ইরানে মার্কিন-ইসরায়েল হামলা: ভূরাজনীতির সাপলুডো খেলা

বিডি নিউজ ২৪ ড. মঞ্জুরে খোদা প্রকাশিত: ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ২৩:১৫

ইরানের সঙ্গে আমেরিকার সম্পর্ক দীর্ঘদিন ধরেই বেশ উত্তেজনাকর ও বৈরী। একে অন্যের বিরুদ্ধে চূড়ান্ত পর্যায়ের হুমকি-পাল্টা হুমকি দিয়েই যাচ্ছিল। আশঙ্কা ছিল যেকোনো সময় আক্রমণ ও পাল্টা আক্রমণের ঘটনা ঘটবে। অবশেষে তাই ঘটল। গত সপ্তাহেই হোয়াইট হাউসের এক দায়িত্বশীল কর্মকর্তাকে সাংবাদিক জিজ্ঞেস করেছিলেন, ইরানে কি সহসা কোনো হামলার ঘটনা ঘটতে যাচ্ছে? তিনি বলেছিলেন, “এই বিষয়টি একমাত্র মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পই জানেন; তিনি যখন যেটা মনে করবেন, সেটা করবেনই।” তার সেই কথারই যেন প্রতিফলন ঘটল শনিবার সকালে, যখন ইরানে হামলা চালাতে শুরু করে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র। ঝাঁকে ঝাঁকে ক্ষেপণাস্ত্র ইরানের প্রধান শহরগুলোর ওপর বিকট শব্দে ক্রমাগত আঘাত করতে থাকল। সংবাদে জানা গেল যে, ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আলী খামেনির বাসভবনেও চারটি জেট বিমান নিয়ে হামলা করা হয়েছে।


কেন এই হামলা? এটা কি অনিবার্য ছিল? কোনোভাবেই কি এই যুদ্ধ এড়ানো যেত না?


এই প্রসঙ্গে ক’দিন আগে ইরানকে দেওয়া শর্তের বিষয়টি উল্লেখ করে আন্তর্জাতিক সম্পর্কের পর্যবেক্ষক ও গবেষক এবং ব্রিটিশ চ্যাথাম হাউসের পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী ব্রোনওয়েন ম্যান্ডোক্স বলেন, ডনাল্ড ট্রাম্প ইরানকে চুক্তির ক্ষেত্রে যে শর্তগুলো দিয়েছেন তা অত্যন্ত ধূর্ত ও মজার। কারণ এগুলো ইরানের পক্ষে মানা সম্ভব হতো না। বিশেষ করে ব্যালিস্টিক মিসাইল সক্ষমতা ধ্বংস করে দেওয়ার দাবি তেহরান কখনো মানবে না। আর এই ঘটনাই ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রকে ইরানে হামলার পথ সুগম করে দেয়।


ইরানের সঙ্গে আমেরিকার বোঝাপড়া বা অনাক্রমণ নিয়ে এতদিন যে যে শর্ত নিয়ে দেনদরবার চলছিল–সেগুলো হচ্ছে: ১. ইরান তার সমৃদ্ধ করা ৪০০ কেজি ইউরেনিয়াম তৃতীয় কোনো দেশে সরিয়ে ফেলবে। ২. তাদের পারমাণবিক অবকাঠামো ধ্বংস করবে। ৩. ব্যালিস্টিক মিসাইল সক্ষমতা ধ্বংস করবে। ৪. মিসাইল কর্মসূচি স্থগিত করবে। ৫. সিরিয়া, ইয়েমেন, ইরাক ও লেবাননের সশস্ত্র মিত্রদের সহায়তা বন্ধ করবে।


গত বৃহস্পতিবার জেনিভায় ওমানের মধ্যস্থতায় দুই দেশের মধ্যে পরোক্ষ আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়েছে। ওমান তখন জানিয়েছিল, আলোচনায় ‘উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি’ হয়েছে এবং খুব দ্রুতই পরবর্তী বৈঠক হবে। ইরানও এই আলোচনাকে ইতিবাচক হিসেবে অভিহিত করেছিল। তবে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে কোনো আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি সেই সময়। মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স ওয়াশিংটন পোস্টকে জানিয়েছিল, “আমরা কূটনৈতিক সমাধান পছন্দ করি, তবে সবকিছু নির্ভর করছে ইরানের পদক্ষেপের ওপর।” তার মানে আমেরিকা লুডোর ঘুঁটিটা ঠেলে ইরানের হাতে দিল, যাতে ছোবল দেওয়ার একটা বৈধ অজুহাত তৈরি করা যায়।


