যে ৮ কারণে জামায়াতের উত্থান
হাসিনা সরকার পতনের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য এবং অপ্রত্যাশিত পরিণতিগুলোর একটি হলো গত ১৮ মাসে জামায়াতে ইসলামীর সমর্থন দ্রুত বেড়ে যাওয়া।
সাম্প্রতিক জরিপ অনুসারে, ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠেয় নির্বাচনে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেতে পারে—এমন আভাস পাওয়া যাচ্ছে। তবুও এই ইসলামপন্থী দলটির উত্থান এতটাই নাটকীয় যে, কিছু বিশ্লেষকের মত, জামায়াত-নেতৃত্বাধীন জোটও শেষ পর্যন্ত বিজয়ী হতে পারে।
এই পরিবর্তনের ব্যাপকতাকে কোনোভাবেই খাটো করে দেখা উচিত নয়। আওয়ামী লীগ সরকারের শেষ বছরগুলোতে জামায়াত এতটাই কোণঠাসা ও দমন-পীড়নের শিকার ছিল যে, দলটি কার্যত একটি রাজনৈতিক সংগঠন হিসেবে স্বাভাবিক কাজও করতে পারছিল না। তাদের অনেক শীর্ষ নেতা কারাবন্দি ছিলেন। দলটি কঠোর বিধিনিষেধের মধ্যে প্রায় গোপন অবস্থায় কার্যক্রম চালাতো।
ঐতিহাসিকভাবে জামায়াত কখনোই বড় গণনির্বাচনী শক্তি ছিল না। জেনারেল এরশাদের পতনের পর অনুষ্ঠিত একাধিক নির্বাচনে তাদের ভোটের হার কখনোই ১২ শতাংশ ছাড়ায়নি। সর্বোচ্চ অবস্থান ছিল একানব্বইয়ের নির্বাচনে।
আর ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীকে সমর্থনকারী গোষ্ঠীর সঙ্গে সংশ্লিষ্টতা এবং গুরুতর আন্তর্জাতিক অপরাধের অভিযোগে বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকেই জামায়াত কলঙ্কিত ছিল।
এই প্রেক্ষাপটে জামায়াতের বর্তমান গতি সত্যিই বিস্ময়কর। তাই দলটিকে সমর্থন করা উচিত—এমন ইঙ্গিত না দিয়ে, কিংবা তাদের যৌক্তিক সমালোচনা এড়িয়ে না গিয়েও প্রশ্ন ওঠে—তাদের দ্রুত উত্থানকে কীভাবে ব্যাখ্যা করা যায়?
সম্ভাব্য আটটি কারণ নিচে তুলে ধরা হলো (কোনো নির্দিষ্ট ক্রমে নয়):
মুক্তিযুদ্ধে অবস্থান ও দুর্বলতা
জামায়াত পুরোপুরি তাদের অতীত থেকে মুক্ত হতে পারেনি। এখনো মাঝে মঝে একাত্তরের ভূমিকা নিয়ে তাদের অবস্থান ব্যাখ্যা করতে হয় এবং প্রতিদ্বন্দ্বী দলগুলোও এই ইস্যু তোলে। তবু, এতে খুব একটা সন্দেহ নেই যে, মুক্তিযুদ্ধকালে জামায়াতের ভূমিকা আর রাজনৈতিকভাবে অযোগ্য করে দেওয়ার মতো বিষয় হিসেবে ভোটারদের একটি বড় অংশের কাছে বিবেচিত হচ্ছে না।
এই পরিবর্তনের পেছনে একাধিক কারণ থাকতে পারে। প্রথমত, একাত্তরের অপরাধে জড়িত থাকার অভিযোগে অভিযুক্ত জামায়াতের শীর্ষস্থানীয় নেতাদের অনেকেই আওয়ামী লীগের শাসনামলে দণ্ডিত ও মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত হয়েছেন। ফলে বর্তমান নেতৃত্বের সঙ্গে ওই ঘটনাগুলোর সরাসরি কোনো যোগসূত্র নেই।
দ্বিতীয়ত, আওয়ামী লীগের পতনের ফলে তাদের দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক বয়ানগুলো অনেকটাই স্তিমিত হয়ে গেছে, যার একটি ছিল বারবার জামায়াতের কথিত যুদ্ধাপরাধের ইতিহাস তুলে ধরা।
তৃতীয়ত, ক্রমবর্ধমান ও প্রভাবশালী হয়ে ওঠা তরুণ প্রজন্ম ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ থেকে এখন অনেকটাই দূরে, তাদের কাছে এটি বিমূর্ত ও কম প্রাসঙ্গিক। একইসঙ্গে এটি এই মুহূর্তে তাদের তাৎক্ষণিক রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক উদ্বেগের সঙ্গে কম সম্পর্কিত বলে মনে হচ্ছে।
বিএনপি-জামায়াতের সততার ভাবমূর্তিতে তুলনা
জামায়াতের জনপ্রিয়তা বৃদ্ধির সবচেয়ে বেশি আলোচিত ব্যাখ্যাগুলোর একটি হলো দুর্নীতি থেকে তাদের কথিত দূরত্ব। হাসিনা সরকার পতনের পর অনেক বাংলাদেশি আশা করেছিলেন তৃণমূল পর্যায়ে ক্ষমতাসীন দলের কর্মীদের নিয়মতান্ত্রিক চাঁদাবাজি ও টাকার বিনিময়ে ব্যবসা করতে দেওয়ার প্রক্রিয়া শেষ হবে।
কিন্তু ২০২৪ সালের আগস্টের পর দেখা গেল, আওয়ামী লীগ ক্যাডারদের নিয়ন্ত্রিত অনেক চাঁদাবাজির নেটওয়ার্ক দ্রুতই বিএনপি-সমর্থিত গোষ্ঠীর দখলে চলে গেছে। প্রকৃত পরিবর্তন প্রত্যাশী ভোটারদের কাছে এটি সেই ধারণাকে আরও শক্ত করেছে—বাস্তবে বিএনপি তার পূর্বসূরির চেয়ে খুব একটা আলাদা না।
তাদের চোখে জামায়াত এখনো আলাদা। তৃণমূল পর্যায়ে জামায়াত-নিয়ন্ত্রিত চাঁদাবাজি চক্র বা সংগঠিত দুর্নীতির ব্যাপক কোনো অভিযোগ শোনা যায় না।
পরিবর্তন প্রত্যাশী ভোটারদের মতে, এই পার্থক্যটি একটি গভীর কাঠামোগত ভিন্নতাকে তুলে ধরে। ক্ষমতায় গেলে আর্থিক সুবিধা পাওয়ার আশায় স্থানীয় অনেকে বিএনপিকে সমর্থন করেন।
বিপরীতে, জামায়াত কর্মীরা দল থেকে অর্থ নেওয়ার বদলে উল্টো দলকেই অর্থ দেন। তাদের রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা ব্যক্তিগত সম্পদ অর্জনের পথ হিসেবে দেখা হয় না। আর এই পার্থক্যটি হতাশ ভোটারদের একটি অংশের কাছে প্রবল সাড়া ফেলেছে।