শিক্ষার হালচাল ও বিপন্ন মূল্যবোধ
শিক্ষার বর্তমান হালচাল নিয়ে নিজেদের মধ্যে আলোচনায় স্পষ্ট হয়ে ওঠে যে, বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থায় সমাজের আস্থা নেই। কিংবা বর্তমান শিক্ষা কার্যক্রম, প্রত্যাশা পূরণে ব্যর্থ হচ্ছে। লক্ষ করলে দেখা যাবে, শিক্ষার্থীর সংখ্যা দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। বাড়ছে পাসের হারও। ‘এ+’ এর ছড়াছড়ি। এই বাস্তবতায় আমাদের আত্মতুষ্টিতে থাকা উচিত। কিন্তু গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ দেখা যাবে, আসলে আমাদের মনে স্বস্তি নেই, মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ে শিক্ষার্থীদের কাঁধে পুস্তকের বিশাল বোঝা ও গলায় ‘এ+’ এর তকমা। বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি যুদ্ধে অবতীর্ণ হওয়া অধিকাংশ শিক্ষার্থীর ফলাফল প্রমাণ করে, মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ে তাদের পড়ালেখা প্রকৃত জ্ঞান অর্জনের তুলনায় নম্বর অর্জনেই অধিক পরিমাণে সীমাবদ্ধ। প্রশ্ন হলো, এই দায় কার?
এ জন্য কি শুধু শিক্ষার্থীরাই দায়ী? বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির সুযোগ পাওয়া (বিশেষ করে সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে) কিছুসংখ্যক ছাত্র যথাযথভাবে জ্ঞান অর্জনের সাধনায় ব্রত থাকলেও, অধিকাংশই যেন লক্ষ্যহীন, উদ্দেশ্যহীন ও কালক্ষেপণের জালে আটকা পড়ে। ছাত্ররাজনীতির ঐতিহ্যবাহী ধারা থেকে বিচ্যুত হয়ে সংকীর্ণ স্বার্থের তথাকথিত নামমাত্র ছাত্ররাজনীতির কবলে পড়ে অছাত্রসুলভ কর্মকা-ে জড়িয়ে পড়ে নিজের এবং দেশের ভবিষ্যৎকে অনিশ্চয়তার অন্ধকারে নিমজ্জিত করে। প্রশ্ন হলো এই দায় কার? মাধ্যমিক, উচ্চমাধ্যমিক ও বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে শিক্ষার্থীদের এই বেহাল অবস্থার জন্য দায় বহন করতে হবে সেই সব মানুষদের, যারা বিদ্যমান সমাজব্যবস্থায় অভিভাবকের ভূমিকায় রয়েছেন। এতে শিক্ষাব্যবস্থার নীতিনির্ধারক থেকে শুরু করে এই ব্যবস্থার বাস্তবায়নকারী সরকারি সংস্থা ও শিক্ষকম-লী সবার ওপরই দায় বর্তায়। জ্ঞানচর্চা উপযোগী কারিকুলাম ও সিলেবাস তৈরির ক্ষেত্রে নীতিনির্ধারকদের কাছে, বাংলাদেশের বিবদমান রাজনৈতিক মতাদর্শগত বিতর্ক কেন্দ্রীয় স্থান দখল করে নেয়। এর ফলে বিসর্জনে যায় জ্ঞানবান্ধব পাঠ্যসূচি। তাই প্রয়োজন একটি নীতিনির্র্ধারণী ব্যবস্থা, যা হবে জ্ঞানভিত্তিক।
আমলাতান্ত্রিক জটিলতা ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডে কর্মরত অধিকাংশ অদক্ষ কর্মকর্তার দায়িত্বহীনতার জন্য, পাঠ্যপুস্তকে নানা প্রকার ভুলভ্রান্তি পরিলক্ষিত হয়। তাই প্রয়োজন আমলাতান্ত্রিক জটিলতামুক্ত দক্ষ জনশক্তি নিয়োগ, প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা গ্রহণ এবং তাদের দায়িত্বশীল করে তোলা।