মার্কিন সামরিক হামলার সিদ্ধান্ত স্পষ্ট হয়ে যায় যখন যুক্তরাজ্য তেহরান দূতাবাস থেকে তাদের কর্মীদের সরিয়ে নিতে বলে। ইসরায়েলে নিযুক্ত মার্কিন দূতাবাস জরুরি নয় এমন কর্মী ও তাদের পরিবারকে দেশত্যাগের নির্দেশ দেয়। লেবাননের বৈরুত দূতাবাস থেকেও জরুরি নয় এমন সব কর্মীকে সরিয়ে নেয় ওয়াশিংটন। চীন, ভারত ও কানাডাসহ বেশ কয়েকটি দেশ তাদের নাগরিকদের অতিদ্রুত ইরান ছাড়ার পরামর্শ দেয়। বিশ্বের অন্যান্য দেশও এই পথ অনুসরণ করে।


২০০৩ সালে ইরাক আক্রমণের পর এবারই মধ্যপ্রাচ্যে সবচেয়ে বেশি সামরিক উপস্থিতি বাড়িয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। ১৯ ফেব্রুয়ারি ট্রাম্প বলেছিলেন, আগামী ১০ দিনের মধ্যেই বিশ্ব জানতে পারবে চুক্তি হচ্ছে নাকি সামরিক পদক্ষেপ। সেই হিসেবে ২৮ ফেব্রুয়ারি হচ্ছে তার ঘোষিত ‘ডেডলাইন’—হয় চুক্তি, নয় সামরিক পদক্ষেপ।


ইরান-আমেরিকার উত্তেজনার পারদ ওপরে ওঠে গত বছর ডিসেম্বরের শেষে। মার্কিন ও পশ্চিমা শক্তির দীর্ঘ বাণিজ্যিক অবরোধ, আঞ্চলিক মিত্রশক্তিগুলোর অস্ত্র ও অর্থের জোগান, জাতীয় নিরাপত্তা ও সামরিক সক্ষমতা বাড়াতে বাড়তি বরাদ্দ, নজিরবিহীন মূল্যস্ফীতি, বেকারত্ব ও আর্থিক সংকটের কারণে ইরানে ব্যাপক বিক্ষোভের সূত্রপাত হয়। যেখানে যুক্ত হয় দেশের ব্যবসায়ী, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীসহ সর্বস্তরের মানুষ। নতুন বছরে সেই আন্দোলন ব্যাপকতা পায় এবং সহিংস রূপ নেয়। রাষ্ট্রীয় দমন-পীড়নে হাজার হাজার বিক্ষোভকারীকে হত্যা করা হয়।


এই সময় ট্রাম্প একাধিকবার ইরানের নেতাদের হুমকি দিয়েছিলেন এই বলে যে—হত্যা বন্ধ করতে হবে এবং মানবাধিকার লঙ্ঘন করা যাবে না। সেটা না করা হলে তিনি তখনও সামরিক পদক্ষেপের কথা বলেছিলেন। ইরানের শাসকও ট্রাম্পের ওই বক্তব্যের সমালোচনা করে বলেছিলেন, তাদের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে বিদেশি শক্তির হস্তক্ষেপ ও নাক গলানোকে তারা সমর্থন করেন না।


সামাজিক অসন্তোষ থেকে ইরানের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক সংকট ভয়াবহ রূপ ধারণ করেছে। সেই পরিস্থিতি আমেরিকা ও ইসরায়েলকে সুযোগ করে দিয়েছে তাদের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ করার। অন্যদিকে ইরানের বিক্ষোভকারীরাও বিদেশি শক্তির হস্তক্ষেপের জন্য প্রকাশ্যে অনুরোধ ও আহ্বান জানায়। শুধু দেশের ভেতরেই নয়, আমেরিকা, কানাডা, ইউরোপসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে লাখ লাখ প্রবাসী ইরানিও এই আহ্বান জানান। তাদের অনেকেই ৪৭ বছর আগে ক্ষমতাচ্যুত রেজা শাহ পাহলভির পক্ষে স্লোগান দিয়েছেন এবং তার ছবি ও তাদের পূর্বের ঐতিহ্যবাহী পতাকা প্রদর্শন করেছেন।


২০০২ সালে জর্জ বুশ ইরাকের বিরুদ্ধে তার যুদ্ধের পক্ষে যুক্তি দিয়ে বলেছিলেন, সাদ্দাম হোসেনের শাসনব্যবস্থা যেকোনো দিন রাসায়নিক অস্ত্র ব্যবহার করে যুক্তরাষ্ট্রে হামলা চালাতে পারে। তিনি দাবি করেছিলেন, ইরাক পারমাণবিক অস্ত্র অর্জনের চেষ্টা করছে এবং এক বছরেরও কম সময়ের মধ্যে সেই বোমা তৈরি করতে পারে। এই সতর্কবার্তা যদি যথেষ্ট ভয়ের উদ্রেক না করে, তাহলে এক অজানা পারমাণবিক হামলার চূড়ান্ত আতঙ্কের মধ্যে থাকতে হবে আমাদের।

সম্পূর্ণ আর্টিকেলটি পড়ুন

প্রতিদিন ৩৫০০+ সংবাদ পড়ুন প্রিয়-তে

আরও