ভাষার রাজনীতি ও গণতন্ত্রের ভবিষ্যৎ
নাগরিক সমাজে অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ একটি স্বীকৃত ও অপরিহার্য অধিকার। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, এই অধিকার ব্যবহার করেই মানুষ শোষণ, নিপীড়ন ও বৈষম্যের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছে এবং বহু ক্ষেত্রে কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন অর্জন করেছে। তবে প্রতিবাদের এই অধিকার কখনোই সীমাহীন নয়। এর একটি নৈতিক, সামাজিক ও রাজনৈতিক পরিসর রয়েছে। সেই পরিসর অতিক্রম করলেই প্রতিবাদ তার ন্যায্যতা হারাতে শুরু করে এবং অনেক সময় তা নতুন আরেকটি অন্যায়ের জন্ম দেয়। এই বাস্তবতা উপলব্ধি না করতে পারলে প্রতিবাদ যেমন অর্থহীন হয়ে ওঠে, তেমনি সমাজ ও রাষ্ট্রের জন্য তা হয়ে দাঁড়ায় দীর্ঘমেয়াদি সংকটের কারণ।
বিগত ফ্যাসিবাদী শাসনামলে চাকরিতে কোটা ব্যবস্থা নিয়ে সরকারের প্রধানের একটি বিরূপ ও দায়িত্বজ্ঞানহীন মন্তব্য দেশজুড়ে তীব্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করেছিল। শিক্ষিত তরুণ সমাজের একটি বড় অংশ এই মন্তব্যকে নিজেদের ভবিষ্যৎ, মর্যাদা ও অধিকার হরণের প্রকাশ হিসেবে দেখেছিল। প্রতিবাদ হওয়াই ছিল স্বাভাবিক। কিন্তু সেই প্রতিবাদের ভাষা ও রূপ যখন সীমা অতিক্রম করে, তখন তা আর ন্যায্য প্রতিবাদ থাকে না। একটি পক্ষ যখন নিজেদেরকেই প্রকাশ্যে ‘রাজাকার’ আখ্যা দিয়ে তা স্বীকৃতি হিসেবে উপস্থাপন করে, তখন সেই বক্তব্য প্রতিবাদী ভাষার চরম সীমায় পৌঁছে যায়। বাংলাদেশের ইতিহাসে ‘রাজাকার’ শব্দটি একটি নির্দিষ্ট অপরাধ, বিশ্বাসঘাতকতা ও মানবতাবিরোধী ভূমিকার প্রতীক। এই শব্দকে আত্মপরিচয়ের অংশ হিসেবে ব্যবহার করা কেবল রাজনৈতিক কৌশল নয়, বরং মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস, শহীদদের আত্মত্যাগ এবং জাতীয় চেতনাকে অবজ্ঞা করার শামিল। প্রতিবাদের নামে এমন ভাষা ব্যবহার সমাজকে বিভক্ত করে এবং নৈতিক অবস্থানকে দুর্বল করে দেয়।
৫ অগাস্ট পরবর্তী সময়ে এই প্রবণতা আরও স্পষ্টভাবে দৃশ্যমান হয়। যাদের একটি অংশ শুরুতে নিজেদের প্রতিবাদী শক্তি হিসেবে তুলে ধরেছিল, তারাই ধীরে ধীরে ভাষা ও সাংস্কৃতিক ব্যবহারে এমন কিছু পরিবর্তন আনতে থাকে, যা সাধারণ মানুষের মনে প্রশ্নের জন্ম দেয়। বিপ্লব শব্দের পরিবর্তে ‘ইনকিলাব’, ন্যায়বিচারের পরিবর্তে ‘ইনসাফ’ এবং মুক্তির পরিবর্তে ‘আজাদী’ ব্যবহারের প্রবণতা নিছক শব্দচয়নের বিষয় ছিল না। এই শব্দগুলোকে সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় পরিসরে প্রতিষ্ঠিত করার প্রচেষ্টা একটি গভীর রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক ইঙ্গিত বহন করছিল। ভাষা কোনো নিরপেক্ষ মাধ্যম নয়। ভাষার সঙ্গে জড়িয়ে থাকে ইতিহাস, সংস্কৃতি, মূল্যবোধ ও পরিচয়। যখন সচেতনভাবে কিছু শব্দ পরিহার করে অন্য শব্দ চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করা হয়, তখন তা কেবল ভাষাগত পরিবর্তন নয়, একটি ভিন্ন সাংস্কৃতিক ধারা প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টা হিসেবে প্রতীয়মান হয়।
