নতুন গভর্নরের নিয়োগ নিয়ে এত হইচই কেন

প্রথম আলো বিরূপাক্ষ পাল প্রকাশিত: ০১ মার্চ ২০২৬, ২১:৪৫

যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল রিজার্ভের চেয়ারম্যান ড. অ্যালান গ্রিনস্প্যানের বিদায়ী সংবর্ধনায় ২০০৬ সালে তৎকালীন প্রেসিডেন্ট জর্জ বুশ রসিকতা করে বলেছিলেন যে গ্রিনস্প্যান নাকি একজন ‘রকস্টার’–এর সমতুল্য জনপ্রিয়তা অর্জন করেছিলেন। গ্রিনস্প্যান ১৯৮৭ থেকে ২০০৬ পর্যন্ত ফেডারেল রিজার্ভের চেয়ারম্যান ছিলেন। বর্তমানে বাংলাদেশ ব্যাংকের নতুন গভর্নর নিয়োগ পেতে না পেতেই একজন রকস্টারের মতোই আলোচনায় চলে এসেছেন। এই খ্যাতি গ্রিনস্প্যান অর্জন করেছিলেন ১৮ বছর স্বাধীন ও বুদ্ধিদীপ্ত নীতিনির্ধারণী সেবা প্রদান করার পর। অন্যদিকে বাংলাদেশের গভর্নর কোনো কাজ শুরু করার আগেই ব্যাপক আলোচনায় চলে এসেছেন।


সেদিন ছিল ২৫ ফেব্রুয়ারি। দিনটি শুরু হয়েছিল অন্যান্য দিনের মতোই, কিন্তু শেষ হয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ইতিহাসে এক স্মরণীয় দিন হিসেবে। বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ গভর্নর আহসান এইচ মনসুরের নিয়োগ আকস্মিকভাবে বাতিল করে অর্থ মন্ত্রণালয় একই দিনে কিঞ্চিৎ অশ্রুত এক নাম মো. মোস্তাকুর রহমানকে নতুন গভর্নর হিসেবে নিয়োগ দেয়।


জনাব রহমান শিক্ষাগতভাবে একজন হিসাববিদ এবং পেশায় একজন পোশাকশিল্পের ব্যবসায়ী। হিসাববিদ ও ব্যবসায়ী—এমন পরিচয় ধরলে দেশে কমপক্ষে হাজারখানেক মানুষ পাওয়া যাবে, যাঁরা প্রচার ও প্রসারে নতুন গভর্নরের চেয়ে কম যান না। কিন্তু এই সবকিছু ছাপিয়ে মোস্তাকুর রহমানের বড় পরিচয় তিনি বিএনপির নির্বাচন পরিচালনা কমিটির একজন কার্যকর সদস্য ছিলেন। লোকে বলাবলি করছে যে সেই পরিচয়ই তাঁকে গভর্নর বানানোর ক্ষেত্রে কোরামিন দিয়েছে।


বিএনপি একটা ভূমিধস জয় নিয়ে ক্ষমতায় এসেছে। এই সরকারি দল তাদের গভর্নর নিয়োগের ব্যাপারে বিএনপি–ভাবাপন্ন মানুষকে খুঁজবে—এতে আশ্চর্য হওয়ার কী-ই বা আছে? কিন্তু প্রশ্ন উঠছে যে এই দলে কি অর্থনীতিবিদের বড়ই আকাল পড়ে গেল। নেই কি তাদের কোনো ব্যাংকিং, ফাইন্যান্স বা পাবলিক পলিসি বিশেষজ্ঞ? যদি বিএনপি হতো এক নবজাত দল, তাহলে নাহয় মেনে নেওয়া যেত।


