নির্বাচনের সমীকরণ এবং ভিন্ন কণ্ঠের ভবিষ্যৎ
প্রায় আড়াই কোটি তরুণ ভোটার ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রথমবারের মতো ভোটাধিকার প্রয়োগ করবে। দীর্ঘদিনের প্রশ্নবিদ্ধ নির্বাচনি অভিজ্ঞতার পর অনেকে এই নির্বাচনকে রাজনৈতিক পুনর্গঠনের একটি গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণ হিসেবে দেখছেন। কিন্তু নির্বাচনি উত্তেজনার পাশাপাশি সমাজের একটি বড় অংশ গভীর অনিশ্চয়তা ও উদ্বেগের মধ্যে রয়েছে। এ লেখা যখন লিখছি, এখানে-ওখানে ভোট নিয়ে নৈরাজ্যের খবর আসতে শুরু করেছে। তাই রাত পোহালে যে ভোট শুরু হওয়ার কথা, তা কেমন হবে, বলা কঠিন।
ধর্মীয় ও জাতিগত সংখ্যালঘু, উদারপন্থী, অসাম্প্রদায়িক এবং দল-নিরপেক্ষ নাগরিকদের একটি বড় অংশ এখনো ঠিক করতে পারছেন না—কোন রাজনৈতিক শক্তি তাদের নিরাপত্তা ও নাগরিক মর্যাদার নিশ্চয়তা দিতে সক্ষম হবে। নিশ্চয়ই ভোট দিতে যাবেন বলে যারা মন্যস্ত করে রেখেছিলেন, সকালে হয়তো তারা নতুন কোনো সিদ্ধান্ত নেবেন।
গণঅভ্যুত্থানের দেড় বছর পেরিয়ে গেলেও এখনো এমন কোনো সুসংগঠিত, নীতিনিষ্ঠ ও বিশ্বাসযোগ্য বিকল্প শক্তি গড়ে ওঠেনি, যা তাদের আস্থার কেন্দ্রবিন্দু হতে পারে। ফলে তাদের সামনে বাস্তবিক বিকল্প দাঁড়িয়েছে মাত্র দুটি: তুলনামূলকভাবে কম ঝুঁকিপূর্ণ কোনো পক্ষকে বেছে নেওয়া অথবা কৌশলগত নীরবতা অবলম্বন করে ভোটদান থেকে দূরে থাকা। কারণ এই ভোটের ফলাফল তাদের ব্যক্তিগত জীবন ও সামাজিক নিরাপত্তার সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত।
২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থান ছিল দীর্ঘদিনের দমন, অপশাসন ও ক্ষোভের এক ঐতিহাসিক বিস্ফোরণ। দমনমূলক শাসন, ভোটাধিকার ও বাকস্বাধীনতা হরণ, ভিন্নমত দমনের কারণে রাজনীতি থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়া সর্বস্তরের মানুষ ছাত্রদের নেতৃত্বে, শ্রমজীবী জনগণের সাহসে এবং নাগরিক সমাজের সক্রিয় সমর্থনে রাস্তায় নেমেছিল। ওই জনস্রোতে সংখ্যালঘু ও প্রগতিশীল নাগরিকদের উপস্থিতি নৈতিকভাবে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ছিল।
তাদের মূল চাওয়া ছিল এটাই, রাষ্ট্র যেন সত্যিকার অর্থে বিশ্বাসযোগ্য হয়, আইন যেন পরিচয়ের ঊর্ধ্বে গিয়ে সবার জন্য সমানভাবে প্রযোজ্য হয়। তারা এমন একটি রাষ্ট্রের সঙ্গে সামাজিক চুক্তি কামনা করেছিলেন, যেখানে প্রত্যেক নাগরিক নিরাপত্তা পাবেন এবং প্রাপ্য মর্যাদা লাভ করবেন। তারা ভেবেছিলেন রাষ্ট্র যদি সত্যিই আইন, নিরাপত্তা ও ন্যায়বিচারের ভিত্তিতে চলে, তাহলে দীর্ঘদিনের অবিশ্বাস দূর হয়ে একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক রাজনৈতিক পরিসর গড়ে উঠবে। কিন্তু রাজনৈতিক পরিবর্তনের পরবর্তী পর্যায়ে ওই প্রত্যাশা কাঠামোগত রূপ নিতে পারেনি।
- ট্যাগ:
- মতামত
- জাতীয় সংসদ নির্বাচন