রাজনীতিতে জড়ানোর কারণে জনগণ শিল্পীদের তালির বদলে গালি দিয়েছে: ববিতা
শুক্রবার সকাল। ফোনে কথা বলতেই বোঝা গেল, চলচ্চিত্রের বরেণ্য অভিনয়শিল্পী ফরিদা আক্তার ববিতা বেশ উৎফুল্ল। আগের দিনই সরকারি প্রজ্ঞাপনে জানা গেছে—চলচ্চিত্রে বিশেষ অবদানের জন্য তিনি একুশে পদকের জন্য মনোনীত হয়েছেন। অভিনন্দন জানালে তিনি কৃতজ্ঞতা জানান দেশ–বিদেশের ভক্তদের। দুপুরের আগেই পৌঁছাই গুলশান অ্যাভিনিউয়ে তাঁর বাসায়। একুশে পদকের মনোনয়ন, দীর্ঘ অভিনয়জীবন, পুরস্কারপ্রাপ্তির স্মৃতি এবং অভিনয় থেকে দূরে থাকা—সব প্রসঙ্গই আসে আলাপে। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন মনজুর কাদের।
অভিনন্দন আপা। গতকাল কখন খবরটা পেলেন?
ফরিদা আক্তার ববিতা : বৃহস্পতিবার বিকেলের দিকে চ্যানেল আই থেকে জানানো হয়, ‘আপনি একুশে পদক পাচ্ছেন।’ জানার পর খুবই ভালো লাগল। একুশের চেতনায় একুশে পদকপ্রাপ্তির ঘোষণা শুনে অভিভূত হয়েছি। একুশ আমার প্রাণ, আমার ভালোবাসা। ভক্ত-দর্শকের ভালোবাসায় আমি ববিতা হয়েছি, একটা পর্যায়ে পৌঁছেছি, তাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা। আমার বড় বোন সুচন্দা আর ছোট বোন চম্পাও খুশি। নিজে থেকে ছেলে অনিককে জানাতে চেয়েছি, অফিসের কাজে সে সিয়াটলে গেছে, তার সঙ্গে কথা হয়নি, টেক্সট করে রেখেছি।
এর আগে আপনি আটবার জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার, একবার আজীবন সম্মাননাসহ দেশে–দেশের বাইরে বেশ কয়েকটি পুরস্কার পেয়েছেন। জীবনের এই প্রান্তে দাঁড়িয়ে পেছন ফিরে তাকালে পুরস্কারগুলো স্মৃতি হয়ে থাকবে, না দায় হয়ে?
ফরিদা আক্তার ববিতা: (ড্রয়িংরুমের দেয়ালের দিকে যেখানে পুরস্কারগুলো সাজিয়ে রাখা, সেদিকে তাকিয়ে) প্রতিদিন আমি এদিকে তাকিয়ে তাকিয়ে দেখি, এগুলো তো অবশ্যই স্মৃতি হয়ে থাকবে। আসলে চরিত্র এবং পুরস্কার—দুটি মিলিয়েই তো আমি। চরিত্র মানুষের মনে জায়গা করে নিয়েছে বলেই একটা সময় সেটার রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি মিলেছে। একটা বাদ দিয়ে আরেকটা বললে তো ঠিক হবে না। এ–ও ঠিক, অনেক ছবিতে অভিনয়ের জন্য আমি কোনো পুরস্কার পাইনি, সেই ছবিগুলোও কিন্তু অনেক সুন্দর—যেমন শেখ নিয়ামত আলীর দহন। ছবিটা নিয়ে আমরা কার্লোভি ভেরি চলচ্চিত্র উৎসবে গিয়েছিলাম, প্রশংসিতও হয়েছে। যেসব ছবি রাষ্ট্রীয়ভাবে পুরস্কার পায়নি, তা অন্যান্য নামকরা সংগঠন থেকে পেয়েছে। একজন ববিতা চলচ্চিত্রজগতে এসেছি ১৩ বছর বয়সে। জহির রায়হান আমাকে নিয়ে এসেছেন। তখন আমাদের মধ্যে টাকাপয়সা প্রধান বিবেচ্য বিষয় ছিল না। প্রধান লক্ষ্য ছিল মনোযোগ দিয়ে কাজ করতে হবে—ওপরে উঠতে হবে, শিল্পের ক্ষুধা ছিল—এগুলো করতে পেরেছি বলেই তো দর্শক আমাকে সম্মান করেছে, নিঃস্বার্থ ভালোবাসা দিয়েছে। তাদের ভালোবাসা পেয়ে একজন ববিতা হয়েছি। সেসবের কারণেও এই পুরস্কার। শ্রদ্ধেয় জহির রায়হান সাহেব আমাকে চলচ্চিত্রের জগতে এনেছেন, তিনি না আনলে আমি এত দূর আসতে পারতাম না। তাই আমার একুশে পদক জহির রায়হানকে উৎসর্গ করছি।
১০ বছরের বেশি সময় ধরে আপনি অভিনয়ে নেই। বিরতিতে থাকলে শিল্পী কি হারিয়ে যান, নাকি ভেতরে-ভেতরে আরও পরিণত হন?
