একুশে পদক : কবি-সাহিত্যিকদের নামগন্ধও নেই
এবারের একুশে পদক বড় ধরনের প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। একদিকে কবি সাহিত্যিকদের নামগন্ধও নেই। আবার যাদেরকে পদক দেওয়া হয়েছে, তাদের কতজনকে সাধারণ চেনে, সে প্রশ্নও উঠেছে। তারা কোন কৃতিত্বে এবং ওই কৃতিত্বে কতটা স্বীকৃত, তা নিয়েও গুঞ্জন শোনা যাচ্ছে। ফলে পদক কারা দিচ্ছে, আর কারা পাচ্ছে, সে আলোচনা ভালোভাবেই শোনা যাচ্ছে।
২.
এবার যাদের একুশে পদক দেওয়া হয়েছে, তাদের তিন-চারজনকে চিনি আমি। আমি জানি, এ পদক পেতে হলে উপদেষ্টা/মন্ত্রীর কাছে নিজের পদক পাওয়ার যোগ্যতাগুলো সবিনয়ে জানাতে হয়। এ কাজটিকে আমি অপমানজনক মনে করি। যিনি এ রেওয়াজ চালু করেছিলেন, তার চারপাশে যারা বুদ্ধির খড়্গ নিয়ে দাঁড়িয়েছিলেন, তারা কেউই এ দেশের জন্মইতিহাসের আসল শরিক নন। তাই অবলীলায় দরখাস্ত করে পদক নেওয়ার রেওয়াজ চালু করেছেন।
তার ও তাদের মনে কী ছিল, তা তো বোঝার উপায় নেই। তবে, এটুকু বুঝি, আত্মমর্যাদাবোধ যে তার ছিল না, তা হলফ করে বলতে পারি। আমি জানি, একই প্রক্রিয়া স্বাধীনতা পদকেরও। দরখাস্ত দিয়ে নিজের গীত নিজেকেই গাইতে হবে। তা নাহলে পরজীবনতক অপেক্ষা করতে হবে। আমি কখনোই পদক নেওয়ার পদ্ধতি নিয়ে ভাবিনি। আজও ভাবতাম না, যদি না জনৈক সাংবাদিক ফেসবুকে লিখেছেন কোনো উপযুক্ত কবি-সাহিত্যিক পাওয়া যায়নি বলে, এবার একুশের পদক দেওয়া হয়নি। ধৃষ্টতার একটা সীমা আছে। এ উক্তি কবি সাহিত্যিকদের সঙ্গে বেয়াদবির শামিল।
এ কথার পর আমি মন্তব্য করেছি, আপনি আমাদের কবি, সাহিত্যিকদের রচিত কবিতা/প্রবন্ধ/গবেষণা ইত্যাদি পড়েছেন কিনা। কোনো প্রতিউত্তর মেলেনি। না, তিনি বা তারা পড়েননি। সাহিত্যের কোনো নামগন্ধও তারা জানেন বলে মনে হয় না।
এখন স্বস্তি পাচ্ছি না একুশের পদক প্রাপকদের তালিকা দেখে। নামগুলো লিখি, তাহলে তাদের চেনা যাবে।
সাংবাদিকতায় শফিক রেহমান, চলচ্চিত্রে ববিতা, সঙ্গীতে মরণোত্তর পদক পেলেন আইয়ুব বাচ্চু, চিত্রকলায় অধ্যাপক মোহাম্মদ আবদুস সাত্তার... এরা, স্বনামখ্যাত, তাদের ক্ষেত্রে। বাদবাকিদের নাম উল্লেখ না করাই শ্রেয়, কেন না, আমি যখন চিনি না, তখন আমজনতাও তাদের চেনেন না, ধরে নিতে পারি।
চেনা-জানার বিষয়টি খুবই স্থুল। রবীন্দ্রনাথকে ১৮ কোটি মানুষের দেশের কতজন চেনেন? কিংবা বিদ্রোহী কবি, জনগণের কবি, কাজী নজরুল ইসলামকে কতজন চেনেন? তিনি তো আমাদের জাতীয় কবিও। তারপরও এটা দ্বিধাহীনচিত্তে বলতে পারি, চার কোটি মানুষ তার নাম শুনে থাকতে পারেন, চেনা-জানা তো দূর কী বাৎ। তাতে কি তাদের প্রতিভার ঘাটতি আছে তা কেউ বলবেন? না বলবেন না। যারা অপরিচিত আমাদের কাছে, তারা তার অ্যারেনায় বিখ্যাত।
