প্রত্যাশার অভিবাসন : নির্বাচিত সরকারের প্রতিশ্রুতি ও বাস্তবায়ন
বাংলাদেশের প্রবাসী কর্মী বা অভিবাসী শ্রমিককে যতই রেমিট্যান্স যোদ্ধা আর দেশের অর্থনীতির চালিকা শক্তি বলা হোক না কেন, সামাজিক স্তর বিন্যাসে, নীতি নির্ধারণে এবং সংস্কারমুখী কার্যকরী পদক্ষেপে প্রবাসের এই খেটে খাওয়া নারী-পুরুষ যথাযথ গুরুত্ব পায় না।
শ্রম অভিবাসন খাতে আন্তঃমন্ত্রণালয় দায়িত্ব আছে, কিন্তু কার্যত দেখা যায় সিংহভাগ দায়িত্ব প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের ওপরেই ছেড়ে রাখা হয়েছে। আবার রাজস্ব বাজেটে এই মন্ত্রণালয়ের জন্য অর্থ বরাদ্দ যুগ যুগ ধরে অন্য মন্ত্রণালয়ের চেয়ে অনেক কম, সেই বরাদ্দও আবার সার্বিক ব্যয় হয় না।
যুগোপযোগী আইন ও নীতি কাঠামো আছে, কিন্তু তার বাস্তবায়ন খুব ধীর ও ক্ষীণ। অন্তর্বর্তী সরকারের আমলেও এসবের তেমন কোনো পরিবর্তন হয়নি। তবে বেশকিছু সংস্কার প্রস্তাব এই সময়ে একত্রে সন্নিবেশিত হয়েছে এবং প্রধান উপদেষ্টার কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। সেই প্রসঙ্গে করণীয় সম্পর্কে পরে বলছি।
মোদ্দা কথা হলো, শ্রম অভিবাসন খাতকে নিয়মতান্ত্রিক, আধুনিক, কার্যকরী, অধিকারভিত্তিক এবং অংশগ্রহণ/অংশীদার মূলক করতে কী করতে হবে, সরকারের ভেতরে ও বাইরে অনেকেই জানেন, কিন্তু হয়ে উঠছে না। নির্বাচনের মধ্য দিয়ে নতুন সরকার গঠনের সাথে সাথেই বিগত সময়ের মতো আবারও এই খাতের উন্নয়নের জন্য অনেকেই আশায় বুক বাঁধছি। শুধু কথায় নয়, কাজেই তার প্রমাণ মিলবে।
আশার কথা যে নতুন সরকার তাদের রাজনৈতিক দলের নির্বাচনী ইশতেহারে শ্রম অভিবাসন খাতে করণীয় নিয়ে বেশি কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। ইশতেহারের ২৪ ও ২৫ পৃষ্ঠায় ১৯টি পদক্ষেপ গ্রহণের কথা বলা আছে। ইশতেহারের পররাষ্ট্র নীতি ও শিক্ষা খাতসহ আরও কিছু খাত রয়েছে, যা শ্রম অভিবাসন সংস্কার ও অগ্রগতির সাথে সম্পর্কিত।
এভাবে বিস্তারিতভাবে নির্বাচনী ইশতেহারে শ্রম অভিবাসন সংক্রান্ত প্রতিশ্রুতি এবং প্রতিশ্রুতিদাতা রাজনৈতিক দল রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্বে—এই ঘটনা বাংলাদেশে বিরল। অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে শ্রম সংস্কার কমিশনের প্রস্তাবের অংশ হিসেবে শ্রম অভিবাসন খাতে সর্বজন প্রস্তাবিত এবং রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে গৃহীত সংস্কার প্রস্তাব—এই ঘটনাও বাংলাদেশে বিরল। সেই সংস্কার সুপারিশ নিয়েও সরকার কাজ করতে পারে। কাজেই বর্তমান সময়ে রাষ্ট্রীয়, রাজনৈতিক, সামাজিক ও প্রাতিষ্ঠানিকভাবে শ্রম অভিবাসন খাতে দীর্ঘদিনের প্রয়োজনীয়তা পূরণের একটি বড় প্রত্যাশা ও সুযোগ তৈরি হয়েছে।
শ্রম অভিবাসন খাতে সংস্কার সাধন, সমস্যার সমাধান ও জটিলতা নিরসনের জন্য স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি বাস্তবসম্মত কার্যপ্রণালী থাকা দরকার। সংশ্লিষ্টদের কাছে অধিকাংশ করণীয় সম্পর্কে ধারণা অনেক বছর ধরে বিদ্যমান, তবে কী প্রক্রিয়ায় সফল হওয়া যাবে, সে ব্যাপারে মত ও পথের পার্থক্য থাকা স্বাভাবিক।
অবশ্য অনেক সংস্কার আছে যা অন্য দেশে কার্যকরী ব্যবস্থা হিসেবে স্বীকৃত, কাজেই বাংলাদেশে কার্যকরী হওয়ার সম্ভাবনা খুব বেশি। এ ব্যাপারে সরকারের রাজনৈতিক দলের ইশতেহারে কী করতে হবে সেটি বলা আছে, কীভাবে করতে হবে সেটি অন্যান্য বিষয়ের মতোই ব্যাখ্যা করা নেই। সেই বাস্তবমুখী পদক্ষেপ ও পরিকল্পনার দায়িত্ব স্বাভাবিকভাবেই পড়বে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের সুনির্দিষ্ট অনুবিভাগের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ওপর। সেই পরিকল্পনা বাস্তবায়নও করবে সরকার।
যখন সেই বাস্তবায়ন সময়োচিত হবে এবং সরাসরি তার সুফল দৃশ্যমান/অনুভূত হবে, তখন রাজনৈতিক সদিচ্ছার বহিঃপ্রকাশে সরকারের প্রতি আস্থা বৃদ্ধি পাবে। আবার জটিল সমস্যার সরলীকরণ এবং সরল সমাধানমূলক বক্তব্য কার্যকরী পরিবর্তনের প্রতি আস্থা হ্রাস করাটা স্বাভাবিক।
সম্প্রতি প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের নবনিযুক্ত মাননীয় প্রতিমন্ত্রী সাংবাদিকদের সাথে বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়ে মতবিনিময় করেছেন। অতীতে এই মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন ব্যক্তিরা বেশিরভাগ সময় সাংবাদিকদের এড়িয়ে গেছেন। এখন যদি সাংবাদিক বান্ধব হতে পারেন, তাদের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার পাশাপাশি বিশ্বাসযোগ্যতা ও গ্রহণযোগ্যতাও বাড়বে।
তবে প্রতিমন্ত্রী আগামী তিন মাসের মধ্যে যে দুই–একটি বন্ধ শ্রমবাজার চালুর উদ্যোগ নেওয়ার কথা বলেছেন, কয়েকটি দেশের ক্ষেত্রে অভিবাসন ব্যয় নির্ধারণ করে তা কার্যকর করার প্রস্তুতির কথা বলেছেন এবং প্রতারণায় জড়িত রিক্রুটিং এজেন্সির নিবন্ধন স্থগিত করার কথা বলেছেন—এই তিনটির প্রত্যেকটি জটিল এবং কোনোটিই তিন থেকে ছয় মাসের মধ্যে সমাধানযোগ্য নয়।
- ট্যাগ:
- মতামত
- শ্রম অভিবাসন
- প্রতিশ্রুতি পূরণ