অগ্নিঝরা মার্চ: বাঙালির স্বপ্ন ও স্বাধীনতার মহাকাব্য
মার্চ বাঙালির জীবনে এক অনন্য মাস। ঐতিহাসিক গুরুত্ব বিবেচনায় মার্চের প্রতিটি দিনই অত্যন্ত ঘটনাবহুল ও তাৎপর্যময়। রাজনৈতিক দলসহ বিভিন্ন সংগঠন মাসজুড়েই নানা কর্মসূচি পালন করে। তৎকালীন রেসকোর্স ময়দানে ৭ মার্চ বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ভাষণ, ২৫ মার্চ পাকিস্তানি জান্তারা সার্চলাইট অপারেশন চালিয়ে নির্বিচারে বাঙালি নিধন, বঙ্গবন্ধুকে গ্রেফতার করে পশ্চিম পাকিস্তানে নিয়ে যাওয়া, গ্রেফতার হওয়ার আগে বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতা ঘোষণা, সর্বোপরি মুক্তিকামী জনতা একটি স্বাধীন-সার্বভৌম দেশের জন্য আনুষ্ঠানিক রক্তক্ষয়ী সশস্ত্র সংগ্রাম শুরু করে এই মার্চ থেকেই।
৭ মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণেই বঙ্গবন্ধু যার হাতে যা আছে, তা-ই নিয়ে প্রস্তুত থাকতে বললেন। ‘আমি যদি হুকুম দেবার না ও পারি’ বলে তিনি আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে ঘরে ঘরে দুর্গ গড়ে তোলার আহ্বান জানালেন। এই দুর্গ গড়ে তোলার অর্থ যে সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধের প্রস্তুতি নেওয়ার নির্দেশনা তা বুঝতে কারও বাকি রইল না। শত্রুর মোকাবিলা করার দৃপ্ত আহ্বানও ভেসে উঠল তার বজ্রকণ্ঠে। প্রয়োজনে খাজনা-ট্যাক্স বন্ধ করে দেওয়ার কথাও বললেন তিনি। ১৯৭০ সালের নির্বাচনে যে ম্যান্ডেট তিনি পেয়েছিলেন বস্তুত সেই ম্যান্ডেটই তাকে প্রচণ্ড আত্মবিশ্বাসী করে তুলেছিল।
এভাবেই ঘনিয়ে আসে ২৫ মার্চের কালরাত্রী। পাকিস্তানি জান্তারা ভারী অস্ত্র, কামান নিয়ে অপারেশন সার্চলাইটের নামে এ দেশের ছাত্র-জনতাসহ নিরীহ বাঙালির ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে নির্মম হত্যাযজ্ঞে মেতে ওঠে। তারা রাজারবাগ পুলিশ লাইনসেও হামলা চালায়। সেই রাতেই বঙ্গবন্ধুকে গ্রেফতার করে পাকিস্তানে নিয়ে যাওয়া হয়। গ্রেফতার হওয়ার আগে ২৬ মার্চ প্রত্যুষে বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেন। সেই ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গে গর্জে ওঠে গোটা জাতি। যার হাতে যা আছে তা-ই নিয়ে শত্রুর মোকাবিলা করার জন্য ঘর থেকে বেরিয়ে যায় এ দেশের মুক্তিপাগল মানুষ। শুরু হয় ৯ মাসের রক্তক্ষয়ী সশস্ত্র স্বাধীনতাসংগ্রাম। অতঃপর এক সাগর রক্তের বিনিময়ে কাঙ্ক্ষিত স্বাধীনতা লাভ। অবসান হয় ২৩ বছরের বৈষম্য আর বঞ্চনার। একটি স্বাধীন-সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশ পৃথিবীর মানচিত্রে জায়গা করে নেয়।
দুই.
বাঙালির ইতিহাসে মার্চ কেবল ক্যালেন্ডারের একটি পাতা নয়; এটি একটি জাতির জেগে ওঠার, শিকল ভাঙার এবং আত্মপরিচয় প্রতিষ্ঠার মহাকাব্য। ১৯৭১ সালের এই মার্চ মাসেই রচিত হয়েছিল একটি স্বাধীন ভূখণ্ডের মানচিত্র। পহেলা মার্চ থেকে শুরু করে ছাব্বিশের প্রথম প্রহর পর্যন্ত প্রতিটি দিন ছিল একেকটি অগ্নিস্ফুলিঙ্গ, যা শেষ পর্যন্ত স্বাধীনতার দাবানল হয়ে জ্বলে উঠেছিল।
অগ্নিঝরা মার্চের সূচনা হয় ১ মার্চ, যখন তৎকালীন পাকিস্তানি স্বৈরশাসক ইয়াহিয়া খান আকস্মিকভাবে জাতীয় পরিষদের নির্ধারিত অধিবেশন স্থগিত ঘোষণা করেন । এই একতরফা সিদ্ধান্ত বাংলার মানুষকে রাস্তায় নামিয়ে আনে। স্লোগান ওঠে— "বীর বাঙালি অস্ত্র ধর, বাংলাদেশ স্বাধীন কর" । ২ মার্চ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রথম উড়ানো হয় মানচিত্র খচিত বাংলাদেশের জাতীয় পতাকা, যা ছিল পরাধীনতার শৃঙ্খল ভাঙার প্রথম দৃশ্যমান ঘোষণা ।
মার্চের ইতিহাসের সবচেয়ে উজ্জ্বল দিনটি ছিল ৭ মার্চ। রেসকোর্স ময়দানে লাখ লাখ মানুষের জনসমুদ্রে দাঁড়িয়ে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তাঁর অমর তর্জনী হেলনে ঘোষণা করেন— "এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম"। সেই আঠারো মিনিটের ভাষণ ছিল কার্যত বাংলাদেশের অলিখিত স্বাধীনতার ঘোষণা, যা একটি নিরস্ত্র জাতিকে সশস্ত্র যোদ্ধায় রূপান্তরিত করেছিল।
- ট্যাগ:
- মতামত
- একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