ইরানের অভ্যন্তরীণ সমীকরণ: পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষা বনাম জাতীয় মর্যাদা

বিডি নিউজ ২৪ অধ্যাপক ড. খালিদুর রহমান প্রকাশিত: ১৯ মার্চ ২০২৬, ১২:৩৫

বর্তমান আন্তর্জাতিক রাজনীতির দিকে তাকালেই ইরানকে বোঝার পুরো ছবিটা স্পষ্ট হয় না। দেশটির সামাজিক মনস্তত্ত্ব, জাতীয় চেতনা এবং রাষ্ট্রীয় আচরণ বুঝতে হলে তার দীর্ঘ ইতিহাস, বিদেশি শক্তির সঙ্গে সংঘাতের অভিজ্ঞতা এবং আধুনিক রাজনৈতিক বাস্তবতাকে একসঙ্গে বিবেচনা করতে হয়। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ সামরিক আক্রমণকে কেন্দ্র করে যে আন্তর্জাতিক উত্তেজনা সৃষ্টি হয়েছে, তা আবারও এই বাস্তবতাকে সামনে এনেছে। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে শুরু হওয়া এই সংঘাত দ্রুত মধ্যপ্রাচ্যের অন্যতম বৃহত্তম সামরিক সংকটে রূপ নিয়েছে। বিমান হামলা, ক্ষেপণাস্ত্র আক্রমণ এবং ড্রোন ইতিমধ্যে হাজার হাজার লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হেনেছে এবং এই সংঘর্ষ আঞ্চলিক নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে অস্থির করে তুলেছে।


যুদ্ধের প্রথম দুই সপ্তাহেই ব্যাপক প্রাণহানি ও ধ্বংসযজ্ঞের খবর প্রকাশ পেয়েছে। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক প্রতিবেদন অনুসারে, ইরানে দেড় হাজারেরও বেশি মানুষ নিহত এবং প্রায ২০ হাজার আহত হয়েছে। নিহতদের মধ্যে নারী ও শিশুর সংখ্যা উল্লেখযোগ্য। অন্যদিকে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর ইরানের ছয়টি হাসপাতাল সরিয়ে নিতে হয়েছে এবং স্বাস্থ্য ব্যবস্থার ওপর তীব্র চাপ পড়েছে। তা সত্ত্বেও দেশটির স্বাস্থ্য বিভাগ এখনও কার্যক্রম চালিয়ে যেতে সক্ষম হয়েছে এবং ৭ হাজারের বেশি আহত ব্যক্তি চিকিৎসা পেয়েছে।


এই সংঘাতের সামরিক মাত্রাও বিশাল। মার্কিন সামরিক কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুসারে যুদ্ধের শুরুতেই পাঁচ হাজারের বেশি লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালানো হয়েছে। একইসঙ্গে ইরান পাল্টা আক্রমণ হিসেবে ইসরায়েল এবং মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে অবস্থিত মার্কিন ঘাঁটিগুলোতে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়েছে। ইরানের সামরিক বাহিনী দাবি করেছে তারা অন্তত ২৭টি মার্কিন ঘাঁটিকে লক্ষ্য করে আঘাত হেনেছে এবং মধ্যপ্রাচ্যের নয়টি দেশের সামরিক স্থাপনায় আক্রমণ করেছে। এই সংঘর্ষের ফলে আঞ্চলিক নিরাপত্তা পরিস্থিতি এতটাই উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে যে, জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদ জরুরি বৈঠক করতে বাধ্য হয়েছে এবং অনেক আন্তর্জাতিক সংস্থা যুদ্ধবিরতির আহ্বান জানিয়েছে।


তবে এই ভয়াবহ সামরিক সংঘাতের মধ্যেও আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের মনে একটি বড় প্রশ্ন উঁকি দিচ্ছে। হামলার প্রথম দিনেই সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি নিজ কার্যালয়ে নিহত হওয়া এবং এত বড় বহিঃশক্তির আক্রমণের মুখে পড়ার পরও কেন ইরানের বর্তমান শাসনব্যবস্থা ভেঙে পড়ল না? বরং অনেক পর্যবেক্ষকের মতে, যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর দেশটির ভেতরে জাতীয় ঐক্যের এক নতুন জোয়ার সৃষ্টি হয়েছে। এই রহস্যের জট খুলতে হলে ইরানের অভ্যন্তরীণ সামাজিক বাস্তবতা এবং তাদের ইতিহাসের গভীরে তাকাতে হবে।


