নির্বাচনে বিএনপির সাফল্য যেভাবে মধ্যপন্থার বিজয়
বাংলাদেশের বেশির ভাগ মানুষ যে উগ্রপন্থাকে পছন্দ করে না, তা আবারও প্রমাণিত হলো ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে। এই নির্বাচনে দল হিসেবে বিএনপি জয়ী হয়েছে; কিন্তু কোন পন্থা জয়ী হয়েছে, এই প্রশ্নে উত্তর হবে একটাই, সেটি হলো মধ্যপন্থা নিরঙ্কুশভাবে জয়ী হয়েছে।
বাংলাদেশে নিবন্ধিত রাজনৈতিক দল ৬০টি। এই দলগুলোর রাজনৈতিক অবস্থান কেমন, তা পাওয়া যায় গত জানুয়ারিতে ব্র্যাক ইনস্টিটিউট অব গভর্ন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (বিআইজিডি) ‘গণতন্ত্রের ক্ষয়, সংস্কার এবং পুনর্নির্মাণ’ শিরোনামের একটি গবেষণা নিবন্ধে। এতে বলা হয়, ১৯৯১ সালে বিএনপি মধ্যডানপন্থী ও আওয়ামী লীগ মধ্যবামপন্থী ছিল। জামায়াতকে তারা উল্লেখ করেছে ডানপন্থী হিসেবে।
১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগের অবস্থানকে বিআইজিডির প্রতিবেদনে মধ্যপন্থী হিসেবে দেখানো হয়। বাকিদের অবস্থান ১৯৯১ সালের মতোই ছিল। প্রতিবেদনে ২০০১, ২০০৮ ও পরবর্তী সময়ে বিএনপিকে মধ্যডানপন্থী, আওয়ামী লীগকে মধ্যপন্থী এবং জামায়াতকে ডানপন্থী শ্রেণিতে রাখা হয়। আওয়ামী লীগ সরকার অবশ্য ২০১৪ সালের পর স্বৈরতন্ত্রে রূপ নেয়।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট জুলাই গণ–অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতন হয়। ২০২৫ সালের ১২ মে আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ করা হয়। দলটি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নিতে পারেনি। ১২ ফেব্রুয়ারি বৃহস্পতিবার অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নিয়েছে ৫০টি দল। ভোটের আগে বিআইজিডির প্রতিবেদনে বিএনপিকে মধ্যডানপন্থী, জামায়াতকে ডানপন্থী, এনসিপিকে মধ্যপন্থী হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। ফলাফলে দেখা যায়, বিএনপি একাই পেয়েছে ২০৯টি আসন। তাদের মিত্র ও তাদের স্বতন্ত্র প্রার্থী মিলিয়ে আসনসংখ্যা দাঁড়িয়েছে ২২১। অন্যদিকে জামায়াতের নেতৃত্বাধীন ১১ দল পেয়েছে ৭৭টি আসন। এর মধ্যে জামায়াতের আসন ৬৮টি এবং এনসিপি পেয়েছে ৬টি।
উগ্রপন্থা বনাম মধ্যপন্থা
বাংলাদেশে ডানপন্থী ও বামপন্থীদের রাষ্ট্রক্ষমতায় আসার মতো অবস্থানে আসতে কখনো দেখা যায়নি। ১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধের পর বাংলাদেশে মধ্যবামপন্থী রাজনৈতিক দল ছিল একটি—আওয়ামী লীগ। মধ্যডানপন্থী দল সে অর্থে ছিল না। ফলে ১৯৭৩ সালের নির্বাচনে ৩০০টির মধ্যে ২৯৩টি আসন আওয়ামী লীগ জিতে যায়। ভোট পায় ৭৩ শতাংশ। বামপন্থী দল জাসদ পায় ১টি আসন। তারা ভোট পায় ৬ দশমিক ৫২ শতাংশ। মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্ব দেওয়া দল আওয়ামী লীগের বিপুল বিজয় অনুমিতই ছিল। এরপরও নির্বাচনটি নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়েছিল।
বাংলাদেশে কোনো মধ্যডানপন্থী দল ছিল না। সেই ঘাটতি পূরণ হয় মুক্তিযুদ্ধের জেড ফোর্সের কমান্ডার জিয়াউর রহমানের হাত ধরে। ১৯৭৮ সালে জিয়াউর রহমান বিএনপি প্রতিষ্ঠা করেন। শুরুতে তাঁর দলে যোগ দেয় মূলত ডান, বাম ও মধ্যপন্থীদের একাংশ। তাঁদের মধ্যে ডানপন্থী শাহ আজিজুর রহমান ও আবদুল আলীমরা যেমন ছিলেন; তেমনি ছিলেন বামপন্থী মশিউর রহমান যাদু মিয়ার মতো লোকেরাও।
প্রয়াত বিএনপি নেতা মওদুদ আহমদ তাঁর গণতন্ত্র ও উন্নয়নের চ্যালেঞ্জ নামের বইয়ে লিখেছেন, জিয়াউর রহমান তিনটি গোষ্ঠী থেকে সমর্থন লাভ করেছিলেন, ১. মুক্তিযোদ্ধা ও স্বাধীনতার পক্ষের শক্তি; ২. উগ্র ডানপন্থী ও স্বাধীনতাবিরোধী শক্তি এবং ৩. পিকিংপন্থী সাবেক বাম শক্তি।