হাসপাতালে সাজানো রোগী, রাজনীতির অসুখ ও আস্থার সংকট
চট্টগ্রামের আনোয়ারা উপজেলায় সম্প্রতি ঘটে যাওয়া একটি ঘটনা আমাদের স্বাস্থ্যব্যবস্থা, রাজনৈতিক সংস্কৃতি এবং নৈতিকতার মান নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তুলে ধরেছে। স্থানীয় সংসদ সদস্য সরওয়ার জামাল নিজামের হাসপাতাল পরিদর্শনের খবর ছড়িয়ে পড়তেই আনোয়ারা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে হঠাৎ ২৩ জন ‘রোগী’ ভর্তি হন এবং পরিদর্শন শেষ হওয়ামাত্রই দ্রুত হাসপাতাল ত্যাগ করেন।
অনেকে এই ঘটনাকে সামান্য রাজনৈতিক ‘ম্যানেজমেন্ট’ বলে উড়িয়ে দিতে চাইবেন। কিন্তু বাস্তবে এ ঘটনা রাষ্ট্র পরিচালনার নৈতিক ভিত্তিকে নাড়িয়ে দেওয়ার মতো গুরুতর। হাসপাতাল এমন এক স্থান যেখানে কৃত্রিম উপস্থিতি নয়, শুধু প্রকৃত অসুস্থতার ভিত্তিতেই ভর্তি হওয়া উচিত।
যদি সত্যিই সংসদ সদস্যের সফরকে ঘিরে হাসপাতালকে ‘ব্যস্ত ও সেবামুখর’ দেখানোর জন্য ব্যান্ডেজ-মোড়ানো মানুষদের হঠাৎ ভর্তি করানো হয়ে থাকে, তাহলে এটি শুধু অনৈতিক নয়, জনগণের সঙ্গে সরাসরি প্রতারণা। জনগণের টাকায় চলা প্রতিষ্ঠানে ভুয়া চিত্র তৈরি করা মানে জনগণের বিশ্বাসের সঙ্গে ছলচাতুরি করা। এটি প্রশাসনিক সততা, চিকিৎসা নীতি এবং গণতান্ত্রিক রাজনীতির জন্য চরম লজ্জাকর।
আরও উদ্বেগজনক বিষয় হলো, আগে থেকে ভর্তি প্রকৃত রোগীদের অভিযোগ যে, তাদেরকে নির্ধারিত শয্যা থেকে সরিয়ে এই নতুন ‘রোগীদের’ জায়গা দেওয়া হয়েছিল। এই অভিযোগের সামান্যতম অংশও যদি সত্য হয়, তবে তা মানবিকতার চরম অবক্ষয়ের প্রমাণ। অসুস্থ মানুষকে শয্যা থেকে তাড়িয়ে রাজনৈতিক প্রদর্শনীর জন্য কৃত্রিম ভিড় তৈরি করার চেয়ে নিষ্ঠুর আর কী হতে পারে?
রাজনীতিতে প্রদর্শনবাদ নতুন কিছু নয়। অতীতে বিভিন্ন সময়ে দেখা গেছে, কোনো উচ্চপর্যায়ের সফরের আগে রাস্তাঘাটে তড়িঘড়ি করে রঙের প্রলেপ দেওয়া হয়, অসম্পূর্ণ কাজকে সাময়িকভাবে ঢেকে রাখা হয়, এমনকি কখনো কখনো দরিদ্র মানুষদের সাময়িকভাবে আড়ালে সরিয়ে রাখা হয়। কিন্তু হাসপাতালের মতো সংবেদনশীল স্থানে এমন নাটক মঞ্চস্থ করা অন্য সকল কিছুকে ছাড়িয়ে গেছে। কারণ এখানে জড়িয়ে আছে মানুষের জীবন, স্বাস্থ্য ও মর্যাদা।
এ ধরনের প্রবণতাকে যদি দলীয় বা প্রশাসনিকভাবে ‘স্বাভাবিক’ হিসেবে গ্রহণ করা হয়, তবে তা রাষ্ট্রের জন্য ভয়াবহ সংকেত। কারণ, তখন এটি কেবল বিচ্ছিন্ন কোনো অনিয়ম থাকে না, বরং একটি নেতিবাচক রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে পরিণত হয়। দীর্ঘ সময় পর যখন কোনো দল গণতন্ত্র ও ন্যায়ের প্রতিশ্রুতি দিয়ে ক্ষমতায় আসে, তখন জনগণের প্রত্যাশা কেবল উন্নয়নের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না; তারা সুশাসন ও আইনের শাসনের প্রতিফলন দেখতে চায়। প্রতিশ্রুতি আর বাস্তবতার এই দূরত্ব যত বাড়বে, গণতন্ত্র ততটাই দুর্বল হবে।