জুলাই গণ-অভ্যুত্থান ও মামলা বাণিজ্য

জাগো নিউজ ২৪ চিররঞ্জন সরকার প্রকাশিত: ১৯ মার্চ ২০২৬, ১২:৩৭

মামলা বাণিজ্য আমাদের দেশে একটি পরিচিত ব্যাপার। কখনও এটা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা করে, কখনও ক্ষমতাবান বা প্রভাবশালীরা করে। দেশের আলোচিত ২০২৪ সালের জুলাই-আন্দোলনের পরের সরকারের বিরুদ্ধেও এই মামলা বাণিজ্যের অভিযোগ উঠেছে। জুলাই গণঅভ্যুত্থান বাংলাদেশের সাম্প্রতিক ইতিহাসে এক গুরুত্বপূর্ণ মোড় পরিবর্তনের ঘটনা।


এ অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে একটি সরকার বিদায় নিয়েছে, নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতা তৈরি হয়েছে, এবং জনগণের প্রত্যাশা নতুনভাবে উত্থাপিত হয়েছে। কিন্তু যে পরিবর্তন ন্যায়বিচার, গণতন্ত্র ও আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার প্রত্যাশা জাগিয়ে তুলেছিল, সেই প্রত্যাশার একটি বড় অংশ আজ প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়ছে ‘মামলা-বাণিজ্য’ নামক এক ভয়াবহ প্রবণতার কারণে। গণঅভ্যুত্থানের পর দায়ের হওয়া অসংখ্য মামলার ভেতরে যে অনিয়ম, অপব্যবহার ও ব্যক্তিস্বার্থের ছাপ স্পষ্ট হয়ে উঠেছে, তা শুধু বিচারব্যবস্থাকেই নয়, রাষ্ট্রের নৈতিক ভিত্তিকেও চ্যালেঞ্জের মুখে দাঁড় করিয়েছে।


একটি জাতীয় দৈনিকের অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, কীভাবে জুলাই গণঅভ্যুত্থান-সংক্রান্ত মামলাগুলো কেন্দ্র করে দখল, প্রতিহিংসা, চাঁদাবাজি এবং ব্যক্তিগত স্বার্থ হাসিলের জন্য নিরীহ মানুষদের ‘ইচ্ছেমতো’ আসামি করা হচ্ছে। ব্যবসায়ী ইসমাইল হোসেন প্রধানীয়ার ঘটনা এর একটি জ্বলন্ত উদাহরণ। হাসপাতাল থেকে গ্রেফতার, একাধিক মামলায় জড়ানো, রাজনৈতিক পরিচয়জুড়ে দেওয়া—সব মিলিয়ে একটি সুপরিকল্পিত হয়রানির চিত্র ফুটে ওঠে। অথচ বাস্তবে তিনি কোনো রাজনৈতিক সংগঠনের সঙ্গেই যুক্ত ছিলেন না। একটি ঘটনার জন্য তিনটি মামলা দায়ের এবং প্রতিটিতে তাকে আসামি করা—এটি শুধু আইনি বিচ্যুতিই নয়, বরং আইনের অপব্যবহারের এক নির্মম উদাহরণ।


এই ধরনের ঘটনা বিচ্ছিন্ন নয়। অন্তত ১০০টি মামলার পর্যালোচনায় দেখা গেছে, শত শত মানুষকে ঢালাওভাবে আসামি করা হয়েছে, যাদের অনেকেই ঘটনার সঙ্গে কোনোভাবেই সম্পৃক্ত নন। ব্যক্তিগত শত্রুতা, ব্যবসায়িক বিরোধ, জমি দখল কিংবা চাঁদাবাজির উদ্দেশ্যে মানুষকে মামলায় জড়ানোর প্রবণতা ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। এমনকি মৃত ব্যক্তিকেও আসামি করার ঘটনা ঘটেছে, যা বিচারব্যবস্থার প্রতি এক ধরনের উপহাস বলেই প্রতীয়মান হয়।


সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, এই মামলাগুলোর একটি বড় অংশে বাদীরাও পরে স্বীকার করছেন যে, তারা অনেক আসামিকে চিনতেন না বা ভুলবশত নাম অন্তর্ভুক্ত করেছেন। প্রায় অর্ধশত মামলায় ছয় শতাধিক আসামির নাম বাদ দেওয়ার আবেদন আদালতে জমা পড়েছে। এর পেছনে অর্থ লেনদেনের অভিযোগও রয়েছে—২০ হাজার থেকে ৪ লাখ টাকা পর্যন্ত। অর্থাৎ, মামলা একটি ‘বাণিজ্যিক পণ্য’ হয়ে উঠেছে, যেখানে নির্দোষ মানুষকে ফাঁসিয়ে অর্থ আদায়ের সুযোগ তৈরি করা হচ্ছে।