অর্থী ইসলাম নৃত্যকলায় কী এমন বিশেষত্ব যোগ করেছেন যে, তার জন্য তিনি একুশের পদক পেলেন? কিংবা নাট্যকলায় ইসলাম উদ্দিন পালাকার, স্থাপত্যে মেরিনা তাবাসসুম, ভাস্কর্যে তেজস হালদার জশ কী জশযোগ্যতা নির্মাণ করেছেন? সাইটেশনে পুরস্কার দাতারা যদি বলতেন, তাহলে এসব অবান্তর প্রশ্ন মনে জাগত না। কেবল একুশে পদক নয়, স্বাধীনতা পদকের প্রাপকদের সম্পর্কে বয়ান নির্মাণ করতে হবে। না করলে আমরা বলব, দাতারা যাকে তাকে ধরে এনে এই রাষ্ট্রীয় পদকে ভূষিত করেছেন। এটা যে দুর্নীতি, এটা যে রাষ্ট্রীয় চেতনার পরিপন্থি, এটা যে নেপুটেশন তার খেসারত দিতে হবে তাদের।
৩.
কেন এরকম প্রণোদনা চালু করা হয়েছিল, তার ব্যাখ্যাও করতে হবে আমাদের। না হলে তাকে অপচয় বলাই উচিত। যদিও আমাদের ঔচিত্যবোধের ঘাটতি আছে, কিন্তু তা স্বীকার করি না আমরা। সমাজ-সংসারে কোনটা যোগ্যতর, সেই বিবেচনা যদি নেতারা করতে না পারেন, তাহলে নেতৃত্ব থাকাটা অন্যায়। এসব অন্যায়ই আমরা দেখতে পাচ্ছি সর্বত্র, কম আর বেশি। যে বদনাম হলো একুশে পদক নিয়ে, তার জন্য পদক প্রাপকরা নন, দায়ী সেই আমলারা, যারা এ অপকর্ম করেছেন।
নিজেরা যে যোগ্য মানুষ খুঁজে বের করার যোগ্যতাও রাখেন না, বিসিএস পাশ করে চাকরি করা সহজ, কিন্তু একটি মননশীল রচনা সৃষ্টি করা দুরূহ। আমলাদের মধ্যে প্রজ্ঞাবান মানুষের অভাব আছে, তবে কিছু যোগ্য চিন্তকও আছেন, সেই সত্য আমরা জানি। ভালো লেখকও আছেন, কিন্তু তারা গণ্য হন না কেন? নানান তন্ত্রসাধক আমলাতন্ত্রকে বের করে আনতে হবে বাস্তবের রোদে ঝলসানো মানুষের পাশে। তাদের শিখতে হবে, উৎপাদক জনগণ কারা, সেই জ্ঞানই তাদের চেনাবে দেশের শিল্প-সাহিত্যের সৃষ্টি ও মননশীল মানুষদের। আমি জানি, তারা বলবেন আমরা তো শফিক রেহমানকে পুরস্কৃত করেছি।
আমি বলবো-তিনি পঁচিশ বছর আগে পেলে তা মানানসই হতো। ববিতার ব্যাপারেও ওই একই কথা আমার। তিনি কেন তার সৃষ্টিশীল জীবনের মধ্যভাগে একুশে/স্বাধীনতা পদক পেলেন না? আবার এই প্রশ্নও করছি যে, পদক দেওয়ার মতো কবি/সাহিত্যিক যারা পেলেন না, তারা যাদের পদক দিয়েছেন, তাদের পেলেন কী করে? একুশে/স্বাধীনতা পদক পাওয়ার মতো অসাধারণ যোগ্যলোক এ সমাজেই আছে, কেবল তাদের চিনিয়ে দেওয়ার জন্য যে পথ ও পদ্ধতি, তা নেই বলেই তারা অনালোকিত আজও। এটা আমাদের দুর্ভাগ্য। আমি অনেক ডাকসাইটে সচিবকে জানি, যারা অবসরে এসে বিড়ালে পরিণত হয়েছেন। তাদের কোনো লিটেরারি কীর্তি না থাকায়, কেউ তাদের পোছে না।