ফরিদা আক্তার ববিতা : শিল্পী কখনো হারিয়ে যান না, হারিয়ে যেতে পারেন না। শিল্পী পরিণত হন, শক্ত হন। বিরতির কারণে একটা ক্ষুধা থেকে যায়—হয়তো ভাবেন, আরও সুন্দর কোনো চরিত্র যদি পেতাম, তাহলে মন দিয়ে করতে পারতাম।
সারা দুনিয়াতেই শিল্পীরা রাজনীতিতে যুক্ত হন, এটা নিয়ে প্রচুর বিতর্কও হয়। আপনি কি মনে করেন, পেশায় সক্রিয় থাকা শিল্পীদের রাজনীতিতে জড়ানো উচিত?
ফরিদা আক্তার ববিতা : আমি মনে করি, শিল্পীদের একেবারেই রাজনীতিতে জড়ানো উচিত নয়। একজন শিল্পী যেভাবে কাজ করেছেন, যা তিনি হয়েছেন, পুরস্কার ও সম্মাননা পেয়েছেন—একটা সময় দেশের মানুষ তাঁদের অনেক অনেক ভালোবাসেন। আমি মনে করি, যেই মুহূর্তে শিল্পী রাজনীতিতে জড়ান সবকিছু জিরো হয়ে যায়। সম্ভবত আমি ভুলও হতে পারি। আমাদের এখানে অনেক শিল্পী রাজনীতিতে জড়িয়েছেন, আমি কখনো এসব পছন্দ করি না। পরবর্তী সময়ে দেখা গেছে, শিল্পীরা রাজনীতিতে জড়ানোর কারণে জনগণ তাঁদের তালির বদলে গালি দিয়েছে। আমি কেন জনগণের গালি খেতে যাব! সে জন্য আমি মনে করি শিল্পীদের রাজনীতিতে যাওয়া উচিত নয়।
শিল্পীরা কি নিজের কাজ নিয়ে নিরাপত্তাহীনতার কারণেই রাজনীতিতে জড়ান?
ফরিদা আক্তার ববিতা : মোটেও না। অনেক শিল্পী মনে করেন, রাজনীতিতে গেলে অনেক সুনাম হবে, অনেক নাম হবে—এটাই ভুল ধারণা। অর্থনৈতিকভাবে একটু উপকৃত হবে—এটাও ভুল। বরং এতে লোকে বদনাম করবে। শিল্পী সব সময় শিল্পী—সে রাজনীতি সচেতন হবে কিন্তু কেন সে রাজনীতি করবে? এটা আমার খুব অপছন্দ। যে যা–ই বলুক, আমার একটাই কথা—শিল্পীরা কখনোই রাজনীতিতে যাবে না। এই যে দেখেন—রিয়াজ, ফেরদৌসসহ আরও কে কে তো শিল্পী হিসেবে ভালোই ছিল। কেন ওরা রাজনীতিতে গেল! রিয়াজ এখন পালিয়ে বেড়াচ্ছে কেন! রাজনীতি এমন একটা জায়গা, এখানে কাল কী হবে, তা কেউ বলতে পারে না। এসব কারণে শিল্পী হিসেবে মানুষ তার নাম ভুলে যাচ্ছে। তাই বলব, যারা রাজনীতি করে, তারা ভুল করে—এটা আমি সমর্থন করি না।
কেউ মনে করেন, শিল্পীরা যদি রাজনীতি করেন, ক্ষমতা বাড়ে।
ফরিদা আক্তার ববিতা : এটা একেবারেই ভুল ধারণা বলে আমি মনে করি। একজন শিল্পীর ক্ষমতা ও গ্রহণযোগ্যতা সব সময় রাজনীতিবিদের চেয়ে বেশি। শিল্পীর মর্যাদা আর সম্মানও অনেক বেশি। যত দিন দল ক্ষমতায়, রাজনীতিবিদ তত দিন শক্তিশালী। যে মুহূর্তে দল ক্ষমতায় নাই, রাজনীতিবিদের সবকিছু তখনই শেষ। কিন্তু একজন শিল্পীর ক্ষমতা সব সময় থেকে যাবে—যত দিন যাবে বাড়বে, সম্মান–মর্যাদাসহ। দলমত, ধর্ম–বর্ণনির্বিশেষে সব সময় শিল্পীর ক্ষমতা থেকে যাবে। শিল্পীরা রাজনীতিতে গেলে পরিণতি খুব খারাপ হয়, মোটেও ভালো হয় না—এটা আমি নিজেই দেখেছি।
- ট্যাগ:
- বিনোদন
- অভিনয়শিল্পী
- একুশে পদক
- ববিতা