বাংলা ভাষা বাংলাদেশের অস্তিত্বের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। ভাষা আন্দোলনের মধ্য দিয়ে যে জাতিসত্তার বিকাশ ঘটেছে, তা কেবল যোগাযোগের মাধ্যম হিসেবে বাংলাকে প্রতিষ্ঠা করেনি, বরং রাজনৈতিক অধিকার ও সাংস্কৃতিক স্বাতন্ত্র্যের প্রতীক হিসেবে ভাষাকে মর্যাদা দিয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে দাঁড়িয়ে যখন কেউ পরিকল্পিতভাবে বিদেশি শব্দ ও ধারণাকে প্রাধান্য দিতে চায়, তখন স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন ওঠে, তারা কোন সমাজ ও সংস্কৃতির প্রতিনিধিত্ব করতে চায়। এটি কি কেবল ব্যক্তিগত বিশ্বাসের বহিঃপ্রকাশ, নাকি দীর্ঘমেয়াদে সমাজের দিকনির্দেশ পাল্টে দেওয়ার একটি সুপরিকল্পি প্রচেষ্টা।
এই গোষ্ঠীর মধ্যেই আবার একটি অংশ ছিল যারা ৫ অগাস্টের আগপর্যন্ত প্রকাশ্য গণতান্ত্রিক সংগ্রামের পথ পরিহার করে কখনো সুপ্ত, কখনো গুপ্ত অবস্থানে থেকে কাজ করেছে। তারা রাজপথে আন্দোলন, প্রকাশ্য আলোচনা ও গণমানুষের সঙ্গে সংযোগের পরিবর্তে অদৃশ্য কাঠামোর ভেতরে নিজেদের কার্যক্রম পরিচালনা করেছে। ইতিহাস বলে, এ ধরনের গোপন রাজনীতি কখনোই গণতন্ত্রের জন্য শুভ নয়। কারণ গণতন্ত্রের মূল শক্তি হলো স্বচ্ছতা, অংশগ্রহণ এবং জনসমর্থন। এর বিপরীতে, একটি বৃহত্তর গণতান্ত্রিক দল দীর্ঘ সময় ধরে প্রকাশ্যে অবস্থান নিয়ে অন্যায় ও নিপীড়নের শিকার হয়েও তাদের আন্দোলন অব্যাহত রেখেছিল। তারা রাজপথে ছিল, মানুষের পাশে ছিল এবং রাষ্ট্রযন্ত্রের দমননীতি সত্ত্বেও গণতান্ত্রিক পন্থা থেকে সরে আসেনি।
এই দীর্ঘস্থায়ী নিপীড়ন, গ্রেপ্তার, মামলা, হামলা এবং রাজনৈতিক সংকোচনের ফলে জনমনে ধীরে ধীরে একটি গভীর ক্ষোভের সঞ্চার হয়। এই ক্ষোভ কোনো একদিনে তৈরি হয়নি। এটি বছরের পর বছর ধরে জমে ওঠা হতাশা, বঞ্চনা ও অবিচারের ফল। মানুষ যখন দেখে তাদের ভোটাধিকার খর্ব হচ্ছে, মত প্রকাশের স্বাধীনতা সংকুচিত হচ্ছে এবং রাষ্ট্রযন্ত্র একটি গোষ্ঠীর স্বার্থে ব্যবহৃত হচ্ছে, তখন ক্ষোভ অনিবার্য হয়ে ওঠে। এই পুঞ্জীভূত ক্ষোভকেই ব্যবহার করে জুলাই গণঅভ্যুত্থান সংঘটিত হয়। এটি কোনো হঠাৎ বিস্ফোরণ ছিল না, দীর্ঘদিনের সামাজিক ও রাজনৈতিক চাপে সৃষ্ট একটি স্বাভাবিক পরিণতি।
আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচন এই প্রেক্ষাপটে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এ নির্বাচন কেবল ক্ষমতা পরিবর্তনের প্রক্রিয়া নয়, একটি জাতীয় সিদ্ধান্তের মুহূর্ত। এই নির্বাচনের মধ্য দিয়ে নির্ধারিত হবে আমরা কোন পথে এগোতে চাই। আমরা কি এমন একটি রাষ্ট্র চাই যেখানে ভাষা ও সংস্কৃতির স্বাতন্ত্র্য রক্ষা পাবে, গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ শক্তিশালী হবে এবং প্রতিবাদ তার নৈতিক সীমার ভেতরে থাকবে। নাকি আমরা এমন একটি বাস্তবতার দিকে এগোবো, যেখানে আবেগী স্লোগান, বিদেশি সাংস্কৃতিক অনুকরণ এবং গোপন রাজনৈতিক তৎপরতা ধীরে ধীরে রাষ্ট্রের চরিত্র বদলে দেবে।
এই কারণেই এখন প্রয়োজন সুপরিকল্পিত ও দায়িত্বশীল মতামত প্রকাশের। ভোট দেওয়া কেবল একটি অধিকার নয়, এটি একটি দায়িত্বও। এই দায়িত্ব পালনের সময় আমাদের ভাবতে হবে দীর্ঘমেয়াদি প্রভাবের কথা। কোন রাজনৈতিক শক্তি আমাদের ভাষা, সংস্কৃতি ও ইতিহাসকে সম্মান করে এবং কোন শক্তি সেগুলোকে ব্যবহার করে ভিন্ন কোনো এজেন্ডা বাস্তবায়ন করতে চায়। কোন শক্তি গণতান্ত্রিক ধারাকে শক্তিশালী করে এবং কোন শক্তি তার সীমা অতিক্রম করে নতুন সংকট তৈরি করে।