প্রায় অর্ধশতাব্দী বয়সের একটি দলে বিবেচনার এই দৈন্য কেন? আসলে এটি গুণীশূন্যতার দৈন্য নয়। এটি সরকারি দলের সুচিন্তিত এক পদক্ষেপ। তবে সরকারের এই কাজে চালাকি থাকলেও বিজ্ঞতা কম। এটি প্রচলিত অর্থসংস্কৃতির গড্ডলিকাপ্রবাহে বিএনপির প্রথম আত্মসমর্পণ। ২০১৮ সালের সন্ধ্যাকালীন নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে আওয়ামী লীগও একই রুচিতে একজন ব্যবসায়ীকে অর্থমন্ত্রী বানিয়েছিল। কিন্তু চালাকির ফল ভালো হয়নি। কাকতালীয়ভাবে তিনিও ছিলেন একজন তুখোড় হিসাববিদ।


বাংলাদেশে কোনো পদধারী মানুষকে সমালোচনা করলে তিনি তা ব্যক্তিগতভাবে নিয়ে থাকেন। এটি চিন্তার দীনতা। ব্যক্তি যখন রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ পদে আসীন হন, তখন তিনি আর ব্যক্তি থাকেন না। তাঁর প্রতিটি কর্মই সমালোচিত হওয়ার যোগ্যতা রাখে। নতুন গভর্নর বিষয়টিকে সেভাবে গ্রহণ করলে আলোচনাটি তাঁর জন্য শিক্ষণীয় হয়ে থাকবে। তিনি একজন ব্যবসায়ী, যা তাঁর জন্য এক বাড়তি অভিজ্ঞতা। অধিকাংশ গভর্নরেরই ব্যবসায়ের অভিজ্ঞতা থাকে না। কিন্তু তিনি ৮৬ কোটি টাকার একজন ঋণখেলাপিও বটে, যদিও গত ডিসেম্বরে নির্বাচনের আগে তিনি সেই ঋণের কিয়দংশ পরিশোধ করে ওটিকে ‘নিয়মিত’ ঋণে পরিণত করেছেন।


সংসদের অনেক সদস্য নির্বাচনের আগের সেই ‘সাধু হওয়ার মৌসুমে’ নিজেদের ‘নিয়মিত’ সাজিয়ে নিয়েছেন। তাহলে কি গভর্নর পদায়নে এই দাবার ছক আগেই সাজানো ছিল? সেটি অন্যায়ের কিছু না। কিন্তু সেটি আর্থিক দূরদর্শিতার পরিচয় দিল কি না—প্রশ্ন সেখানেই। প্রায় পাঁচ শ বছর আগে বৈষ্ণব শ্রীচৈতন্য বলেছিলেন, ‘আপনি আচরি ধর্ম জীবেরে শেখায়।’ নিজে আচরণ না করলে সে বিষয়ে হিতোপদেশ দেওয়া যায় না। নীতি নির্ধারণ করা আরও কঠিন হয়ে পড়ে।


নতুন গভর্নর খেলাপি ঋণের বিরুদ্ধে কীভাবে শক্ত অবস্থান নেবেন—সেটি তাঁর জন্য যত বেশি দুশ্চিন্তার, বিএনপি সরকারের জন্য সেটি তত বেশি দুর্ভাবনার বিষয়। শতকরা ৪০ ভাগ খেলাপি ঋণের বোঝা নিয়ে অর্থনীতি এগোতে পারবে না। এটি এশিয়ার সর্বোচ্চ সংখ্যা এবং বিশ্বের বুকে অন্যতম ঝুঁকিপূর্ণ মাত্রা, যা যেকোনো সময় পুরো ব্যাংকিং ব্যবস্থাকে ধসিয়ে দিতে পারে। এটির বিরুদ্ধে রীতিমতো যুদ্ধ ঘোষণা না করলে বিএনপিও শেষ পর্যন্ত আরেক শ্রেণির দরবেশ-সমৃদ্ধ দলে পরিণত হবে। বাকি পরিণতির কথা এহেন শুভক্ষণে নাই–বা বললাম।

সম্পূর্ণ আর্টিকেলটি পড়ুন

প্রতিদিন ৩৫০০+ সংবাদ পড়ুন প্রিয়-তে

আরও