ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন : বিশুদ্ধ বাতাস কি অগ্রাধিকার পাবে?
১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ অনুষ্ঠিতব্য ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে রাজনৈতিক অঙ্গন এখন প্রতিশ্রুতির বন্যায় ভাসছে। উন্নয়ন, মেগা প্রকল্প, প্রবৃদ্ধি, স্মার্ট বাংলাদেশের মতো সব শব্দই শোনা যাচ্ছে। কিন্তু একটি মৌলিক প্রশ্ন রয়েই যাচ্ছে, এই উন্নয়ন কি মানুষের নিরাপদ শ্বাস নেওয়ার অধিকার নিশ্চিত করতে পারবে? যদি না করে, তবে সেই উন্নয়ন কার জন্য?
বাংলাদেশ আজ এমন এক কঠিন বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে, যেখানে বায়ু দূষণ নীরবে কিন্তু নিরবচ্ছিন্নভাবে মানুষ হত্যা করেই চলেছে। ঢাকা, গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জ, চট্টগ্রামের মতো শহরগুলোয় বসবাসকারী কোটি কোটি মানুষ প্রতিদিন এমন বাতাসে শ্বাস নিচ্ছে, যা স্বাস্থ্যঝুঁকির নির্ধারিত মানমাত্রা বহু আগেই অতিক্রম করেছে।
তবুও আশ্চর্যজনকভাবে, বায়ু দূষণ এখনো নির্বাচনী রাজনীতির প্রান্তিক ইস্যু। তাই প্রশ্ন উঠতেই পারে, যে রাষ্ট্র তার নাগরিককে বিশুদ্ধ বাতাস দিতে পারে না, সে রাষ্ট্রের উন্নয়নের দাবি কতটা বিশ্বাসযোগ্য? প্রায়শই আমাদের কাছে জানতে চাওয়া হয় যে, বায়ু দূষণের দায় কার? দায় সবার কিন্তু দায়িত্ব মূলত রাষ্ট্র ও রাজনৈতিক নেতৃত্বের।
বছরের পর বছর ধরে অনিয়ন্ত্রিত ইটভাটা চলছে, পুরোনো ধোঁয়াবাহী যানবাহন রাস্তায় দাপিয়ে বেড়াচ্ছে, শিল্পকারখানার বিষাক্ত ধোঁয়া আকাশ ঢেকে ফেলছে, আর নির্মাণকাজের ধুলা শহরকে ধূসর করে তুলছে। আইন আছে, নীতিমালা আছে কিন্তু প্রয়োগ নেই। এই ব্যর্থতার রাজনৈতিক দায় কেউ কি নেবে?
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মাধ্যমে রাজনৈতিক দলগুলো এই সুযোগ খুব ভালোভাবেই কাজে লাগাতে পারে। প্রশ্ন হলো, রাজনৈতিক দলগুলো কি সত্যিই এই সুযোগ নিতে চায়, নাকি বায়ু দূষণের মতো ‘অকাট্য সত্য’ কে আবারও ইশতেহারের বাইরে রেখে দেবে?
জনগণের কাছে আজ পরিষ্কার যে, বায়ু দূষণ আর পরিবেশবাদীদের একক ইস্যু নয়, এটি এখন ভোটারের জীবন-মৃত্যুর প্রশ্ন। একজন রিকশাচালক, গার্মেন্টস শ্রমিক, দিনমজুরের মতো একজন স্কুলপড়ুয়া শিশুশিক্ষার্থী, ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, সাংবাদিক, রাজনৈতিক নেতা-কর্মী ও সরকারি কর্মকর্তাসহ সবার ফুসফুসই সমানভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। অথচ নির্বাচনী প্রচারণার বক্তৃতায় এই মানুষগুলোর নির্মল বাতাসে শ্বাস নেওয়া নিশ্চিত করার কথা খুব কমই শোনা যায়।
বায়ু দূষণকে বাংলাদেশে এখনো একটি ‘পরিবেশগত সমস্যা’ হিসেবে দেখা হয়। এটি একটি মারাত্মক নীতিগত ভুল। বাস্তবে বায়ু দূষণ হলো জনস্বাস্থ্য সংকট, অর্থনৈতিক ক্ষতি, সামাজিক বৈষম্য এবং রাষ্ট্রীয় শাসনব্যবস্থার ব্যর্থতার সম্মিলিত প্রকাশ। এই সংকটকে ইশতেহারে না আনা মানে সমস্যাকে অস্বীকার করা, আর অস্বীকারই রাজনৈতিক ব্যর্থতার প্রথম ধাপ।
বায়ু দূষণ সরাসরি রাষ্ট্রের সাংবিধানিক দায়িত্ব, রাষ্ট্র নাগরিকের জীবন রক্ষার দায় বহন করে। কিন্তু যখন রাষ্ট্র জানে যে দূষিত বাতাসে শ্বাস নেওয়ার ফলে মানুষ অসুস্থ হচ্ছে।
ইউনিসেফের তথ্য অনুযায়ী, পৃথিবীর প্রায় ১.৮ বিলিয়ন শিশু দূষিত বাতাসে শ্বাস নিচ্ছে, সেন্টার ফর রিসার্চ অন এনার্জি অ্যান্ড ক্লিন এয়ারের (সিআরইএ) প্রতিবেদন অনুযায়ী, দেশে বায়ু দূষণে প্রতিবছর ১ লাখ ২ হাজার ৪৫৬ জন মানুষ মারা যাচ্ছে, এয়ার কোয়ালিটি লাইফ ইনডেক্স (একিউএলআই) অনুযায়ী, বায়ু দূষণ বাংলাদেশের মানুষের গড় আয়ু থেকে গড়ে ৫.৫ বছর কমিয়ে দিচ্ছে।
বিশ্বব্যাংকের তথ্যমতে, বাংলাদেশের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) ৪ দশমিক ৪ শতাংশ বায়ু দূষণের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে এবং তবুও কার্যকর ব্যবস্থা নেয় না, তখন সেটি আর প্রশাসনিক দুর্বলতা থাকে না, তা নীতিগত অবহেলা হয়ে দাঁড়ায়। নির্বাচনী ইশতেহারে এই ইস্যু উপেক্ষা করা মানে সেই অবহেলাকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়া।