আমার নিজস্ব অভিজ্ঞতাও এই প্রশ্নের উত্তরের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িয়ে আছে। উচ্চশিক্ষার জন্য যখন আমি বেলজিয়াম এবং মালয়েশিয়ায় ছিলাম, তখন অনেক ইরানি শিক্ষার্থীর সঙ্গে আমার মেলামেশার সুযোগ হয়েছে। তাদের জীবনযাপন, পোশাক-পরিচ্ছদ এবং সামাজিক আচরণ পর্যবেক্ষণ করে আমার মনে হয়েছে, তারা ব্যক্তিগত জীবনে বর্তমান শাসনব্যবস্থার কঠোর সামাজিক বিধিনিষেধের সঙ্গে পুরোপুরি একমত নন। বিশেষ করে প্রবাসে থাকা ইরানি তরুণদের মধ্যে অনেকেই ব্যক্তিগত ও সামাজিক জীবনে তুলনামূলক স্বাধীনতার প্রত্যাশী। তারা প্রায়ই এমন পোশাক পরিধান করেন কিংবা এমনভাবে নিজেদের মত প্রকাশ ও জীবনধারা অনুসরণ করেন, যা ইরানের ভেতরে প্রকাশ্যে সম্ভব হয়ে ওঠে না।


এই ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা থেকে প্রথমে মনে হতে পারে যে ইরানের জনগণের বড় অংশ বর্তমান শাসনব্যবস্থার সঙ্গে সংহতি রেখে জীবনযাপন করতে চায় না। বাস্তবে গত দুই দশকের রাজনৈতিক ঘটনাবলিও এই ধারণাকে আংশিকভাবে সমর্থন করে। উদাহরণস্বরূপ, ২০১৯ সালের জ্বালানি মূল্যবৃদ্ধি বিরোধী আন্দোলনের কথা বলা যায়। রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুসারে, ওই আন্দোলনে প্রায় দেড় হাজার মানুষ নিহত হয়েছে এবং হাজার হাজার মানুষকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল।


এরপর ২০২২ সালে মাশা আমিনির মৃত্যুকে কেন্দ্র করে দেশব্যাপী যে আন্দোলন শুরু হয়, তা আধুনিক ইরানের অন্যতম বৃহত্তম সামাজিক প্রতিবাদে পরিণত হয়। বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থার পরিসংখ্যান বলছে, ওই আন্দোলনে অন্তত ৪৬৯ জন নিহত হয়েছে এবং ১৪ হাজারের বেশি মানুষ গ্রেপ্তার হয়েছিল।


সাম্প্রতিক সময়ে, অর্থাৎ ২০২৫ এবং ২০২৬ সালের আন্দোলনগুলোতে সহিংস দমন-পীড়নের যে চিত্র উঠে এসেছে, তা বিভিন্ন মানবাধিকার প্রতিবেদনে আরও ভয়াবহ বলে উল্লেখ করা হয়েছে। কিছু পরিসংখ্যান অনুযায়ী, এই সময়ে নিহতের সংখ্যা ১০ হাজার পর্যন্ত হতে পারে; এছাড়া আটক করা হয়েছে অনেক মানুষকে। এই লাগাতার আন্দোলনগুলো স্পষ্ট করে দেয় যে, ইরানি সমাজে বিদ্যমান রাজনৈতিক অসন্তোষ এবং পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষা অত্যন্ত শক্তিশালী।


তবুও বর্তমান যুদ্ধ পরিস্থিতিতে এক ভিন্ন চিত্র দেখা যাচ্ছে। আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা বলছেন যে বাহ্যিক সামরিক আক্রমণ অনেক সময় অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বিভাজনকে সাময়িকভাবে মুছে দেয়। জাতীয় নিরাপত্তা ও সার্বভৌমত্বের প্রশ্ন সামনে এলে অনেকে নিজেদের রাজনৈতিক মতভেদকে পেছনে রেখে জাতীয় প্রতিরোধের পক্ষে দাঁড়ায়। এই প্রবণতা শুধু ইরানে নয়, বিশ্বের অনেক দেশের ইতিহাসেই দেখা গেছে।


ইরানের ক্ষেত্রে এই জাতীয়তাবাদী প্রবণতার ঐতিহাসিক ভিত্তি আরও সুগভীর। প্রায় পাঁচ থেকে ছয় হাজার বছরের সুদীর্ঘ ইতিহাসে ইরান অসংখ্যবার বিদেশি আক্রমণের সম্মুখীন হয়েছে। প্রাচীন পারস্য সাম্রাজ্যের যুগে গ্রিক সম্রাট আলেকজান্ডারের অভিযান থেকে শুরু করে মধ্যযুগের বিধ্বংসী মঙ্গোল আক্রমণ, কিংবা পরবর্তীকালে ইউরোপীয় শক্তিগুলোর রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ এবং আধুনিক যুগে আঞ্চলিক শক্তির সঙ্গে সংঘাত—এই ধারাবাহিক অভিজ্ঞতাই ইরানি জাতীয় চেতনার গভীরে এক বিশেষ ‘প্রতিরোধ মনস্তত্ত্ব’ তৈরি করেছে।

সম্পূর্ণ আর্টিকেলটি পড়ুন

প্রতিদিন ৩৫০০+ সংবাদ পড়ুন প্রিয়-তে

আরও