নারীর জীবনে ঈদ: উৎসবের আড়ালে এক নিরন্তর ত্যাগের গল্প
শৈশবের স্মৃতিগুলো কখনও কখনও খুব ছোট ছোট দৃশ্য দিয়ে তৈরি হয়। ঈদের কথা মনে পড়লে আমার চোখের সামনে ভেসে ওঠে নতুন জামা, সেমাইয়ের গন্ধ, সকালের নামাজ, আত্মীয়স্বজনের হাসিমুখ। কিন্তু সেই আনন্দের ভেতরেও একটি দৃশ্য ছিল সবসময় স্থির—আমার মা।
ঈদের আনন্দ শুরু হওয়ার অনেক আগেই মায়ের ব্যস্ততা শুরু হয়ে যেত। ঈদের প্রায় এক সপ্তাহ আগে থেকেই তিনি ঘর পরিষ্কার করতেন, পুরোনো জিনিস গুছিয়ে রাখতেন, আলমারি ঠিক করতেন, রান্নাঘরের তাক ধুয়ে দিতেন। তারপর শুরু হতো মসলা বাটা, সেমাই ভাজা, পোলাওয়ের চাল বেছে রাখা, অতিথিদের কথা ভেবে নানা আয়োজন। আমরা তখন শুধু অপেক্ষা করতাম—কখন ঈদ আসবে, কখন নতুন জামা পরবো, কখন সেমাই মিষ্টি খাবো।
কিন্তু আজ বড় হয়ে বুঝতে পারি, ঈদ আসার আগেই মায়ের ঈদ শেষ হয়ে যেত। আমাদের আনন্দের প্রস্তুতির ভেতরেই মায়ের ক্লান্তি জমে উঠত। আমরা নতুন জামা নিয়ে উচ্ছ্বসিত থাকতাম, আর মা ব্যস্ত থাকতেন সবার জামা ঠিক আছে কি না, কার কী লাগবে, কে কী খাবে—সেসব নিয়ে।
ঈদের দিন ভোরে আমরা ঘুম থেকে উঠতাম নতুন দিনের আনন্দে। অথচ মা তারও অনেক আগে উঠে যেতেন। রান্নাঘরের চুলা জ্বলে উঠত, হাঁড়িতে দুধ ফুটত, সেমাইয়ের সুগন্ধ ছড়িয়ে পড়ত ঘরময়। আমরা যখন আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নতুন পোশাক পরতাম, সাজগোছ করতাম, তখন মা রান্নাঘরে কাজে থাকতেন, গরম ভাত, মাংস, পোলাও, সেমাই—সব ঠিকঠাক মতো তৈরি করার ব্যস্ততায়।
ঈদের নামাজ শেষে আমরা যখন বন্ধুদের সঙ্গে ঘুরতে বের হতাম, আত্মীয়দের বাড়ি যেতাম, তখনও মা বাড়িতেই থাকতেন। অতিথি আসবে, আবার চা বানাতে হবে, আবার খাবার পরিবেশন করতে হবে, আবার থালা-বাসন ধুতে হবে। ঈদের আনন্দ যেন আমাদের জন্য ছিল একটি উৎসব, আর মায়ের জন্য ছিল একটি দীর্ঘ কর্মদিবস।
এ দৃশ্য শুধু আমার ঘরে নয়। আমাদের সমাজের প্রায় প্রতিটি ঘরেই এমন অনেক নারী আছেন—যিনি মা, যিনি বোন, যিনি স্ত্রী কিংবা কন্যা—যিনি ঈদের দিনেও সবচেয়ে বেশি ব্যস্ত মানুষটি।
আমরা ঈদকে বলি আনন্দের উৎসব। কিন্তু সেই আনন্দের ভিতটা তৈরি হয় নারীদের অদৃশ্য শ্রম দিয়ে। ঘরের প্রতিটি আয়োজন, প্রতিটি খাবার, প্রতিটি অতিথি আপ্যায়নের পেছনে থাকে তাদের অক্লান্ত পরিশ্রম। অথচ তাদের ক্লান্তি খুব কম মানুষই দেখে।
- ট্যাগ:
- মতামত
- ঈদ উদযাপন
- নারীর অবদান