাস্তবায়নার্থে বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠান হিসেবে সরকারের বিভাগ মর্যাদায় ‘রাজস্ব ব্যবস্থাপনায় জাতীয় রাজস্ব বোর্ড’ এ দুভাগে আলাদা করে পরস্পরের পরিপূরক হিসেবে কার্যকর সমন্বয়ে গঠন করা যৌক্তিক হবে বলে বিভিন্ন অংশীজনের দাবি এবং আইএমএফের শর্ত রয়েছে। অধ্যাদেশের মাধ্যমে গঠিত উল্লিখিত দুটো বিভাগের মধ্যে কার্যকর সমন্বয় কীভাবে হবে, রাজস্ব ব্যবস্থাপনা কার্যক্রম নবসৃষ্ট ‘রাজস্ব ব্যবস্থাপনা বিভাগ’ নাকি অন্যান্য দেশের ন্যায় শষায়িত প্রতিষ্ঠান হিসেবে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের মাধ্যমেই পরিচালনা করা হবে এবং নবসৃষ্ট উভয় বিভাগের নেতৃত্বে কে থাকবে ইত্যাদি বিষয়ে অভ্যন্তরীণ মতদ্বৈধতা থাকতেই পারে। এ ক্ষেত্রে কোনো গোষ্ঠী বা পক্ষের সংকীর্ণ দাবিদাওয়া শুনতে গিয়ে রাষ্ট্র জাতীয় (রেভিনিউ) স্বার্থকে অবশ্যই সবার ওপরে স্থান দেবে।

সম্পূর্ণ আর্টিকেলটি পড়ুন

প্রতিদিন ৩৫০০+ সংবাদ পড়ুন প্রিয়-তে

এই সম্পর্কিত

আরও