এই পুরো প্রক্রিয়ায় একটি সংঘবদ্ধ চক্রের সম্পৃক্ততার অভিযোগ উঠেছে। রাজনৈতিক দলের কিছু নেতাকর্মী, অসাধু আইনজীবী, পুলিশের একটি অংশ এবং মধ্যস্বত্বভোগী চক্র—সব মিলিয়ে একটি ‘মামলা ইকোসিস্টেম’ গড়ে উঠেছে। গ্রেফতারের পর জামিন পেলেও অন্য মামলায় পুনরায় গ্রেফতার দেখানোর মাধ্যমে এই চক্র তাদের কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। ফলে একজন নিরপরাধ ব্যক্তি একবার মামলার ফাঁদে পড়লে তার জন্য মুক্তি পাওয়া প্রায় অসম্ভব হয়ে ওঠে।


এই পরিস্থিতি শুধু ব্যক্তিগত জীবনে বিপর্যয় ডেকে আনছে না, বরং সমাজে ন্যায়বিচারের ধারণাকেও ক্ষতিগ্রস্ত করছে। যারা প্রকৃত অপরাধী, তারা অনেক সময় আড়ালে থেকে যাচ্ছে, আর নিরীহ মানুষ হয়রানির শিকার হচ্ছে। এতে বিচারপ্রক্রিয়ার প্রতি সাধারণ মানুষের আস্থা কমে যাচ্ছে। শহীদদের স্বজনদের মধ্যেও এই নিয়ে ক্ষোভ ও হতাশা তৈরি হয়েছে। তারা আশঙ্কা করছেন, প্রকৃত অপরাধীরা শাস্তি এড়িয়ে যেতে পারে, যদি এভাবে মামলার অপব্যবহার চলতে থাকে।


রাষ্ট্রীয় পরিসংখ্যানও এই সংকটের গভীরতা নির্দেশ করে। জুলাই-সংশ্লিষ্ট মোট মামলা হয়েছে ১,৮৪১টি, যার মধ্যে ৭৯১টি হত্যা মামলা। কিন্তু অভিযোগপত্র দেওয়া হয়েছে খুবই সীমিত সংখ্যক মামলায়। বিপুল সংখ্যক মামলায় তদন্ত চলমান, এবং অনেক ক্ষেত্রে অন্তর্বর্তী প্রতিবেদনে দেখা যাচ্ছে যে, হাজার হাজার মানুষের বিরুদ্ধে কোনো সম্পৃক্ততা পাওয়া যায়নি। অর্থাৎ, শুরু থেকেই মামলাগুলোর একটি বড় অংশ ছিল দুর্বল বা উদ্দেশ্যমূলক।


অন্তর্বর্তী সরকারের সময় ঢাকঢোল পিটিয়ে বলা হয়েছিল—যাচাই ছাড়া গ্রেফতার করা হবে না, তদন্ত চলাকালে অন্তর্বর্তী প্রতিবেদন দেওয়ার সুযোগ তৈরি করা হবে ইত্যাদি। কিন্তু বাস্তবে এসব উদ্যোগ বাস্তবায়নের কোনো লক্ষ্মণ দেখা যায়নি। কারণ, সমস্যাটি কাঠামোগত এবং গভীরভাবে প্রোথিত। অন্তর্বর্তী সরকারের নিজস্ব রাজনৈতিক প্রতিহিংসা, আইন প্রয়োগকারী সংস্থার ভেতরে জবাবদিহির অভাব, রাজনৈতিক প্রভাব এবং বিচারব্যবস্থার দীর্ঘসূত্রতা—সব মিলিয়ে এই সমস্যা আরও জটিল হয়ে উঠেছে।


এই প্রেক্ষাপটে অন্তর্বর্তী সরকারের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একটি গণঅভ্যুত্থানের পর ক্ষমতায় আসা সরকারের প্রধান দায়িত্বই হলো আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করা এবং বিচারব্যবস্থাকে স্বচ্ছ, নিরপেক্ষ ও জবাবদিহিমূলক করা। কিন্তু যদি সেই সরকারের আমলেই মামলা-বাণিজ্য, হয়রানি ও অপব্যবহার চলতে থাকে, তবে তা জনগণের প্রত্যাশার সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতার শামিল হবে। কিন্তু অন্তর্বর্তী সরকার সেই বিশ্বাসঘাতকতার কাজটিই সূচারুভাবে করেছে।

সম্পূর্ণ আর্টিকেলটি পড়ুন

প্রতিদিন ৩৫০০+ সংবাদ পড়ুন প্রিয়-তে

আরও